বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমরা সবাই ছুটছি, ব্যস্ততা এখানে সাফল্যের মাপকাঠি। কেউ যদি বলে, ‘আজ কিছুই করিনি’, তাহলে সেটিকে প্রায়ই অলসতা বা ব্যর্থতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, কাজের পরিকল্পনা, আবার পরের কাজের প্রস্তুতি—এ চক্রেই আটকে আছে শহুরে জীবনের বড় একটি অংশ। এমন বাস্তবতায় বিশ্রাম নেয়া অনেকের কাছেই অপরাধবোধের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, বিশ্রাম কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবন ও টেকসই কর্মক্ষমতার একটি মৌলিক শর্ত।
কর্মজীবী মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—ভয়ংকর এক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অফিসের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও কাজের ফোন, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা সব মিলিয়ে কাজ যেন কখনোই শেষ হয় না। পড়াশোনা, চাকরি, পরিবার, সামাজিক প্রত্যাশা সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেকেই নিজের শরীর ও মনের প্রয়োজনকে একেবারে উপেক্ষা করছেন।
সমাজে এখনও একটি ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত— যে যত পরিশ্রম করে সে তত মূল্যবান মানুষ। ফলে কেউ ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতে চাইলে নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়। এ মানসিকতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে তরুণদের। তারা ভাবছে, এখন বিশ্রাম নিলে ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। নিয়মিত বিশ্রাম না নিলে মনোযোগ কমে, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়, সৃজনশীলতা নষ্ট হয় আর শেষ পর্যন্ত দেখা দেয় বার্নআউট, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্রাম মানে শুধু ঘুম নয়। এটি হতে পারে নিশ্চিন্তে বসে থাকা, প্রিয় বই পড়া, হাঁটতে বের হওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা একদম কিছু না করা। এই ‘কিছু না করা’ই অনেক সময় মানুষের ভেতরের শক্তিকে আবার জাগিয়ে তোলে। তাদের মতে, একটু বিরতি নেওয়ার পর কাজের গতি যেমন বাড়ে, তেমনি কাজের মানও ভালো হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সংস্কৃতি এখনও দুর্বল। ক্লান্তি, মানসিক চাপ বা অবসাদকে অনেক সময় ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানুষ মুখে কিছু না বলেই সব সহ্য করে যায়। অথচ বিশ্রাম নেয়া মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের দায়িত্ব আরো ভালোভাবে পালন করার প্রস্তুতি নেয়া।
বিশ্রামকে বিলাসিতা ভাবার সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবার সব জায়গাতেই এ বোঝাপড়া তৈরি করা প্রয়োজন যে, মানুষ কোনো যন্ত্র নয়। তারও থামার প্রয়োজন আছে। বিশ্রাম বিলাসিতা নয়। এটি অধিকার, প্রয়োজন ও জীবনের ভারসাম্য রক্ষার এক অপরিহার্য অংশ।










