এ কে আজাদ, হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানির মাইলফলক অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে বণিক বার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা

স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমাদের রফতানি ৫০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করল। আপনি ব্যক্তি খাতের সর্ববৃহৎ রফতানিকারকের একজন। জাতীয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ব্যাপারটি সত্যিই আনন্দের যে আমাদের রফতানি ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের যে সম্ভাবনা এবং অবকাঠামোগত সাপোর্ট আছে, তাতে আগামী ১০ বছরে ১০০ বিলিয়নে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে এনার্জির ওপর। আমাদের যে অবকঠামো গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে বেশ কয়েকটি ইকোনমিক জোন হয়েছে, সেখানে জমিসহ অন্যান্য অবকঠামো তৈরি হয়েছে, এসব জায়গায় কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ বাইরে থেকে আসেনি, আমরাও করতে পারিনি। আমি ধরে নিলাম, বঙ্গবন্ধু স্পেশাল ইকোনমিক জোন, যেটা মিরসরাইয়ে হয়েছে, সেটা অনেক বড় জায়গা নিয়ে হয়েছে। আমরাও জায়গা নিয়েছি। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগের মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। সে জায়গাগুলোয় যদি আমরা জোর দিই, অর্থাৎ বিনিয়োগের পূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারি—অবকাঠামো, গ্যাস, বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারি—তখন কিন্তু আমরা বিনিয়োগ করব। যখনই দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। এ জায়গাগুলোয় আমরা পিছিয়ে আছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের পোর্টের অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। পোর্টের ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে যে ক্যাপাসিটি আছে, এতে পণ্য খালাস করতে চার-পাঁচদিন লেগে যায়। এটা যেন ২৪ ঘণ্টায় নেমে আসে সে ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের পোর্টগুলো আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। তা না হলে কিন্তু পারব না। সময় অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর। এখন ট্রেন্ড হচ্ছে, কত দ্রুত পণ্যটি বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারে, কত দ্রুত বিনিয়োগ থেকে লাভ উঠে আসে সে প্রতিযোগিতা চলছে। ই-কমার্স যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, গ্রাহকদের মানসকিতাও পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষ কিন্তু এখন দোকানে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চাইছে না। অনলাইনে কেনাবেচা বেড়ে যাচ্ছে। অ্যামাজান এগিয়ে যাচ্ছে। দারাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আলিবাবা সারা বিশ্বে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ কিন্তু ই-কমার্স। এখন যেসব দেশ থেকে আমাদের র ম্যাটেরিয়াল আসে, এর মধ্যে চীা ও ভারত অন্যতম। এসব আসে নৌপথে। ফলে প্রচুর সময় আমাদের চলে যায়। এখনো আমরা সিঙ্গাপুর, হংকং অথবা শ্রীলংকার পোর্ট ব্যবহার করি। এতে আমাদের সময় বেশি লাগছে। এ জায়গায় আমাদের নজর দিতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো নিট পোশাকে আমাদের অভ্যন্তরীণ কাপড় ব্যবহার ভালো হচ্ছে। ৭০-৭৫ শতাংশ আমাদের দেশীয় কাপড়ে তৈরি হচ্ছে। ওভেন পণ্যে আমরা পিছিয়ে আছি। প্রচুর কাপড় আমাদের আনতে হয় চীন, ভারত, পাকিস্তান থেকে। পাকিস্তান থেকে আসতে এখনো ৩০-৪০ দিন সময় লেগে যায়। পাকিস্তান থেকে ডাইরেক্ট ভেসেল আমাদের এখানে আসে। শ্রীলংকা বা মালয়েশিয়া হয়ে আসে।

এভাবে ট্রানজিটেই প্রচুর সময় চলে যায়। পাকিস্তান যে কাপড়টা সস্তায় দিতে পারে, আমি কিন্তু ৫০ সেন্ট পিছিয়ে আছি। ডমেস্টিক প্রডাকশন প্রাইস অনেক হাই। চীনের সঙ্গে আমি পারি না। তো সেই প্রতিযোগিতায় আমি পিছিয়ে আছি। আমার একটাই অ্যাডভানটেজ, কম্পিটিটিভ ওয়ার্কার। সে জায়গায় কিন্তু আমি থাকব না। আগামীতে যে নতুন ওয়েজ বোর্ড আসবে, সেই ওয়েজে কিন্তু আমরা পাকিস্তান ও ভারতের সমপর্যায়ে চলে যাব। তখন কিন্তু কম্পিটিটিভনেস হারিয়ে ফেলব। এসব এখন থেকেই ভাবতে হবে। ২০২৪ সালে আমার নতুন ওয়েজ বোর্ড দিতে হবে। তখন আমার যে কস্ট বেড়ে যাবে, সেটি এখনো আমরা চিন্তা করছি না। আমাদের এখানে প্রচুর ওয়েস্টেজ হচ্ছে। যেহেতু আমাদের নিজস্ব কাপড় নেই, কাপড় যখন আমরা বাইরে থেকে নিয়ে আসছি, ২-৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলংকায় কাটিং থেকে শুরু করে ফিনিশিং পর্যন্ত ১ শতাংশ ওয়েস্ট হয়। এই যে ২ শতাংশ চলে যাচ্ছে, এতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত দেশীয় ফ্যাব্রিকসে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ না হব, ততদিন পর্যন্ত এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে না।

আজ চীন এত বড় কেন? কারণ সবকিছু তার নিজের। ভারত কিন্তু বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাবে, যদি এ জায়গাগুলোয় আমরা হাত না দিই। বেশ কয়েকটি ইকোনমিক জোন প্রজেক্ট তারা হাতে নিয়েছে। বেশ কয়েকটা রাজ্যে তারা বলেছে, যদি এখানে কেউ বিনিয়োগ করে দেশী হোক বা বিদেশী বিনিয়োগকারী হোক তাদের চার বছরের বেতন সরকার দিয়ে দেবে। প্রতিবেশী দেশগুলো কিন্তু বসে নেই। তাদের সঙ্গে আমি প্রতিযোগিতা করব কী নিয়ে? আমার কোনো বেসিক র ম্যাটেরিয়াল নেই। আমাকে সব আমদানি করতে হয়। তাহলে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে দক্ষতা দিয়ে। সেক্ষেত্রে আমাদের বড় সুযোগ ছিল স্বল্পমূল্যে গ্যাস পাওয়া। এখন আমাদের দেশে যে গ্যাস আছে তা সাত-আট বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। জ্বালানি নির্ভর করবে আমদানির ওপর। এখন আমরা ৭০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ গ্যাস ব্যবহার করছি। ৩০ শতাংশ আমদানি করছি এলএনজির মাধ্যমে। যদি শতভাগ গ্যাস আমাকে আমদানি করতে হয়, তাহলে এর ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা সেটিও ভাবার বিষয়। রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যদি দুই বছরের মধ্যে আমরা পাই, তাহলে দুই হাজার মেগাওয়াট পাব। ১০ বছর পর আমার এনার্জি কস্ট কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই জায়গাগুলো এখন থেকেই পরিকল্পনায় নিয়ে আসতে হবে। আমরা যারা বিনিয়োগকারী, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমরা এখন বড় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছি না। আন্তর্জাতিকভাবেও মন্দা দেখা দিয়েছে। এ মন্দা কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত আমরা কিন্তু নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছি না। আমাদের যেসব দেশে রফতানি হয়, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকা ও ব্রাজিল, জাপান এসব দেশে যে এক্সপোর্ট হচ্ছে, তাদের ইনফ্লেশন আট থেকে সাড়ে আটে পৌঁছে গেছে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, এসব দেশে মন্দা দেখা দেয়, তাহলে কিন্তু আমার দেশের রফতানি বাধাগ্রস্ত হবে। আমার রফতানি যদি বাধাগ্রস্ত হয়, প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর যে চাপ পড়বে তা নিয়ে এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে। আমি মনে করি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যদি পরামর্শ করে একটি রোড ম্যাপ প্রণয়ন করে, তাহলে আগামী ৮-১০ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছা সম্ভব।

বলা যায়, শূন্য থেকে আমরা এখন ৫০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছি। সেটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে?

আসলে প্রতিটি সরকারেরই এ ব্যাপারে আমাদের প্রতি খুব সহানুভূতি ছিল। ১৯৮৩ সালে আমাদের ব্যবসা শুরু। আমি ’৮৪-তে আসি। সরকার খুবই ইতিবাচক ছিল। বেশ কয়েকটি সুবিধা দিয়েছে। ট্যাক্স সুবিধা দিয়েছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্ট দিয়েছে। রফতানির ব্যাপারে সব সরকারের ভালো ভূমিকা ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমরা যেকোনো ব্যাপারে গেলে খালি হাতে ফিরে আসিনি। পাশাপাশি শ্রমিক ভাইবোনদের অবদানও আছে। এখানে একক কারো অবদান নয়, সবাই মিলেই এ জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি।

আমরা প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশনের কথা বলি। এটা কি শুধু পোশাক খাতের বেলায়, নাকি এক্সপোর্ট বাস্কেটেরও ডাইভারসিফিকেশনের প্রয়োজন রয়েছে?

আমাদের এক্সপোর্ট একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এটা কিন্তু দেশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় যদি কোনো অসুবিধা হয় তাহলে কোনো বিকল্প নেই। রফতানিমুখী পোশাক শিল্পটা যত সহজ অন্য শিল্পগুলো ততটা সহজ না। যেমন পাটের কিন্তু প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। একসময় পাটই আমাদের একমাত্র রফতানি পণ্য ছিল। কিন্তু এ জায়গায় কোনো রিসার্চ হয়নি। আমাদের কাঁচা পাট ভারত-পাকিস্তানে রফতানি করি। তারা এটাকে আরো ভ্যালু অ্যাড করে অন্য দেশে বাজারজাত করছে। আমরা এ জায়গায় পিছিয়ে আছি। পাটের বহুমুখী ব্যবহার করে এটাকে ভ্যালু অ্যাড করে রফতানি করা সম্ভব। আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে রফতানি করতে হবে। আমাদের মাংস প্রসেস করে আমেরিকায়, ইউরোপে যাওয়া দরকার। মাছ চাষে কিন্তু আমরা ভালো এগিয়েছি। আমাদের কাঁঠাল ও আমও কিন্তু রফতানি করতে পারি। পুরো ইইরোপে আমরা বাইসাইকেল রফতানি করতে পারি। এসব বিষয়ে আমাদের নজর দিতে হবে। আমার প্রতিবেশী দেশ কোথায় কোথায় এগিয়ে যাচ্ছে, আমি কেন সেখানে পারছি না, এ জায়গাগুলোয় আমাদের যেতে হবে। ৮-১০ বছরের মধ্যে পোশাক খাতের ওপর ভর করে আমরা ১০০ বিলিয়নে পৌঁছে যাব, কিন্তু পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতে নজর দিলে ২০০ বিলিয়নে পৌঁছা সম্ভব। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা শ্রমিক। আমাদের শ্রমিকরা খুবই আন্তরিক।

 

শ্রুতলিখন: আল ফাতাহ মামুন