কাজের মাধ্যমেই ড. মসিউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়। ব্যক্তি হিসেবে তিনি আকর্ষণীয়। সেটা আমি বুঝতে পেরেছি তার সঙ্গে আলাপের সময়। যতদূর মনে পড়ে, তিনি যখন এনবিআরে ছিলেন তখন তার সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ করেছি। পরবর্তীকালে তিনি ইআরডির সেক্রেটারি হন। তখনো আমাদের মধ্যে এ আলাপটা ছিল। আর ইআরডি যেহেতু বিআরডিএসের কাছে, সেই সুবাদে আলাপের সুবিধা হয়েছিল। এ আলাপগুলো থেকেই তাকে চেনা ও বোঝার সুযোগ হয়েছিল। বুঝেছিলাম ড. মসিউর একজন প্রগতিশীল মানুষ। বঙ্গবন্ধুরও খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। সবকিছু মিলিয়েই আমাদের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।
তবে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল তার অবসর গ্রহণের পর। তখন তিনি সিভিল সোসাইটিতে কাজ করলেন। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু কন্যার সঙ্গে তিনি কাজ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন গ্রুপেও কাজ করছেন। আমার বেশ শুভাকাঙ্ক্ষী তিনি। সে সুবাদে একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। ওয়ান-ইলেভেনের আগে তিনি আমাকে একবার ফোন করেছিলেন। কোথা থেকে ফোনটা করেছিলেন জানি না, শুধু বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু বের হয়ে যাচ্ছি। আপনারা ভেবেচিন্তে চলবেন।’ পরে জেনেছিলাম তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন।
দেশের নানা পরিবর্তন তো এরপর হলো। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলাম, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হলেন। কাজের সুবাদে তখন আমাদের কথা হতো। এছাড়া অনেকবার বিদেশ সফরে ‘মসি ভাই’য়ের সঙ্গী হয়েছি। বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সাধারণ মিটিংয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন। আমাকে তো থাকতেই হতো। সেই সুবাদেও ড. মসিউর রহমানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। তবে সেটা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। বাজেট নিয়ে আলাপ হতো। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থবছরের পরিকল্পনা হতো।
মসিউর রহমান সুন্দর ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ। কথা খুব কম বলেন কিন্তু যখন বলেন সেটা গুরুত্ব দিয়েই বলেন। বক্তব্যটাও থাকে গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে পদমর্যাদার গৌরব নেই। তিনি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন কিন্তু তিনি যে একজন ক্ষমতাবান মানুষ তা কখনো প্রকাশ করেন না আচরণে। বুঝতে দেন না সেটা। তাই প্রাণ খুলে কথা বলা যায় তার সঙ্গে। এই কিছুদিন আগেও নিউইয়র্কে একই হোটেলে ছিলাম আমরা। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছি। সকালের নাশতাটা করতাম একসঙ্গে আমি, মসি ভাই আর বিরুপাক্ষ পাল। সেখানে বসে কত ধরনের কথাই না হয়েছে। এখান থেকেই বুঝেছি বা তার সঙ্গে কথা বললে অন্যরাও বুঝবেন মসি ভাই একজন পড়ুয়া মানুষ। কেবল পড়েননি, তা ধারণও করেছেন। আর অর্থনীতির বিষয় নিয়ে পড়াশোনা অনেক গভীর। এ অধ্যয়নটাকে তিনি বাস্তবের সঙ্গেও মেলাতে পেরেছেন। এটা খুব কঠিন।
গভর্নর ছিলাম বলে আমি বুঝতে পারি, অর্থ ব্যবস্থার যে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আছে সেখানে ড. মসিউর রহমানের জ্ঞান অনন্যসাধারণ। এগুলো নিয়ে তিনি খুব কথা বলেন। ফেড বা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে এ নিয়ে কীভাবে কাজ হয় তা নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেন মসিউর রহমান।
অধ্যয়নই ড. মসিউর রহমানকে গড়ে দিয়েছে। তার জীবনের একটা বড় পরিবর্তন এসেছিল বোস্টনে। একটু বেশি বয়সেই তিনি পড়তে গিয়েছিলেন সেখানে। তিনি আসলে বইয়ের পোকা। ওখানে পুরনো লাইব্রেরি বা যেখানে যে বই পাওয়া যেত তিনি খুঁজতেন। এখনো নানা সময়ে আমাদের কাছে নতুন বইয়ের খোঁজ করেন।
আরেকটা বিষয় হলো, ড. মসিউর রহমান কখনই পপুলিস্ট না। জনতুষ্টির কথা তিনি ভাবেননি। নীতিনির্ধারকদের খুশি করার চেষ্টা তিনি কখনো করেননি। যেটা আমাদের জন্য প্রয়োজন, সেটাই গুছিয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করেন। আরো একটি গুণ আছে তার। ভিন্নমতকে তিনি অপছন্দ করেন না। হয়তো কোনো ব্যক্তি জনপ্রিয় নন কিন্তু তার কাজটি যদি ভালো হয় তবে প্রশংসা করেন। এটাকে আমি গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে দেখি। আমার মনে হয় মসি ভাইয়ের কাছ থেকে এখানে অনেক কিছুই শেখার আছে।
ড. মসিউর রহমানের একটা আত্মজীবনী লেখা উচিত। সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হবে। বলে রাখা ভালো, প্রশাসক হিসেবে তিনি অনেক মানবতাবাদী। পশ্চিম পাকিস্তান, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় তিনি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ব্যস্ততার মধ্যেও বেশকিছু বই তিনি লিখেছেন। ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট, পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশন ইন শ্রীলংকা, স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট... গণতন্ত্র নিয়েও তিনটি বই লিখেছেন—ডেমোক্রেসি ইন ক্রাইসিস, কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেসি, কনস্টিটিউশন ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। তিনটিই বেশ বড় মাপের প্রকাশনা। এর বাইরে সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। এখন নানা সেমিনার করছেন।
ড. মসিউর রহমানের পেশাদারিত্ব আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি বরাবরই পেশাদার। এ নিয়েও আমাদের মধ্যে নানা ধরনের কথা হয়েছে। তিনি একজন উঁচু মাপের পণ্ডিত ব্যক্তি। সেটাও এ পেশাদারিত্বের মধ্যে পড়ে। আমাদের নীতি কাঠামোর মধ্যে এমন একজন মানুষ থাকাকে আমি আমাদের সৌভাগ্য বলেই মনে করি।
ড. আতিউর রহমান: সাবেক গভর্নর,
বাংলাদেশ ব্যাংক





