আমার কাছে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০২৫ সালে দেশটির কনজিউমার রিটেইল মার্কেট বা ভোগ্যপণ্যের খুচরা বাজারের আকার ছিল ৫০ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পসংশ্লিষ্ট কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান উৎসও চীন।
বাণিজ্য ঘাটতি একটি লক্ষণ, আর সক্ষমতার ব্যবধান হলো এর মূল কারণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রফতানি ছিল প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাটি বড়, কিন্তু শুধু বাণিজ্য ঘাটতি দেখলে পুরো ছবিটি দেখা হয় না। কারণ চীন থেকে আমরা শুধু ফিনিশড কনজিউমার গুডস বা প্রস্তুতকৃত ভোগ্যপণ্য কিনি না; উৎপাদন ও রফতানি শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, যন্ত্রাংশ বা উপাদান ও যন্ত্রপাতি ও সেখান থেকে আসে।
তাই প্রশ্ন শুধু ‘আমদানি কীভাবে কমাব?’ নয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এ আমদানিকে কীভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প সক্ষমতায় রূপান্তর করা যায়। আমার মতে, বাণিজ্য ঘাটতি একটি লক্ষণ; সক্ষমতার ঘাটতি হলো মূল কারণ।
সংযোজন থেকে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, একটি পণ্যের সব উপাদান প্রথম দিন থেকেই দেশে তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়। শুরুতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমদানি করতে হয়। এরপর ধাপে ধাপে প্লাস্টিক ও ধাতব অংশ, মোল্ড বা ছাঁচ, হাউজিং বা বহিরাবরণ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। সক্ষমতা বাড়লে পিসিবি অ্যাসেম্বলি, মোটর সংক্রান্ত যন্ত্রাংশ, এলইডি ড্রাইভার ও আরো উন্নত উপাদান দেশেই উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু শুধু চীনা যন্ত্রপাতি কিনলেই এ রূপান্তর সম্ভব নয়। দরকার প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রকৌশলগত জ্ঞান, যৌথ উদ্যোগ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ও দক্ষ মানবসম্পদ। চীনা ও দেশের প্রকৌশলীরা একসঙ্গে কাজ করলে ও স্থানীয় ভেন্ডর ব্যবস্থা গড়ে উঠলে আজকের সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানই কালক্রমে পূর্ণাঙ্গ পণ্য উৎপাদক, তারপর ডেভেলপার হতে পারে। এসএসজির মতো উৎপাদনমুখী ব্যবসার জন্য এটাই বাস্তবসম্মত পথ।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন থেকে শুধু পণ্য নয়, উৎপাদন সক্ষমতা আনা।
চীন থেকে কিনি → চীনের সঙ্গে বাংলাদেশে তৈরি করি → বিশ্বে বিক্রি করি; এটা আমার মতে বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত মডেল। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা কৌশলগত মূল উপাদান আসতে পারে চীন থেকে। বাংলাদেশে যুক্ত হবে স্থানীয় কাঁচামাল, শ্রম, প্রকৌশল, সংযোজন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মাননিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং। তারপর প্রস্তুতকৃত পণ্য চীন বা অন্য বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং সেই আমদানিকে শিল্প সক্ষমতায় রূপান্তর করাই হওয়া উচিত মূল কৌশল। ভিয়েতনাম দেখিয়েছে, এটি সম্ভব।

ছবি: সুপার স্টার
আমাদের সামনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বা ‘বেঞ্চমার্ক’ হতে পারে ভিয়েতনাম। চায়না কাস্টমসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ভিয়েতনাম থেকে চীন প্রায় ৮৮ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে; একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল প্রায় ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন। বিশাল এ ব্যবধান কেবল বাজারে প্রবেশাধিকারের নয়; এটি মূলত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার সুসংহত সংযোগের গল্প।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি এখানে খুবই স্পষ্ট: কেবল বাজারে প্রবেশাধিকার থাকাই যথেষ্ট নয়; গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের অংশ হতে হয়। আমাদের প্রথম দিন থেকেই চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে ফিনিশড গুডস নিয়ে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হবে এমন নয়। বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো মূলত ওইএম, যন্ত্রাংশ ও সাব-অ্যাসেম্বলি সরবরাহকারী হিসেবেও চীনা ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হতে পারে।
বিনিয়োগের সাফল্য কীভাবে মাপব?
আগামী দিনে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ‘কত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এল?’—এটি দেখলেই হবে না। আরো দেখতে
হবে: কত স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি হলো, কত বাংলাদেশী প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করলেন, কত লোকাল ভ্যালু যুক্ত হলো ও সেই বিনিয়োগ থেকে কী পরিমাণ রফতানি আয় তৈরি হলো। এগুলোই মূলত বিনিয়োগের প্রকৃত শিল্প প্রভাব।
চীনা কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা গড়ে, স্থানীয় ভেন্ডর তৈরি করে, আমাদের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেয় ও এখান থেকে আঞ্চলিক বাজারে পণ্য রফতানি করে, তাহলে একই বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয়করণ এবং রফতানি বৃদ্ধি—চারটি সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
গত কয়েক দশকে চীন বাংলাদেশের একটি প্রধান সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। এখন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কটি পরবর্তী ধাপে উন্নীত হওয়া জরুরি: আমদানি → বিনিয়োগ → প্রযুক্তি → স্থানীয়করণ → রফতানি। এক্ষেত্রে সরকারের কাজ হবে পূর্বাভাসযোগ্য নীতি, বন্দর ও কাস্টমসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়ন, মান পরীক্ষা ও প্রত্যয়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কার্যকর বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের মূল দায়িত্ব হবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অটোমেশন, পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণন সক্ষমতা জোরদার করা।
আমাদের লক্ষ্য বাণিজ্য কমিয়ে ঘাটতি কমানো নয়; উৎপাদন ও রফতানি বাড়িয়ে ঘাটতি কমানো। চীন থেকে শুধু পণ্য নয়, উৎপাদনের সক্ষমতা আনতে হবে। বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন করতে হবে। তারপর সেই সক্ষমতা নিয়ে বিশ্ববাজারে যেতে হবে। আমার বিশ্বাস, এটাই হতে পারে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস অব চায়না; জাতীয় সংসদ/বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস অব চায়না










