১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাজেট হতে হবে জনগণতান্ত্রিক

যেহেতু ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানমতে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ (অনুচ্ছেদ ৭.১) এবং যেহেতু ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’ (অনুচ্ছেদ ১১), সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাজেট হতে হবে জনগণতান্ত্রিক।

আজ ২২ মে ২০২২ তারিখে আমরা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষে ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২২-২৩’ প্রেস কনফারেন্সে উত্থাপন করছি। প্রেস কনফারেন্সে আমাদের সঙ্গে সংযুক্ত আছেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪টি জেলা, ১০৭টি উপজেলা, ২১টি ইউনিয়ন থেকে নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি। এছাড়া সংযুক্ত আছেন বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকে।

বিকল্প বাজেট প্রণয়নে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিতে আমরা যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাকি, এ বছর তার সঙ্গে দুটো নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে: তৃণমূলমুখী করার লক্ষ্যে দেশের সব বিভাগে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে প্রাক্-বিকল্প বাজেট মতবিনিময় সভা এবং বাজেট প্রণয়নের ভিত্তি-নীতি সরকার বরাবর লিখিতভাবে উপস্থাপন।

২। বাজেট প্রণয়নে ভিত্তি-নীতির মর্মকথা

‘মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর অতিক্রান্তকালীন বাজেট’—আমরা বৈষম্যহীন আলোকিত মানুষসমৃদ্ধ সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করব, নাকি বাজেটসহ সবকিছুই আমরা নব্য উদারবাদী মতাদর্শের মুক্তবাজার আর করপোরেট-স্বার্থীয় সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রকদের বিশ্বায়নের হাতে ছেড়ে দেব—এ সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। অন্যথায় আমরা গতানুগতিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাব—জিডিপি বাড়লেও বাড়তে পারে; মাথাপিছু আয় বাড়লেও বাড়তে পারে—কিন্তু বৈষম্য-অসমতা নিরসন হবে না—হবে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা অভীষ্ট বাস্তবায়ন।

দেশে বৈষম্য-দারিদ্র্যের বিপজ্জনক প্রবণতা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, শোভন কর্মবাজারের সংকোচন, একই সঙ্গে এ প্রবণতায় করোনাকালীন এবং ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বাজেটসহ সব উন্নয়ন দলিলে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বিষয়গুলো এ রকম: (১) দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বহুমাত্রিক দরিদ্র। আর ধনী-অতিধনী হলেন জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ১ শতাংশ। কভিড-১৯ লকডাউনের প্রভাবে ‘নিরঙ্কুশ দরিদ্র’ মানুষ ‘হতদরিদ্র-চরমদরিদ্র’ হয়েছেন; আর নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ব্যাপকাংশ দরিদ্র হয়েছেন এবং মধ্য-মধ্যবিত্তদের একাংশ বিত্তের মানদণ্ডে নিম্নগামী হয়েছেন। ফলে এখন একদিকে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যা কভিড-১৯ সময়ের আগের তুলনায় কমপক্ষে দ্বিগুণ বেড়েছে; আর অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক দরিদ্র গোষ্ঠী, যারা আগে দরিদ্র ছিলেন না—এরা হলেন ‘নবদরিদ্র’। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বিত্তের এ অধোগতি—আগে কখনো এত দ্রুত হয়নি—এ এক নতুন প্রবণতা। (২) কভিড-১৯ উদ্ভূত লকডাউনের কারণেই স্বাভাবিক বা অফলাইনের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, সেবা খাতে অধোগতি হয়েছে—হয়েছে তা নিম্নগামী। আর ফুলেফেঁপে উঠেছে অফলাইন ব্যবসা-বাণিজ্য (এটা বিশ্বব্যাপী ঘটনা)—এসব রেন্টসিকার-দুর্বৃত্ত-লুটেরা-পরজীবী মুক্তবাজারে মুক্তবিহঙ্গ হয়ে তাদের আয়-সম্পদ-সম্পত্তি বিপুল বাড়িয়েছেন। এসবের ফলে আয় বৈষম্য (income inequality)-সম্পদ বৈষম্য (wealth inequality)-স্বাস্থ্য বৈষম্য (health inequality)-শিক্ষা বৈষম্যসহ (education inequality) বৈষম্যের সব ধরনই বেড়েছে। আর এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিভিন্নভাবে বৈষম্য-দারিদ্র্য বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশ এবং ‘বিপজ্জনক আয় বৈষম্যের’ দেশ। (৩) মানুষের ক্ষুধার দারিদ্র্যসহ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য বেড়েছে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য আরো বাড়ছে-বাড়বে। দারিদ্র্যাবস্থা নিয়ে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা—মানুষের কর্মসংস্থানের। (৪) জিনিসপত্রের দাম বাড়া বা মূল্যস্ফীতি—গরিবের শত্রু। তবে বেকারত্ব বাড়লে মূল্যহ্রাস বা মূল্যসংকোচন হয় গরিবের মহাশত্রু। কারণ মানুষের যদি কাজ না থাকে, আয়ের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়—তাহলে ‘জিনিসপত্রের’ দাম কমলেই কী? (৫) ‘শোভন সমাজব্যবস্থায়’ মানুষের জন্য কোনো কিছুই তথাকথিত জনকল্যাণ-উদ্দিষ্ট দয়াদাক্ষিণ্যের বিষয় নয়—তা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কাজ, আবাসন, বিশ্রামসহ মানুষের সামাজিক ন্যায়-অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শনের অতি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়।

এসব বাস্তবতা বিবেচনায় বাজেট প্রণয়নে আমাদের লক্ষ্য হবে—পূর্ণ কর্মনিয়োজন, শিশুর জন্য সুস্থ জীবন, সবার জন্য আবাসন, মূল্যস্ফীতি রোধ—এক্ষেত্রে বাজেট কোনো অভীষ্ট বা লক্ষ্য হবে না, বাজেট হবে লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম মাত্র। ‘শোভন অর্থনীতি ব্যবস্থায়’ এ ধরনের বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে আয় ও সম্পদ বণ্টনে ন্যায্যতা বাড়বে, বৈষম্য দূর হবে, তথাকথিত কৃচ্ছ্র সাধনের প্রয়োজন হবে না, অর্থনীতিতে মোট চাহিদা বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, যা ইচ্ছা তা-ই উৎপাদন হবে না (যেমন—পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্যহানিকর ওষুধপত্র, অপসংস্কৃতি ইত্যাদি), পূর্ণ কর্মনিয়োজন নিশ্চিত হবে, কোনো ধরনের ঘাটতি এবং ঋণ নিয়ে ভাবতে হবে না। কিন্তু শোষণভিত্তিক-ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর-লোভলালসাভিত্তিক-মুনাফা উদ্দিষ্ট পুঁজিবাদ এসব পারবে না। এসব পারবে ‘শোভন জীবনব্যবস্থা’ বিনির্মাণ-উদ্দিষ্ট শোভন অর্থনৈতিক ও শোভন সামাজিক কর্মকাণ্ড, যা রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রশ্ন।

আসন্ন বাজেটের ভিত্তি-নীতির মর্মকথা নিয়ে যেসব বাস্তব বিষয়-প্রবণতা উল্লেখ করলাম, তা থেকে আমরা মনে করি—মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত মানুষের বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে এবং দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর লক্ষ্যে বাজেটপ্রণেতারা এবারের বাজেটে নিদেনপক্ষে দুটি বড় মাপের বিষয় নিয়ে ভাববেন: (১) আয়-ধন-সম্পদের বণ্টন হতে হবে ন্যায্য—তা সমাজে শ্রেণীমইয়ের ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হতে হবে। (২) সরকারিভাবেই শোভন মজুরির ব্যাপক কর্মসংস্থান-সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

৩। বিকল্প বাজেট ২০২২-২৩: জনগণতান্ত্রিক বাজেটের ভাবনা-ভিত্তি

গত বছর (২০২১) আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরপূর্তি উদযাপন করলাম—ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বহুমাত্রিক দারিদ্র্য-বঞ্চনার পরিবেশে। এসবের সঙ্গে আগের বছর-২০২০ সালে যুক্ত হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং একই সঙ্গে কভিড-১৯ অতিমারীর লকডাউনের কারণে বিপর্যস্ত সমাজ ও অর্থনীতি। আর এ বছর (ফেব্রুয়ারি ২০২২) যোগ হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার মরণ-অভিঘাত সর্বব্যাপ্ত। এমন দুঃসময়-মহাবিপর্যয়ে একটি জনকল্যাণকামী বাজেট দেশের মানুষ প্রত্যাশা করবে—এ আশা অমূলক হবে না। এমন বিপর্যয়ের সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণভিত্তিক বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হতে হবে—আলোকিত মানুষসমৃদ্ধ বৈষম্যহীন ‘শোভন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ—যা ছিল ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। এ বিশ্বাসও অমূলক হবে না যে এসব বিপর্যয় মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে দুর্বল করবে না, উল্টো এ বিপর্যয় কাঙ্ক্ষিত মানবিক উন্নয়ন-প্রগতির গতি বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে সেই সুযোগ উদঘাটন-অনুসন্ধান করা এবং তা দেশের মানুষের জন্য কাজে লাগানো। আমরা একদিকে যেমন জানি যে এসব এক বাজেটের কাজ নয়, আবার অন্যদিকে এটাও বিশ্বাস করি যে কাজটি শুরু করতে হবে এখনই।

বাজেটসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে ধার করা নয় অথবা বহিঃশক্তির চাপিয়ে দেয়া নয় অথবা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়া-উদারবাদী কোনো মতাদর্শ নয়—এসবের বিপরীতে ‘প্রকৃতির প্রতি পূর্ণ সম্মান ও আস্থাভিত্তিক বৈষম্য হ্রাস-উদ্দিষ্ট উন্নয়নদর্শন’ই সঠিক পথ বলে আমরা মনে করি। আমরা বিশ্বাস করি মুক্তিযুদ্ধের শুভ চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব—যৌক্তিক, নৈতিক, মানবিক—সব বিচারেই তা সম্ভব; সম্ভব এ দেশের দ্রুত কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন; সম্ভব উন্নত আলোকিত বাংলাদেশ গড়া; সম্ভব বৈষম্যহীন সমাজ গড়া; সম্ভব অসাম্প্রদায়িক মানবসমাজ সৃষ্টি করা। আমরা এটিও বিশ্বাস করি—মহামারী-বিপর্যয়-যুদ্ধ সেই সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা ‘শোভন সমাজব্যবস্থা’ বিনির্মাণের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সুযোগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমগ্র দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার ‘শ্রেষ্ঠ সুযোগ’।

৪। বিকল্প বাজেট ২০২২-২৩: জনগণতান্ত্রিক বাজেটের লক্ষ্য-অভীষ্ট ও পদ্ধতি

আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প জনগণতান্ত্রিক বাজেটের মূল লক্ষ্য-অভীষ্টগুলো (Goals) হচ্ছে আগামী ১০ বছরের মধ্যে (অর্থাৎ ২০৩২ সাল নাগাদ)—(১) দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে (৭০%-৮০%) একটি আলোকিত-শক্তিশালী-টেকসই মধ্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে রূপান্তর করা, (২) দেশে বৈষম্য-অসমতা-বহুমুখী দারিদ্র্য সম্ভাব্য-সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, (৩) পরজীবী-লুটেরা ধনিক শ্রেণীর সম্পদের যৌক্তিক অংশ দরিদ্র-প্রান্তিক-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কাছে প্রবাহিত করা, (৪) দেশজ অর্থনীতিকে উন্নয়নকৌশলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া, (৫) দেশজ অর্থনীতির মধ্যে কৃষিকে—কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার—সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া, (৬) মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক, উদ্ভাবনী-শক্তি-সঞ্চারিত-আলোকিত করার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা—যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, নিরাপত্তা-সুরক্ষা—সবই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং (৭) মানুষের জন্য শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেট বিনির্মাণের পদ্ধতি প্রচলিত-প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। প্রচলিত প্রথায় বাজেট প্রণয়েনের কাজ শুরু হয় ‘কত টাকা-পয়সা আছে’ তা দিয়ে অর্থাৎ বাজেট প্রণয়ন শুরুই হয় ‘টাকা-পয়সাকে’ মূল অবজেক্ট অথবা লক্ষ্য-অভীষ্ট ধরে নিয়ে। আমরা মনে করি, ‘শোভন সমাজ বিনির্মাণে’—এ পদ্ধতির শুরুটাই ভ্রান্ত চিন্তাভিত্তিক। এর বিপরীতে আমাদের বাজেট প্রণয়ন কর্মকাণ্ডের শুরুটাই হচ্ছে ‘কত টাকা-পয়সা আছে’ দিয়ে নয়, শোভন জীবন বিনির্মাণে দেশের মানুষের জন্য ‘কী কী প্রয়োজন তা দিয়ে’—অর্থাৎ সংবিধান প্রতিশ্রুত প্রজাতন্ত্রের মালিক ‘জনগণের চাহিদা’ দিয়ে। এসবের মধ্যে প্রধান মৌল হলো মানুষের স্বাস্থ্য-সুস্বাস্থ্য, আবাসন, শিক্ষা, কাজ, বিশ্রাম-বিনোদন, সংস্কৃতি চর্চা থেকে শুরু করে সৃজনশীল বিকাশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই। এসব জটিল সমীকরণ সমাধানে আমরা বাজেট ব্যালান্স অথবা অর্থনীতি ব্যালান্স করাকে গুরুত্বহীন মনে করিনি; তবে অগ্রাধিকার দিয়েছি সামাজিক ব্যালান্সের বিষয়াদি।

৫। জনগণতান্ত্রিক বাজেট ২০২২-২৩: বৃহৎ বর্গভিত্তিক প্রস্তাব

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা, কভিড-১৯-এর মহামারী এবং ইউরোপে যুদ্ধের অনিশ্চিত-অভিঘাত হিসাবে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমরা আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য যে বিকল্প জনগণতান্ত্রিক বাজেট প্রস্তাব করছি, তার মোট আকার (পরিচালন ও উন্নয়ন মিলিয়ে) হবে ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) সরকার প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় ৩.৪০ গুণ বেশি।

আমাদের বিকল্প বাজেট বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমরা ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ-উপবিষয়াদিকে ২৪টি মূল বিষয় বা বৃহৎ বর্গে উপস্থাপন করেছি: (১) বৈষম্য-অসমতা-দারিদ্র্য: অশোভন সমাজের গোড়ার কথা, (২) সামাজিক সুরক্ষা-নিরাপত্তাবেষ্টনী-মানবকল্যাণ, (৩) মূল্যস্ফীতি ও মূল্যসংকোচনসংশ্লিষ্ট, (৪) বিনিয়োগ-সঞ্চয়: সরকারি ও বেসরকারি, (৫) রেমিট্যান্স প্রবাহের উৎপাদনশীল ব্যবহার, (৬) পুঁজিবাজার, (৭) ব্যাংক, (৮) বৈদেশিক খাত: আমদানি ও রফতানি, (৯) বৈদেশিক ঋণ, (১০) কৃষি-ভূমি-জলা ও সংশ্লিষ্ট মেহনতি মানুষ, (১১) ভূমি মামলা: পারিবারিক ও জাতীয় অপচয়, (১২) ভূমি আইন, প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালা, (১৩) শিক্ষা: শোভন মানুষ সৃষ্টির সূতিকাগার, (১৪) স্বাস্থ্য খাত: শোভন সমাজ বিনির্মাণে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ খাত, (১৫) শিল্প খাত, (১৬) নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর বিকাশ, (১৭) প্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, (১৮) প্রকৃতি-জলবায়ু-পরিবেশ ভাবনা, (১৯) গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চা: ব্যয় নয় বিনিয়োগ, (২০) দেশরক্ষা-আত্মরক্ষা-প্রতিরক্ষার ধারণা, (২১) সরকার টাকা পাবে কোথায়?, (২২) মন্ত্রণালয়গুলোর ভৌগোলিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সাধারণ প্রশাসন, দাপ্তরিক বিকেন্দ্রীকরণ (স্থানান্তর), (২৩) বাজেট বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট বিষয়, (২৪) শোভন সমাজ বিনির্মাণ-উদ্দিষ্ট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। আমরা ওই ২৪টি বৃহৎ বর্গ বা খাতকে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিবিম্ব হিসেবে দেখি। ২৪ বর্গে বাজেটের জন্য আমাদের সুপারিশ সংখ্যা ৩৩৮টি। এসব সুপারিশের কয়েকটি নিম্নরূপ:

বৈষম্য-অসমতা-দারিদ্র্য উচ্ছেদে সুপারিশ: (১) শুধু আসন্ন ২০২২-২৩ বাজেটই নয়, আগামী অন্তত পাঁচ বছরের বাজেট ও অন্যান্য পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নীতি-কৌশল দলিল প্রণয়নে যে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের প্রধানতম ভিত্তি-নীতি হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে তা হলো: সমাজ থেকে চার ধরনের বৈষম্য—আয় বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য, স্বাস্থ্য বৈষম্য ও শিক্ষা বৈষম্য চিরতরে নির্মূল করা। এ লক্ষ্যে বাজেটের আয় খাত ও ব্যয় খাতে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে। (২) বাজেটে অর্থায়নের উৎস নির্ধারণে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যমধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর কোনো ধরনের কর-দাসত্ব আরোপ করা যাবে না। (৩) পরজীবী-লুটেরা ধনী-সম্পদশালীদের সম্পদ পুনর্বণ্টন করে তা শ্রেণীমইয়ের নিচের দিকে প্রবাহিত করতে হবে।

সামাজিক সুরক্ষা-নিরাপত্তাবেষ্টনী-মানবকল্যাণ: এদেশে স্বাভাবিক অবস্থায় (অর্থাৎ কভিড-১৯ লকডাউনের আগে) সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তাবেষ্টনী সুবিধা পাওয়ার যোগ্য খানার সংখ্যা দুই কোটি, যাদের ৭৫ শতাংশ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ সংখ্যা এখন বেড়ে কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে নিঃস্বতর হয়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপকাংশ মানুষ এবং বেকার হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। অবস্থা একই রকম থাকলে সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তিযোগ্য মানুষের সংখ্যা বাড়বে। এসব বিবেচনায় আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেটে ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ’ হলো সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্তিযোগ্য খাত। এ খাতে সরকার যেসব ব্যয়-বরাদ্দ করে থাকে, তা যৌক্তিক নয় বিধায় আমরা আটটি বিভাগ/দপ্তর/অধিদপ্তর হিসেবে নতুন খাত অন্তর্ভুক্ত করেছি।

মূল্যস্ফীতি ও মূল্যসংকোচনসংশ্লিষ্ট: বার্ষিক প্রাক্কলিত মূল্যস্ফীতি ৫%-৭%-এর মধ্যে রাখতে হবে। তবে শর্ত হলো কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যস্ফীতি এমন কোনো পর্যায়ে নেয়া যাবে না, যা অর্থনীতিকে মূল্যস্ফীতির মহাঘূর্ণনচক্রে ফেলবে। তাহলে বিপদ হবে অনিবার্য। ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি’ কোনো অবস্থাতেই বাড়ানো যাবে না।

বৈদেশিক ঋণ: মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের যে অবস্থা, তা বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে যখন থেকে আমরা একসঙ্গে চার-পাঁচটি মেগা প্রকল্পের ঋণের সুদ পরিশোধ করা শুরু করব, ঠিক তখন থেকেই ঋণ পরিশোধ অবস্থা ‘লাল সংকেতবাহী’ হবে। আনুমানিক সময়কালটা হতে পারে ২০২৭-২৮ সাল। বৈশ্বিক অর্থনীতির মহামন্দা, কভিড-১৯ উদ্ভূত মহাবিপর্যয়, ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্রের ভৌগোলিক স্থানান্তর—এসব কারণে বৈদেশিক ঋণ-উদ্ভূত ‘লাল সংকেত’ আমাদের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতিতে অতি বিরূপ প্রভাব ফেলবে—এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। বৈদেশিক ঋণের রাজনৈতিক অর্থনীতি তা-ই বলে।

কৃষি ও কৃষক স্বার্থ—আপসে মীমাংসনীয় বিষয় নয়: (১) সরকারে যে-ই থাকুন না কেন স্বীকার করতে হবে যে শুধু বৈষম্যহীন অর্থনীতি ও আলোকিত মানুষসমৃদ্ধ ‘শোভন সমাজব্যবস্থা—শোভন জীবনব্যবস্থা’ বিনির্মাণের লক্ষ্যেই নয়, বিশ্বব্যাপী ডুবন্ত পুঁজিবাদ ব্যবস্থা থেকে প্রকৃতির বিধানানুযায়ী মানবকল্যাণকামী উন্নততর ব্যবস্থায় উত্তরণে শুধু সম্পদের (সব প্রাকৃতিক সম্পদসহ জমি-জলা-জঙ্গল) ন্যায্য পুনর্বণ্টনই নয়—সম্পদের মালিকানারও বণ্টন করতে হবে। (২) আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে জনগণতান্ত্রিক বিকল্প বাজেটে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব—‘কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিভাগ’ গঠন করা হোক। এ লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য মোট ২ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দসহ আসন্ন অর্থবছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। প্রস্তাবিত ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকবে: (ক) দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষি ও জলাজীবী খানার মধ্যে খাসজমি ও জলা বিতরণ, ১৫ হাজার কোটি টাকা; (খ) দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদবিহীন/ স্বল্প সুদের স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রদান, ১০ হাজার কোটি টাকা; (গ) কৃষকদের কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, ১০ হাজার কোটি টাকা; (ঘ) ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বীমা, ৩ হাজার কোটি টাকা; (ঙ) সেটেলার বাঙালিদের সমতলে পুনর্বাসন, ২ হাজার কোটি টাকা।

হাওর-বাঁওড়-বিল-চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশা-বঞ্চনা নিরসন ও উন্নয়ন সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো: ‘হাওর-বাঁওড়-বিল-চর উন্নয়ন বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করা এবং আগামী পাঁচ বছরে মোট ২ লাখ কোটি টাকা অর্থাৎ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ।

‘শিক্ষা’ নিয়ে প্রস্তাব: (১) সরকারে যে বা যারাই থাকুন না কেন প্রথমেই নিঃশর্ত স্বীকার করে নিতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানসমৃদ্ধ বিচার-বোধসম্পন্ন নৈতিক দৃষ্টিতে উন্নত ও সৌন্দর্যবোধ চেতনায় সমৃদ্ধ পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টি করা। (২) ‘শিক্ষা’ খাতের বাজেট বরাদ্দ কোনোভাবেই ‘ব্যয়’ হিসেবে দেখা যাবে না। শিক্ষাকে দেখতে হবে শোভন মানুষ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে। (৩) আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনকার তুলনায় ২.৫৪ গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি, যা জিডিপির ৮ শতাংশের সমপরিমাণ। (৪) শিক্ষার প্রত্যেক স্তরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে শুধু যোগ্য ও মেধাবী মানুষ শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হন।

স্বাস্থ্য খাত: শোভন সমাজ বিনির্মাণে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ খাত: (১) রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারকে স্বীকার করতে হবে যে তারা সংবিধানের বিধি অনুযায়ী জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা—স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছেন। (২) কভিড-১৯ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা বিচার-বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য খাতে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা’ নামে নতুন একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। প্রস্তাবিত ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগ’ যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করবে, তার মধ্যে থাকবে: জীবজন্তু প্রাণিবাহিত রোগ, বায়োসেফটি, রোগ নির্ণয় ও রিপোর্টিং, সমন্বিত ডাটাবেজ, র্যাপিড রেসপন্স, জনস্বাস্থ্য সিস্টেম প্রতিষ্ঠা, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতি, জনস্বাস্থ্য ইমারজেন্সি মোকাবেলায় দক্ষতা এবং সব ধরনের টিকাসংশ্লিষ্ট গবেষণা ও উৎপাদন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য। (৩) আমাদের দেশে শিশুর জন্মের একদিনের মধ্যে, জন্মের সাতদিন এবং জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনামূলক অত্যুচ্চ। অথচ এ অতি-অকালমৃত্যু রোধ করা শুধু যে সম্ভব তা-ই নয়, তা স্বল্প ব্যয়েই সম্ভব। আর শিশুদের এই অতি-অকালমৃত্যু রোধ করতে পারলে ওই শিশু সুস্থ-দীর্ঘ জীবন পাবে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট এ উপখাতে আমরা ১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। (৪) নবজাতক শিশুদের অনেকেই হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত হয়ে শেষপর্যন্ত পঙ্গুত্ব বরণ করে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ নিউবর্ন স্ক্রিনিং সেবা একদিকে যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি অন্যদিকে এই সেবা প্রদানে তেমন প্রশিক্ষিত কর্মীরও প্রয়োজন হয় না। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে কর্মরত মাঠকর্মীরাই এ সেবা প্রদানে সক্ষম। নবজাতক শিশুর থাইরয়েড স্ক্রিনিং খাতে এ বছর প্রাথমিকভাবে আমরা ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।


সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা: সুপেয় পানি (খাওয়ার—আর্সেনিকমুক্ত ও লবণাক্ততামুক্ত) ও স্যানিটেশন (স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ) জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান নির্দেশক। এ দুই উপখাতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরে আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। তা অনেক বাড়াতে হবে। এ দুই উপখাতের জন্য বাজেটে ভিন্ন লাইন-আইটেম থাকা জরুরি।

শিল্প খাত: (১) আমরা এমন শিল্পায়ন চাই না, যা ব্রিটেনে শিল্পায়নের মতো গ্রাম থেকে মানুষ খেদিয়ে সেখানে ভেড়ার দল পুষবে। আমরা চাই মানবকল্যাণকামী শিল্পায়ন, যা মানুষকে উচ্ছেদ করবে না—মানুষকে তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করবে না এবং একই সঙ্গে যা কখনো কোনো অবস্থাতেই প্রকৃতিবিধ্বংসী হবে না, মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য-মন-মনন বিধ্বংসের কারণ হবে না, বৃহত্তর ও সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক স্বার্থবিরোধী হবে না। (২) প্রাথমিক পর্যায়ের শিল্পায়ন হতে হবে দেশের অভ্যন্তরীণ মোট চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে, আর যে চাহিদা হবে মূলত মানুষের বিকাশমান যৌক্তিক মৌলিক চাহিদা। (৩) শিল্পায়নপ্রক্রিয়ায় দেশজ কৃষিভিত্তিক বিষয়াদি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। (৪) শিল্পায়ন হতে হবে দেশজ, আর দেশজ শিল্প সুরক্ষার জন্য যত ধরনের সংরক্ষণবাদী-সুরক্ষাবাদী নীতি আছে, তা গ্রহণ করতে হবে। (৫) মুক্তবাজার ও অসম বিশ্বায়নের তোড়ে জাতীয় অর্থনীতি রক্ষার জন্য আমদানিমুখী উন্নয়ন কৌশলের বিপরীতে উৎপাদন ও রফতানিমুখী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা যৌক্তিক। (৬) স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনে সহায়তায় রাজধানী ও শহরাঞ্চলের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ পদক্ষেপ দেশে সামাজিক ও ভৌগোলিক—আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে সহায়ক হতে পারে, যদি শিল্পায়ন নীতি জনগণের কল্যাণে প্রণয়ন করা হয়।

নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর বিকাশ: (১) রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে নারীর বহুমুখী ক্ষমতায়ন বিষয়টি সর্বজনীন; তবে দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত নারী যেহেতু সবচেয়ে ভঙ্গুর ও অরক্ষিত, সেহেতু এই গ্রুপে নারীর ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য ক্ষেত্র। (২) রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে বিদ্যমান আর্থসামাজিক কাঠামোতে পিতৃতান্ত্রিক ও সামন্ত মানসিকতার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নে শক্তিশালী প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে সম্পদ-সম্পত্তিতে নারীর কার্যকর অধিকারহীনতা। (৩) বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কিশোরী গর্ভধারণের হার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এ দুই খাতে পৃথক বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। (৪) এবারের বাজেটে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধসংশ্লিষ্ট বরাদ্দ কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা করা হোক। (৫) আমরা আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন খাত-ক্ষেত্রে যেসব বরাদ্দ প্রস্তাব করেছি, তার বেশির ভাগই পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য শুধু বরাদ্দের পরিমাণ ভিন্ন। তবে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর বিকাশ ত্বরান্বয়নে এ বছর আমরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বাজেট প্রস্তাব করেছি।

প্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সহায়ক উপকরণ হিসেবে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার, ক্রাচ, কৃত্রিম পা; দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সাদাছড়ি, চশমা, ব্রেইল পুস্তক; বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য শ্রবণযন্ত্র; বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন সহায়ক উপকরণাদি এবং বহুমুুখী প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক উপকরণাদিসহ খাদ্যসহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ বাবদ ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা ২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।

প্রকৃতি-জলবায়ু-পরিবেশ ভাবনা: (১) আমাদের পরিবেশ ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে এখানেই যে প্রকৃতির ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নে আমরা কি প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল-আস্থাবানভিত্তিক উন্নয়ন-প্রগতিপ্রক্রিয়া গ্রহণ করব, নাকি পুঁজিবাদী শিল্পায়ন গত ২০০-২৫০ বছর যা করেছে সেটাই অনুসরণ করব? আমরা কি বায়ু-পানি-পরিবেশ-প্রতিবেশ দূষণকারী শিল্পায়নের পথে পা বাড়িয়ে ‘শ্বসনতন্ত্রের রোগের মহামারী’কে আমন্ত্রণ জানাব? আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল-আস্থাশীল উন্নয়ন-প্রগতি প্রক্রিয়া গ্রহণ করি, তাহলে একদিকে যেমন প্রকৃতির ক্ষতিতে আমাদের অবদান কমবে আর অন্যদিকে কিন্তু দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতাও কমবে। কারণ অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয় হলো মুনাফা, আরো মুনাফা, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে
মুনাফার সর্বোচ্চকরণ। (২) নদীর নাব্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চা: (১) মানবকল্যাণ-উদ্দিষ্ট গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে ব্যয় নয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। (২) গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার নামে এমন কোনো বিনিয়োগ করা যাবে না, যা শেষপর্যন্ত মানুষে-মানুষে বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হতে পারে অথবা যা হতে পারে সমাজবিধ্বংসী। (৩) গবেষণা ও উন্নয়নের গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ‘গবেষণা, উদ্ভাবন, বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন’ (Research, Innovation, Diffusion and Development, RID&D) নামের একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করছি।

সরকার টাকা পাবে কোথায়?: (১) শোভন সমাজ-অর্থনীতি ব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে রাষ্ট্র-সরকারকে সেসব উৎসে হাত দিতে হবে, যেসব উৎসে অতীতে কখনো হাত দেয়া হয়নি অথবা প্রয়োজনমতো হাত দেয়া হয়নি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে এসব উৎসের অন্যতম হলো সম্পদ কর, অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর, অর্থ পাচার উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, বিদেশী নাগরিকদের ওপর কর, বিভিন্ন কমিশন ও বোর্ড কর্তৃক আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারের সম্পদ আহরণের প্রচলিত বিভিন্ন উৎসে আদায়ের যৌক্তিক বৃদ্ধি। এসবই হবে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য-অসমতা-বিচ্ছিন্নতা দূর করার প্রাথমিক শর্ত। (২) অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মধ্যে এখন পরোক্ষ করের ওপর তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়, যা মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ায়। এখন থেকে পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। (৩) দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যমধ্যবিত্ত মানুষকে সামনের কয়েক বছর আয়করবেষ্টনীর বাইরে রাখতে হবে।

কালো টাকা: ১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৪৬ বছরে বাংলাদেশে সৃষ্ট মোট কালো টাকার আনুমানিক পরিমাণ ৮৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে আমরা পুঞ্জীভূত মোট কালো টাকার মাত্র ২ শতাংশ উদ্ধারের সুপারিশ করছি, যেখান থেকে উদ্ধারকৃত আহরণ হবে ১ লাখ ৭৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

অর্থ পাচার: বিগত ৪৬ বছরে (১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে) দেশের মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমরা পুঞ্জীভূত অর্থ পাচারের মাত্র ১০ শতাংশ উদ্ধার থেকে ৭৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা প্রাপ্তি সম্ভব বলে মনে করি।

দেশে যেভাবে সবকিছু এককেন্দ্রিক বা ঢাকামুখী হচ্ছে তা উন্নয়নসহায়ক নয়। অর্থনীতির অনেক মৌলিক কর্মকাণ্ড (শিল্পায়ন, নগরায়ণ) থেকে শুরু করে অনেক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড (দপ্তর, অধিদপ্তর, এমনকি মন্ত্রণালয়) রাজধানী ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা যুক্তিসংগত।

৬। বিকল্প বাজেটে কাঠামোগত মৌলিক পরিবর্তন কোথায়?

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকার বিকল্প বাজেটের অন্যতম প্রধান পরিবর্তন সূচক বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

আমাদের বাজেটের আকার ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা (সারণি ১)। চলমান অর্থবছরের ২০২১-২২ সরকারের বাজেটের তুলনায় আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৩.৪ গুণ বড়।

আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয় থেকে আসবে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বাজেট বরাদ্দের ৯১.২ শতাংশের জোগান দেবে সরকারের রাজস্ব আয় (সারণি ২)। বাকি ৮.৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা হবে বাজেট ঘাটতি। আমাদের প্রস্তাবে ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ নিটের কোনো ভূমিকা থাকবে না, যা চলতি অর্থবছরের সরকারি বাজেটে ঘাটতি পূরণে ৪৬.৪ শতাংশ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি পূরণে আমরা বৈদেশিক ঋণের দ্বারস্থ হতে চাই না। আবার একই সঙ্গে বাজেটের ঘাটতি পূরণে আমরা দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব রাখিনি। কারণ, দেশীয় ব্যাংকের ঋণ অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে।

প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে মোট রাজস্ব থেকে আয় হবে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা সরকার প্রস্তাবিত চলমান অর্থবছরের (২০২১-২২) চেয়ে ৪.৭৬ গুণ বেশি (সারণি ২); আর প্রস্তাবিত মোট ব্যয় বরাদ্দ হবে ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা চলমান বছরের সরকারি বাজেটের তুলনায় ৩.৪ গুণ বেশি।


প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেট অর্থায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না। সুদাসলসহ বৈদেশিক ঋণ থেকে মুক্ত হওয়ার পক্ষে আমাদের অবস্থান।

আমাদের প্রস্তাবে বাজেটের ব্যয় বরাদ্দ কাঠামোতে গুণগত রূপান্তর ঘটবে। মোট বরাদ্দে এবং আনুপাতিক বরাদ্দে উন্নয়ন বাজেট হবে পরিচালন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি, যা এখন ঠিক উল্টো। এখন উন্নয়ন-পরিচালন বাজেট বরাদ্দের অনুপাত ৩৯:৬১, যা আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে হবে ৬৬:৩৪ (সারণি ৩)। আমাদের প্রস্তাবে উন্নয়ন বরাদ্দ চলমান সরকারি বাজেটের তুলনায় ৫.৭৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায় উন্নীত হবে, আর পরিচালন বরাদ্দ (যার ৮০-৮৫% বেতন-ভাতা) এখনকার তুলনায় ১.৮৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। আমাদের প্রস্তাবে পরিচালন বাজেট বরাদ্দ যে এখনকার তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে, তার প্রধান কারণ—আমরা ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি যৌক্তিক মনে করি, যেখানে বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ পরিচালন বাজেটভুক্ত।

আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী বাজেটের আয় কাঠামোতে মৌলিক গুণগত রূপান্তর ঘটবে। প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে সরকারের মোট রাজস্ব আয় হবে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৭৭ শতাংশ হবে প্রত্যক্ষ কর এবং ২৩ শতাংশ পরোক্ষ কর। কাঠামোগত এ পরিবর্তনটি মৌলিক। কারণ, সরকার প্রস্তাবিত চলমান অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের ৪৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর এবং ৫৪ শতাংশ পরোক্ষ কর। আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটের আয় কাঠামোতে যেহেতু ধনী ও সম্পদশালীদের ওপর কর (নতুন নতুন করসহ) অতীতের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে এবং একই সঙ্গে যেহেতু ব্যয় কাঠামো হবে প্রগতিমুখী, সেহেতু বিকল্প বাজেট বাস্তবায়ন করলে তা যৌক্তিক কারণেই সমাজে আয় বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য, স্বাস্থ্য বৈষম্য, শিক্ষা বৈষম্যসহ সামাজিক বৈষম্য ও ক্রমবর্ধমান অসমতা হ্রাস করবে।

৭। বিকল্প বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ হবে কোথায়?

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জনগণতান্ত্রিক বাজেটে ব্যয় বরাদ্দে আমরা কয়েকটি বড় মাপের পরিবর্তন-সংস্কার প্রস্তাব করছি: অতিকেন্দ্রীভূত
শাসনব্যবস্থাকে তৃণমূল-মানুষমুখী ও গণমুখী করার লক্ষ্যে আমরা যেমন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ভৌগোলিকভাবে স্থানান্তরের প্রস্তাব করছি, তেমনি জনসমৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রয়াস হিসেবে আমরা দুটি নতুন মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যমান মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৬টি নতুন বিভাগ/ ডাইরেক্টরেট গঠন এবং এ লক্ষ্যে বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। আমাদের প্রস্তাবিত নতুন মন্ত্রণালয়দ্বয় হলো: (১) গণপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং (২) গবেষণা, উদ্ভাবন, বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। আর বিদ্যমান বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে ১৬টি নতুন বিভাগ/ ডাইরেক্টরেট প্রস্তাব করছি, তা হলো নিম্নরূপ: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন—(১) প্রবীণ হিতৈষী বিভাগ, (২) দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকুশলতা উন্নয়ন বিভাগ, (৩) নারীর ক্ষমতায়ন বিভাগ (গ্রাম ও শহরের দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ও নারীপ্রধান খানা), (৪) আদিবাসী মানুষের জীবনকুশলতা উন্নয়ন বিভাগ, (৫) শিশুবিকাশ বিভাগ, (৬) বিধিবদ্ধ রেশনিং বিভাগ (দরিদ্র-প্রান্তিক-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য), (৭) সার্বজনীন পেনশন বিভাগ, (৮) দরিদ্র-প্রান্তিক-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন—(৯) জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন—(১০) নারীর বিজ্ঞান শিক্ষা বিভাগ, (১১) কারিগরি শিক্ষা বিভাগ, (১২) মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন—(১৩) কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিভাগ, (১৪) হাওর-বাঁওড়-বিল-চর উন্নয়ন বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন—(১৫) অর্থনৈতিক কূটনীতি বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন—(১৬) অণু ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিভাগ।

আমাদের বাজেট যেহেতু জনগণতান্ত্রিক বাজেট, সেহেতু মোট বাজেট বরাদ্দের অগ্রাধিকারক্রম হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ: সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত (বাজেট বরাদ্দের ২১.৪ শতাংশ), তারপর শিক্ষা ও প্রযুক্তি (১১.৮ শতাংশ), তারপর কৃষি (৯ শতাংশ), তারপর জনপ্রশাসন (৮.২ শতাংশ), তারপর স্বাস্থ্য (৭.৭ শতাংশ) ইত্যাদি।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত: শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে চলতি অর্থবছর ২০২১-২২ এর বাজেটে সরকারের মোট বরাদ্দ (পরিচালন + উন্নয়ন) ছিল ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। শিক্ষার অগ্রাধিকার এবং বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে আমরা এ খাতের জন্য আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ৪১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করছি, যা আমাদের মোট প্রস্তাবিত বরাদ্দের ১১.৮ শতাংশ এবং চলমান বাজেট বরাদ্দের তুলনায় ২.৫৪ গুণ বেশি। ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাতে আমাদের এই বরাদ্দ প্রস্তাব বর্তমান জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশের সমান।

‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাত নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য: (১) ‘শিক্ষা’ ও ‘প্রযুক্তি’কে এখন একসঙ্গে দেখিয়ে সরকার বলেন যে তারা শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেন। দাবিটা সঠিক নয়। আমাদের প্রস্তাব হলো ‘শিক্ষা’ ও ‘প্রযুক্তি’কে দুটি ভিন্ন খাত হিসেবে দেখাতে হবে। যে ক্ষেত্রে ‘শিক্ষা ও গবেষণা’ হবে একটি খাত আর ‘প্রযুক্তি’ হবে অন্য খাত। একই সঙ্গে ‘শিক্ষা ও গবেষণা’ বাজেট বরাদ্দ হবে কমপক্ষে জিডিপির ৫ শতাংশ। আমরা সেটাই প্রস্তাব করছি। শুধু ‘শিক্ষা ও গবেষণা’ খাতে আমাদের প্রস্তাবিত বরাদ্দ ১ লাখ ৫০ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। (২) প্রচলিত বাজেটে কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে একসঙ্গে এক খাতভুক্ত হিসাবে দেখানো হয়। আমরা তা অযৌক্তিক মনে করি। ‘কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘মাদ্রাসা শিক্ষার’ উদ্দেশ্য ভিন্ন, সে কারণেই আমরা তা ভিন্নভাবে দেখানো যৌক্তিক বলে মনে করি। আমরা সেটাই করেছি এবং দুটি ভিন্ন বিভাগে রূপান্তরের প্রস্তাব করছি। আমাদের প্রস্তাবে কারিগরি শিক্ষা বিভাগে মোট বরাদ্দ ৩২ হাজার ১২৪ কোটি টাকা, আর মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে (ধর্মভিত্তিক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ৩ হাজার কোটি টাকা। (৩) শিক্ষা খাতে আমরা ‘নারীর বিজ্ঞান শিক্ষা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছি। এজন্য আগামী ৫ বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকাসহ আসন্ন বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।

গবেষণাসংশ্লিষ্ট বাজেট ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাতের অন্তর্গত বিধায় উল্লেখ জরুরি যে এ বছরই প্রথম আমরা ‘গবেষণা, উদ্ভাবন, বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন’ নামে একটি ভিন্ন (নতুন) মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব করছি। আর এই মন্ত্রণালয়ের জন্য আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমাদের প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৮০ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী ৫ বছরের জন্য (২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত) মোট ৪ লাখ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য খাত: মানুষের সুস্বাস্থ্য—শোভন জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা একেবারেই বেহাল; স্বাস্থ্য খাত এখন বৈষম্য সৃষ্টি ও দারিদ্র্য সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম; দেশে আসলেই তেমন কোনো শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত নেই; নেই জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ বলে কোনো কিছুর তেমন অস্তিত্ব। স্বাস্থ্য খাতে এখন সরকারি বরাদ্দ ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আমরা এ বরাদ্দ ৪.৮৩ গুণ বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি।

আমরা মনে করি, বর্ধিত স্বাস্থ্য বরাদ্দ সেসব খাত-উপখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবাহিত করা সমীচীন হবে, যার ফলে জনগণের সুস্বাস্থ্য-মধ্যস্থতাকারী জীবনসমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। আর সে লক্ষ্যে বর্ধিত স্বাস্থ্য বরাদ্দ যেসব খাত-উপখাতসহ মানুষের জন্য উদ্দিষ্ট হতে হবে তার মধ্যে থাকবে—প্রাথমিক-মধ্যবর্তী-উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা; সব ধরনের ‘দারিদ্র্যের রোগ’ (যক্ষ্মা, শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণ, প্রজননতন্ত্রের রোগ, জন্মদান প্রক্রিয়ার মা ও শিশুস্বাস্থ্য, ম্যালেরিয়া, ডায়েরিয়া, হাম, খাবার পানিতে আর্সেনিক-উদ্ভূত আর্সেনিকোসিস রোগ); গ্রামের ও নগরের দরিদ্র-প্রান্তস্থ মানুষ; সব ধরনের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জেনোমিক মেডিসিনে বিনিয়োগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রস্তাবে উল্লিখিত বিষয়াদির পাশাপাশি যে বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহ বিবেচনা করেছি, তা হলো সরকার প্রতিশ্রুত ‘গ্রাম হবে শহর’-এর আওতায় সম্ভাব্য সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা প্রদানে যথাসাধ্য বিকেন্দ্রীভূত করার মতো কাঠামো গড়ে তোলা।

আমাদের দেশে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সিস্টেম’ বলে কোনো কিছুই তেমন নেই। এ নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান দুটি ডাইরেক্টরেটের পাশাপাশি আরো একটি ডাইরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার নাম হবে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ডাইরেক্টরেট’। বিকল্প বাজেটে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত এ নবসৃষ্ট বিভাগে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ। সুবিন্যস্ত ও কার্যকর ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠায় মোট লাগবে আনুমানিক ৩ লাখ কোটি টাকা, যা পরবর্তী কয়েক বছরের বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ হলো ‘মানবসম্পদ’ সৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ, এ বিনিয়োগ নিয়ে আপস হবে আত্মঘাতী। জনগণের স্বাস্থ্য মুক্তবাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া মহাঅন্যায় এবং তা আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত: প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রধিকার খাত হলো ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত’। এ খাতে এখন সরকারি বরাদ্দ ৩৪ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসসহ ‘কভিড-১৯’-এর লকডাউন-উদ্ভূত মহাবিপর্যয় এবং সামনের দিকে অনিশ্চয়তা—এসব কারণে আমরা এ বরাদ্দ ১২.৭৬ গুণ বাড়িয়ে ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করছি।

২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে অন্তত আগামী পাঁচ বছরের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ’ খাতের আওতায় আমরা বেশকিছু নতুন বিভাগ/ডাইরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা এবং সংশ্লিষ্ট বাজেট প্রস্তাব করছি। আমাদের প্রস্তাবগুলো নিম্নরূপ: (১) আজকের এবং ভবিষ্যতের প্রবীণ মানুষদের অবদান, জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ‘উন্নয়ন-ধাক্কায়’ প্রবীণদের পিছলেপড়া আর জীবনের ভঙ্গুরতা-একাকিত্ব-নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধির কারণে আমরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘প্রবীণ হিতৈষী বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করছি। এ লক্ষ্যে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরের (২০২৬-২৭) জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। (২) দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকুশলতা উন্নয়ন বিভাগ (গ্রাম-শহর, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান-অনানুষ্ঠানিক, কৃষি, শিক্ষা, সেবা)—প্রস্তাবিত বরাদ্দ আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরে মোট পাঁচ লাখ কোটি টাকা। (৩) নারীর ক্ষমতায়ন বিভাগ (গ্রাম ও শহরের দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ও নারীপ্রধান খানা): প্রস্তাবিত বরাদ্দ আসন্ন অর্থবছরে ৪০ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী ৫ বছরে মোট ২ লাখ কোটি টাকা। (৪) আদিবাসী মানুষের জীবনকুশলতা বিকাশ বিভাগ: প্রস্তাবিত বরাদ্দ আসন্ন অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা। (৫) শিশুবিকাশ বিভাগ: প্রস্তাবিত বরাদ্দ—আসন্ন অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা। (৬) বিধিবদ্ধ রেশনিং বিভাগ (দরিদ্র-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষসহ): প্রস্তাবিত বরাদ্দ—আসন্ন অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা। এবং (৭) সর্বজনীন পেনশন বিভাগ: প্রস্তাবিত বরাদ্দ আসন্ন অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকাসহ আগামী পাঁচ বছরে মোট ৩ লাখ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি বরাদ্দ এখন ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। আমরা এ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি, যার মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে বর্তমান ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকার বরাদ্দ ১৫.৪ গুণ বৃদ্ধি করে ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগে ২৫ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার বরাদ্দ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করছি। বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে আমরা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ওপর জোর দেয়ার কথা বলেছি।

পরিবহন ও যোগাযোগ খাত: পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বর্তমান সরকারি বরাদ্দ ৭২ হাজার ২৮ কোটি টাকা। বিকল্প বাজেটে আমরা এ বরাদ্দ ১.৭১ গুণ বৃদ্ধি করে ১ লাখ ২৩ হাজার ১০ কোটি টাকা প্রস্তাব করছি।

সমগ্র পরিবহন ব্যবস্থায় জনদুর্ভোগ এবং শোভন জীবনব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে এ বছর আমরা ‘গণপরিবহন মন্ত্রণালয়’ (Ministry of Public Transport) নামে একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছি। প্রস্তাবিত গণপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্য আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাবসহ আগামী পাঁচ বছরে মোট ৫ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।

ঋণের সুদ: বৈদেশিক ঋণের সুদাসল পরিশোধ বাবদ আমরা আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি। চলতি বাজেটে বৈদেশিক ঋণের সুদ খাতে সরকারের বরাদ্দ ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। আমরা চাই, একদিকে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করতে, আর অন্যদিকে চাই মূল ঋণ ও সুদ পরিশোধে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে। এ বছরের বাজেটে আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা এবং এজন্য ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।

প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে বড় ধরনের কাঠামোগত বিন্যাস হবে এ রকম যে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গৃহায়ন—এ চার খাতে সম্মিলিত বরাদ্দ হবে মোট বাজেটের ৪৫.২ শতাংশ।

৮। বিকল্প বাজেটে আয় আসবে কোথা থেকে?

আমরা বাজেটে সরকারের আয়ের ২৭টি নতুন উৎস প্রস্তাব করছি। বাজেটে আয় বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাবিত ২৭টি নতুন উৎস হলো: (১) কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, (২) অর্থ পাচার উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, (৩) সম্পদ কর, (৪) অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর (অনলাইন ব্যবসা-বাণিজ্যসহ), (৫) বিলাসদ্রব্য/ পণ্যের ওপর কর, (৬) সংসদ সদস্যসহ অন্যদের ওপর গাড়ির শুল্ক মওকুফ বাতিল-উদ্ভূত আহরণ, (৭) বিদেশী নাগরিকদের ওপর কর, (৮) সেবা থেকে প্রাপ্ত কর, (৯) বিমান পরিবহন ও ভ্রমণ কর, (১০) রয়্যালটি ও সম্পদ থেকে আয়, (১১) প্রতিরক্ষা বাবদ প্রাপ্তি, (১২) রেলপথ, (১৩) ডাক বিভাগ, (১৪) সরকারের সম্পদ বিক্রয়, (১৫) সেচ বাবদ প্রাপ্তি, (১৬) তার ও টেলিফোন বোর্ড, (১৭) টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন, (১৮) এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, (১৯) ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি কমিশন, (২০) সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, (২১) বিআইডব্লিউটিএ, (২২) পৌর হোল্ডিং কর, (২৩) ডিজি থেলথ: বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনুমতি ও নবায়ন ফিস, (২৪) ডিজি ড্রাগস: ওষুধ প্রস্তুতকারী কোং লাইসেন্স এবং নবায়ন ফি, (২৫) বিউটি পার্লার সেবালব্ধ কর, (২৬) আবাসিক হোটেল/গেস্ট হাউজ ক্যাপাসিটি কর, (২৭) বিদেশী পরামর্শ ফি (সারণি ২)।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী কর্তৃক পেশকৃত ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মোট রাজস্ব ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। আর আমরা আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিকল্প বাজেটে ওই আয় ৪.৭৬ গুণ বৃদ্ধি করে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করছি।

২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি প্রস্তাবে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডনিয়ন্ত্রিত করসমূহ’ ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা (যা ছিল মোট আয়ের ৮৪ শতাংশ)—আমাদের প্রস্তাবে এই আয় ৩.৬৩ গুণ বেড়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ১০০ কোটি টাকায় (যা আমাদের প্রস্তাবিত মোট আয়ের ৬৪ শতাংশ)। আয়ের উপখাত ‘আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর’ থেকে চলতি অর্থবছরে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা (মোট আয়ের ২৬.৭ শতাংশ)­—এ খাতে আমরা ৫.১০ গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছি, যার ফলে এ উপখাত থেকে আয় হবে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (যা প্রস্তাবিত মোট আয়ের ২৮.৬ শতাংশ)। ‘মূল্য সংযোজন কর’ খাতে আমরা বর্তমানে সরকার প্রস্তাবিত ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার (৩২.৬ শতাংশ) ১.১ গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছি­­—ফলে আমাদের প্রস্তাবে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ‘মূল্য সংযোজন কর’ থেকে আয় হবে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা (যা আমাদের প্রস্তাবিত মোট আয়ের ৭.৫ শতাংশ)।

‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর’-এর অন্তর্ভুক্ত খাত-উপখাত বিচারে আমরা প্রচলিত ছকের বাইরে বেরিয়ে নতুন কিছু উৎস থেকে আয়ের প্রস্তাব করেছি। যেমন বিদেশী নাগরিকদের ওপর ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কর; সেবা থেকে প্রাপ্ত কর ৬ হাজার কোটি টাকা; বিমান পরিবহন ও ভ্রমণ কর ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা—এসবই নতুন উৎস থেকে কর আহরণ প্রস্তাব।

আসন্ন অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদে আর্থসামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং কভিড-১৯সহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার অভিঘাত মোকাবেলার কারণে আমরা দুটো বড় আকারের উৎস চিহ্নিত করেছি, যা ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর’ খাতে আয়ের উৎস হিসেবে নতুন। এ দুটি উৎস হলো সম্পদ কর, যা থেকে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা (যা হবে সরকারের মোট আয়ের ১১.২ শতাংশ) এবং অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর, যা থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা (যা সরকারের আয়ের ৪ শতাংশ) আহরণের প্রস্তাব করেছি।

আয়ের খাত হিসেবে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত কর’ খাতে আমরা সরকারের বর্তমান নির্ধারিত ১৬ হাজার কোটি টাকা ৮.৪৮ গুণ বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রস্তাব করছি। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হচ্ছে মাদক শুল্ক খাতে বর্তমানে ১৩৮ কোটি টাকা থেকে আমাদের প্রস্তাবে ৩০ হাজার কোটি টাকা (২১৭ গুণ বৃদ্ধি), যানবাহন কর ৮০০ কোটি টাকা থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা, ভূমি রাজস্ব খাতে ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা।

চলমান অর্থবছরে ‘কর ব্যতীত প্রাপ্তি’ উপখাতে সরকারের প্রস্তাব ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা, আর আমরা তা ১১.৫ গুণ বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করছি ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। আমাদের প্রস্তাব হলো: লভ্যাংশ ও মুনাফা খাতে এখনকার (২০২১-২২ অর্থবছরের) ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা থেকে ১৪.৬ গুণ বৃদ্ধি করে ৩০ হাজার ২০০ কোটি টাকা; জরিমানা, দণ্ড ও বাজেয়াপ্তকরণ উপখাতে ৪৬৩ কোটি টাকা থেকে ১৭৩ গুণ বৃদ্ধি করে ৮০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; কর ব্যতীত অন্যান্য রাজস্ব প্রাপ্তিতে ৭ হাজার ১১২ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমাদের প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের ২৭টি নতুন উৎসের মধ্যে মাত্র পাঁচটি উৎস যেমন— (১) ‘সম্পদ কর’ (২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা), (২) অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর (৭৫ হাজার কোটি টাকা), (৩) অর্থ পাচার রোধ থেকে প্রাপ্তি (৭৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা), (৪) কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি (১ লাখ ৭৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা) এবং (৫) বিলাসদ্রব্য/ পণ্যের ওপর কর (আমদানি শুল্কের আওতায়) থেকে প্রাপ্তি (১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা)—থেকেই সরকার মোট ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৬০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারেন। এই নতুন ৫ উৎস থেকে আহরণ সম্ভাব্য মোট আয় হবে আমাদের প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ৩১.৬ শতাংশের সমপরিমাণ।

প্রস্তাবিত এ পাঁচ উৎসের সম্ভাব্য প্রাপ্তি ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৬০ কোটি টাকা দিয়ে সরকার যা যা করতে পারবেন, তা হলো (১) ৯৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মানুষ বাঁচাও কর্মসূচি বাস্তবায়ন’সহ বিধিবদ্ধ রেশনিং বিভাগ (বরাদ্দ ৬০ হাজার কোটি টাকা), (২) স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিভাগ ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগ’—ব্যয় হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা, (৩) প্রস্তাবিত ‘প্রবীণ হিতৈষী বিভাগ’—৫ হাজার কোটি টাকা, (৪) দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য প্রস্তাবিত গৃহায়ন বিভাগ—৮০ হাজার কোটি টাকা, (৫) কভিড-১৯-এ নিঃস্ব অণু-ব্যবসায়ী প্রায় ৪৭ লাখ ফেরিওয়ালা, হকার, ভ্যানে পণ্যবিক্রেতা, চা-পান বিক্রেতাদের জন্য এককালীন ১০ হাজার কোটি টাকা অনুদানসহ অণু ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিভাগের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকা, (৬) প্রস্তাবিত শিশুবিকাশ বিভাগ—৬০ হাজার কোটি টাকা, (৭) প্রস্তাবিত দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকুশলতা উন্নয়ন বিভাগ—১ লাখ কোটি টাকা, (৮) নারীর বিজ্ঞান শিক্ষা বিভাগ—৬ হাজার কোটি টাকা, (৯) কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিভাগ— ৪০ হাজার কোটি টাকা, (১০) গবেষণা, উদ্ভাবন, বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা—৮০ হাজার কোটি টাকা, (১১) গণপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা—১ লাখ কোটি টাকা এবং (১২) সর্বজনীন পেনশন বিভাগ—৬০ হাজার কোটি টাকা। এখানে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন হলো—সরকার এসব জরুরি কাজ করতে ইচ্ছুক কিনা এবং আমাদের নির্দেশিত আয়ের ওইসব উৎসে হাত দেবেন কিনা?

আমরা বাজেট ঘাটতি কমানোর পক্ষে। আমাদের প্রস্তাবিত মোট বাজেট সরকার প্রস্তাবিত চলমান অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ৩.৪ গুণ বড়, কিন্তু আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি মোট বাজেটের ৮.৭৮ শতাংশ। অথচ চলমান সরকারি বাজেটে তা ৩৪.৯৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নে আমরা দুটি নতুন উৎসের কথা বলেছি—‘বন্ড মার্কেট’ এবং ‘সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্ব’। প্রস্তাবিত এ দুটি নতুন উৎস থেকে পাওয়া যেতে পারে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ৭২.২ শতাংশ ঘাটতি অর্থায়ন পূরণ করতে সক্ষম।

আমাদের বিকল্প বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয় হবে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সরকারপ্রদত্ত বাজেটের তুলনায় ৪.৭৬ গুণ বেশি। সরকারের ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় আমাদের প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিকল্প বাজেটে এই বৃদ্ধি হবে প্রধানত তিনটি কারণে: (১) আয়ের বিভিন্ন উৎসে যৌক্তিক বৃদ্ধি—যেমন আয় ও মুনাফার ওপরে কর, আমদানি শুল্ক, মাদক শুল্ক, যানবাহন কর, ভূমি রাজস্ব, লভ্যাংশ ও মুনাফা, জরিমানা-দণ্ড-বাজেয়াপ্তকরণ, টোল, ভাড়া ও ইজারা, সরকারের সম্পদ বিক্রয়। বিভিন্ন উৎসে এ বৃদ্ধির পরিমাণ হবে এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ থেকে ২১৭ গুণ পর্যন্ত (যেমন মাদক শুল্ক)। (২) কোনো কোনো উৎসের ক্ষেত্রে করের হার পরিবর্তন না করে শুধু কর আদায়ের প্রক্রিয়া জোরদার করে—যেমন আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর এবং রফতানি শুল্ক। (৩) প্রস্তাবিত নতুন উৎসগুলো থেকে রাজস্ব প্রাপ্তি—যেমন ২৭টি নতুন উৎস, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো সম্পদ কর, অর্থ পাচার উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর এবং বিলাসদ্রব্য/পণ্যের ওপর কর।

৯। শোভন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণতান্ত্রিক বাজেট—উপসংহার

২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বিকল্প জনগণতান্ত্রিক বাজেটে আমরা মোট ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকার ব্যয় বরাদ্দ প্রস্তাব করছি, যা সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ৩.৪ গুণ বেশি। আমাদের প্রস্তাবনায় বাজেটের আকারই শুধু তুলনামূলক বড় নয়, সেই সঙ্গে কাঠামোগত বড় পরিবর্তন যেক্ষেত্রে ঘটছে তা হলো মোট বাজেটে উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেট বরাদ্দের অনুপাত। চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেটে যেখানে উন্নয়ন : পরিচালন বাজেট বরাদ্দ অনুপাত ৩৯ : ৬১ সেখানে আমাদের প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ বিকল্প বাজেটে উন্নয়ন : পরিচালন বাজেট বরাদ্দ অনুপাত হবে ৬৬ : ৩৪ (সারণি ৩)।

আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটকে শুধু উন্নয়নমুখী বলাই যথেষ্ট নয়। খাতওয়ারি বরাদ্দ কাঠামো যা, তাতে বলতেই হবে যে আমাদের প্রস্তাবিত বরাদ্দ কাঠামো বৈষম্য-দারিদ্র্য নিরসনমুখী, প্রকৃতি-পরিচর্যামুখী, উৎপাদনমুখী, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিমুখী, শিল্পায়নমুখী, কৃষির বিকাশমুখী, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিমুখী, মানবসম্পদ ও মানবপুঁজি সৃষ্টি ও তার বিকাশ ত্বরান্বয়নমুখী এবং বিজ্ঞান-উদ্ভাবন-প্রযুক্তি বিকাশমুখী। এসব উপসংহারে উপনীত হওয়ার কারণ অনেক, যার মধ্যে অন্যতম হলো: (১) চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সরকার প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে মোট বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ৩.৪ গুণ, সেখানে একই সময়ে উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ৫.৭৫ গুণ আর পরিচালন বাজেট ১.৮৮ গুণ। (২) ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দ-অগ্রাধিকার অধিকতর প্রগতিমুখী।

একটি জনগণতান্ত্রিক বাজেট বিধায় ২০২২-২৩-এর বিকল্প বাজেটে আমরা বেশকিছু নতুন সুনির্দিষ্ট ব্যয়-বরাদ্দ খাত-উপখাত (যা সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে থাকে না) বরাদ্দসহ প্রস্তাব করেছি যার মধ্যে অন্যতম কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিভাগ প্রতিষ্ঠা; শিল্পায়ন ত্বরান্বয়ন; অনু ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-উদ্যোক্তা উন্নয়ন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); প্রবীণ হিতেষী (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); দরিদ্র বিত্তহীন-নিন্মবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকুশলতা উন্নয়ন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); বিধিবদ্ধ রেশন ব্যবস্থা প্রবর্তন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); দরিদ্র-প্রান্তিক-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); আদারওয়াইজ অ্যাবল বা প্রতিবন্ধী মানুষ; আদিবাসী মানুষের জীবনকুশলতা (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); হাওর-বাঁওর-বিল-চর অঞ্চলের উন্নয়ন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি সুদবিহীন ঋণ; কৃষকদের কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ; নারীর বিজ্ঞান শিক্ষা (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ; নারীর ক্ষমতায়ন (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা (বিভাগ প্রতিষ্ঠা); জেনোমিক মেডিসিন; নবজাতক শিশুর থাইরয়েড স্ক্রিনিং; স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর নিম্ন ও মধ্য স্তরে ব্যয়বহুল অসংক্রামক (নন-কমিউনিকেবল) রোগের চিকিৎসা (যেমন ক্যানসার, হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিস ইত্যাদি); জাতীয় অনুবাদ প্রতিষ্ঠান; বাংলা উন্নয়ন বোর্ড; পাঠাগার; গবেষণা উদ্ভাবন বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (প্রতিষ্ঠা); গণপরিবহন মন্ত্রণালয় (প্রতিষ্ঠা)।

আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটটি যেহেতু ক্রমবর্ধমান বৈষম্য-অসমতা-দারিদ্র্য হ্রাস উদ্দিষ্ট একটি জনগণতান্ত্রিক বাজেট, সেহেতু আমাদের বাজেটে শুধু ব্যয়-বরাদ্দ খাতগুলোতেই নয়—এসব প্রতিফলিত হয়েছে সরকারের রাজস্ব আয় প্রাপ্তির উৎসগুলোয়ও। আর এ কারণেই রাজস্ব আয় সংগ্রহের যেসব উৎসে আমরা জোর দিয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম হলো আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর (৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা), সম্পদ কর (২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা), অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর (৭৫ হাজার কোটি টাকা), বিলাসদ্রব্য/ পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক (১ লাখ কোটি টাকা), মাদক শুল্ক (৩০ হাজার কোটি টাকা), কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি (১ লাখ ৭৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা) এবং অর্থ পাচার উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি (৭৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা)।

অর্থনৈতিক মন্দা, কভিড-১৯ মহামারী-উদ্ভূত মহাবিপর্যয় আর এখন ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অনিবার্য মারাত্মক অভিঘাত—এসব থেকে মুক্ত হয়ে প্রস্তাবিত আলোকিত মানুষসমৃদ্ধ বৈষম্যহীন ‘শোভন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ-উদ্দিষ্ট আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেট ২০২২-২৩ একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দলিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের মৌল বিধানের ভিত্তিতে প্রণীত মৌলিক রূপান্তরমুখী এ দলিল বাস্তবায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দৃঢ় অঙ্গীকার।

আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বিকল্প বাজেট ২০২২-২৩-এর শেষ কথা, শুরুর কথা এবং সারকথাটি এ রকম: আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেট এ জন্য প্রয়োজন যে কাঠামোগত বিচারে একমাত্র এ ধরনের বাজেটই পারে বিপজ্জনক ক্রমবর্ধমান বৈষম্য-অসমতা-বহুমুখী দারিদ্র্য থেকে জনগণের কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ ঘটাতে। অন্য কোনো ধরনের বাজেট দিয়ে এ কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ-রূপান্তর সম্ভব নয়। আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেট বাস্তবায়ন করলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই একদিকে বিপজ্জনক বৈষম্যপূর্ণ অবস্থা থেকে স্বল্প-বৈষম্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব, অন্যদিকে একই সঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী অবস্থান থেকে শক্তিশালী-টেকসই একটি মধ্যমধ্যবিত্ত শ্রেণী অবস্থানে উত্তরণ-রূপান্তর সম্ভব (দেখুন, ছক ১)। এটাই আমাদের প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেটের মূল উদ্দিষ্ট-অভীষ্ট ও অন্তর্নিহিত শক্তি।

ছক ১: জনগণতান্ত্রিক বাজেট বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরের মধ্যে চলমান বিপজ্জনক বৈষম্য দূর করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন সম্ভব—একটি ধারণাত্মক কাঠামো


সারণি ১: ব্যয়ের বাজেট—২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেট ও সরকারের চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেট


সারণি ২: আয়ের বাজেট­—

২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট ও সরকারের চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেট

সারণি ৩: অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেট ২০২২-২৩ এবং তার সঙ্গে সরকারের চলতি অর্থবছর ২০২১-২২ বাজেটের তুলনা

 

(বাজেট বক্তৃতার সংক্ষিপ্তসার)

(বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কার্যনির্বাহক কমিটির

৯ এপ্রিল ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সভায় অনুমোদিত)

ই-মেইল: bea.dhaka@gmail.com; barkatabul71@gmail.com