১৯৯৯ সালে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার নিজস্ব উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রফতানির ভিত্তি স্থাপিত হয়। যুক্তরাজ্যের বাজারে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কনসেপ্ট সাইক্লিংয়ের কাছে প্রথম এক হাজার ইউনিট বাইসাইকেল রফতানির আদেশ পাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ যাত্রা।

এরপর ধারাবাহিকভাবে খাতটি এগোতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২০টি বাইসাইকেল ও বাইসাইকেল যন্ত্রাংশ উৎপাদক ও রফতানিকারক যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে বিভিন্ন ধরনের ও আকারের বাইসাইকেল ও ই-বাইক রফতানি করছে।

শুরুতে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রফতানির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে তা বেড়ে ২০২১-২২ সালে সর্বোচ্চ ১৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রফতানির পরিমাণ ছিল ১৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগামীতে এ পরিমাণ আরো বেড়ে ১৭০ থেকে ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেঘনা গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার লুৎফুল বারীর মতে, এরই মধ্যে বাইসাইকেল খাতে রফতানির পরিমাণ, গুণগত মান, নকশা ও মূল্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। তবে প্রচলিত বাইসাইকেলের আন্তর্জাতিক বাজার দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। পক্ষান্তরে ই-বাইকের আন্তর্জাতিক বাজার বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকেও এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে ই-বাইক রফতানি শুরু হয়েছে, যদিও এর পরিমাণ এখনো কম।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বর্তমানে গড় বাইসাইকেলের মূল্য প্রায় ৪৫২ মার্কিন ডলার। ইউরোপের সবচেয়ে বড় তিনটি বাইসাইকেল ক্রেতাদেশ হলো যথাক্রমে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স।

আন্তর্জাতিক বাজারের এ পরিবর্তনের মধ্যেই বাংলাদেশের সামনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন লুৎফুল বারী। তার হিসাবে, ২০২৬ সালে বাইসাইকেলের আন্তর্জাতিক বাজার প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ২০৩০ সালে তা ১৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রচলিত বাইসাইকেল রফতানিতে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

এত বড় বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ইবিএর আওতায় বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং চীনের ওপর আরোপিত ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যান্টি-ডাম্পিং সুবিধাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এর মাধ্যমে ইউরোপে একটি স্থিতিশীল বাজারের সম্ভাবনা গড়ে তোলা সম্ভব। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এ সুযোগ অব্যাহত রাখার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশের বাইসাইকেল রফতানির প্রায় ৯৮ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও ব্যাপক সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান লুৎফুল বারী।

সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল আমদানিতে নির্ভরতা এবং স্থানীয়ভাবে কতিপয় যন্ত্রাংশ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা। প্রচলিত বাইসাইকেল আমদানিতে চাহিদার দুর্বলতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে কঠোর পরিপালন ও পণ্যের উৎপত্তি বিধির প্রয়োগ ও চাপ বাড়বে। চীনের ওপর বাইসাইকেল রফতানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কোনো কারণে উঠে গেলে বাংলাদেশের বাইসাইকেল রফতানিতে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।

এছাড়া চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে রফতানি বাজারে মূল্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কঠিন প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে হবে। ফলে ইউরোপের বড় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা ও রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুযোগের পাশাপাশি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।