জার্মান লেখক হেরমান হেস রচিত ‘সিদ্ধার্থ’ একটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার কাহিনী। শুরুতে একে গৌতম বুদ্ধের জীবনকাহিনী মনে হতে পারে। কারণ বুদ্ধের অপর নাম সিদ্ধার্থ। তবে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক একজন মানুষ। এই উপন্যাসে গৌতম বুদ্ধও অন্যতম একটি চরিত্র।

ব্রাহ্মণকুমার সিদ্ধার্থ জ্ঞানপিপাসায় সংসার ত্যাগ করলেন, সঙ্গী হলেন বন্ধু গোবিন্দ। কিছুকাল সন্ন্যাস পালনের পর দেখা হলো গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে। গোবিন্দ বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও, সিদ্ধার্থ তা করলেন না। কারণ তিনি তথাকথিত জ্ঞান, উপদেশ বা ধর্মের বাঁধনে বাঁধা পড়তে চান না। এক পর্যায়ে নটী কমল ও ব্যবসায়ী কামস্বামীর সংস্পর্শে এসে সিদ্ধার্থ সন্ন্যাস বিসর্জন দিয়ে ভোগসর্বস্ব হয়ে ওঠেন। সে জীবন অসহ্য বোধ হলে তিনি আবার পথে বেরিয়ে পড়েন এবং বাসুদেব নামক এক মাঝির সাক্ষাৎ লাভ করেন। বাসুদেব তাকে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণের উপদেশ দেন এবং দেখা যায় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থ বাসুদেবের দীক্ষাই গ্রহণ করেন।

এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় সিদ্ধার্থ যাদের সান্নিধ্যে এসেছেন, তাদের কাছ থেকে কোনো না কোনো শিক্ষা লাভ করেছেন। এ শিক্ষা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে পরবর্তী কাজে অগ্রসর হতে। গৌতম বুদ্ধ যেসময় ভারতবর্ষে তার দর্শন প্রচার করেছেন, প্রায় একই বা কাছাকাছি সময়ে গ্রিসে সক্রেটিস তার দর্শন প্রচার করেছেন। একই সময়ে চীনে বিকাশ লাভ করে কনফুসিয়াস ও তাওবাদ। উপন্যাসে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে এই সবগুলো দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন জেতাবনে গৌতম বুদ্ধের কাছে গোবিন্দকে ছেড়ে আসার পর সিদ্ধার্থের অনুভূতি ছিল, “আমি খুঁজেছি আত্মাকে, ব্রহ্মকে; আত্মা, জীবন, পরমব্রহ্ম এবং অন্তর্বাসী অপরিজ্ঞাত মূলধারাকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে ক্ষয় করেছি। তিলে তিলে অগ্রাহ্য করেছি নিজের অস্তিত্বকে। আর তা করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি পথের মাঝখানে।” সক্রেটিস বলেছেন, ‘Know Thyself’ বা নিজেকে জানো। সিদ্ধার্থের এই সময়ের ভাবনা সক্রেটিসের এই বাণীর সমর্থক।

গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ না করার মাধ্যমে সিদ্ধার্থ দেখিয়েছেন গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভের পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয়। সিদ্ধার্থের ভাষায়,

“একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে যেন ঐক্যানুভূতির জগতে প্রবেশ করলো এমন কিছু যার প্রমাণ নেই, যা সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, সংসারের উর্ধ্বে উঠবার আর নির্বাণ লাভ সম্বন্ধে আপনার মতবাদ আকস্মিক ও খাপছাড়া মনে হয়।”

সিদ্ধার্থের এই বিরুদ্ধ সমালোচনার মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও উপদেশ এক প্রকার নাকচ করা হয়েছে। তার বিপরীতে বা পরিপূরক হিসেবে নতুন এক আদর্শ সৃষ্টির প্রয়াস করেছেন সিদ্ধার্থ। এবং এখান থেকেই হেনরি মিলার যে কথাটি বলেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধকে অতিক্রম করে এখানে এক নতুন বুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে’।

নটী কমলের সঙ্গে সিদ্ধার্থের পরিচয় এবং আলাপ উপন্যাসের একটি আকর্ষণীয় দিক। এখানে যৌনতাকে কোনো খারাপ বিষয় হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং একটি শিল্প বা কলা হিসেবে দেখানো হয়েছে। সিদ্ধার্থের সঙ্গে কমলের বিভিন্ন সাক্ষাতের সময় কমলের কাজে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তাছাড়া ‘কবিতার বিনিময়ে চুম্বন’ উপহার দেয়ার ব্যাপারটিও বেশ চমকপ্রদ। এই পর্বে বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’-এর প্রভাব স্পষ্ট।

‘সিদ্ধার্থ’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু প্রাচ্যের হলেও এটি লিখেছেন একজন জার্মান লেখক। তাই এখানে লেখকের নিজস্ব পাশ্চাত্য চিন্তাধারার কিছু প্রভাব রয়েছে। হেরমান হেস নিজেই বলেছেন, “Siddhartha is a very European book despite its setting. It is the expression of my liberation from Indian thinking”. এ থেকে বোঝা যায় উপন্যাসে বর্ণিত প্রাচ্যের বিষয়বস্তু এই বই থেকে পুরোপুরি ধরা যায় না। তবে এর একটা ইতিবাচক দিক হলো, এটি পাঠকের চিন্তার জগতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করে, বা হয়তো পরবর্তীতে বুদ্ধ বা সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে জানতে পাঠককে উদ্বুদ্ধ করবে।

আরাফাত কবির: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়