২০২২ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে পানিকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পানিসংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১৯টি, যেখানে ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৩৫।
সংস্থাটি পানিকে কেন্দ্র করে সংগঠিত সংঘাতের প্রায় শত বছরের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব ঘটনায় কোথাও পানি সহিংসতার কারণ হিসেবে কাজ করেছে, কোথাও তা সংঘাতের ‘অস্ত্র বা হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কোথাও হামলার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পানির অবকাঠামো ও উৎসগুলো, যা অনেক ক্ষেত্রে গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে।
প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. পিটার গ্লেইক বলেন, আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘাত দেখছি, এগুলোর কারণ একক নয়। জলবায়ু সংকট ও চরম আবহাওয়া এতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, অদক্ষ বা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ও পানিব্যবস্থাপনার অবকাঠামোর অভাব বা অপব্যবহারও বড় কারণ।
সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন—
- সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা
- ইউক্রেনের জলবিদ্যুৎ বাঁধে রাশিয়ার হামলা
- গাজায় ইসরায়েলের পানি অবকাঠামো ধ্বংস
- দক্ষিণ আফ্রিকায় পানি সরবরাহ নিয়ে বিক্ষোভ
গাজা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অক্সফামের পানি নিরাপত্তা বিষয়ক প্রধান জোয়ানা ট্রেভর বলেন, গাজায় ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। পানির নেটওয়ার্ক ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আটকে দেয়া হয়েছে মেরামত কাজ। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় পানযোগ্য পানি দূষিত হয়েছে, এমনকি পানি সংগ্রহের সময় মানুষ হামলার শিকার হয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলেও পানির নিরাপত্তা দ্রুত খারাপ হচ্ছে। ট্রেভরের মতে, পানির খোঁজে মানুষ নতুন এলাকায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সংঘাত তৈরি করছে।
রাজনীতিও অনেক অঞ্চলে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদী ও রিও গ্রান্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ১৯৪৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী মেক্সিকোকে কলোরাডো নদীর পানি দেয় যুক্তরাষ্ট্র বিপরীতে মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রে রিও গ্রান্ডের পানি সরবরাহ করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সীমান্ত রাজনীতি তীব্র হওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
মধ্য এশিয়াতেও নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা রয়েছে। গ্লেইক জানান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তান দীর্ঘদিন ধরেই পানিকে ঘিরে টানাপোড়েনে রয়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তান আমু দরিয়া নদী থেকে পানি সরাতে ‘কোশ তেপা’ খাল নির্মাণ করছে, যা চালু হলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্ব এখন পানি দেউলিয়াত্বের যুগে প্রবেশ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মিঠা পানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি হবে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সীমান্ত অতিক্রমকারী নদী ও হ্রদ অববাহিকায় বসবাস করলেও মাত্র ২০ শতাংশ দেশের মধ্যে পানি বণ্টন সংক্রান্ত কার্যকর চুক্তি রয়েছে।
ক্রমবর্ধমান পানি সংকটে আরো জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকারভিত্তিক আন্তঃসীমান্ত চুক্তি প্রয়োজন। বর্তমান অনেক চুক্তিই স্বেচ্ছামূলক ও পুরোপুরি সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তবে আশার কথা শুনিয়েছেন ড. গ্লেইক। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলে পানি সমস্যার সমাধান করতে পারি—জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মৌলিক মানবিক চাহিদা নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষা ও পানিকে ঘিরে সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্রশ্ন হলো, আমরা সেটা আদৌ করব কি না।’










