ঐতিহাসিক চব্বিশের আগস্টের বিশের পর কোনো এক দিন অফিসে বসে আছি। আমাদের ফটোসাংবাদিক কাজী সালাহউদ্দীন রাজু আমার ডেস্কে এসে বললেন, ভাই একটু ওপাশে চলেন। মানে, আমাদের অফিসের পূর্ব পাশের ফ্লোরে। আমি বললাম, ‘কোনো দরকার রাজু?’ ও বলল, ‘জি ভাই’। বললাম, ‘ওপাশে কেন, যদি সম্ভব হয় এখানেই বলেন।’ রাজু বলল, ‘না ভাই, একটু ওপাশেই যেতে হবে। নাফিজের বাবা এসেছে। ওপাশে বসা আছে। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়।’ আমি বললাম, ‘কার কথা বললেন?’ ও বলল, ‘গোলাম নাফিজের বাবা। আমার ও জীবনের তোলা যে ছবি নিয়ে আপনি লিখেছেন বণিক বার্তায়। ৪ আগস্ট ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ গোলাম নাফিজ। যার গুলিবিদ্ধ শরীর এপাশ-ওপাশ দুলছিল রিকশার পাটাতনে।’
গোলাম নাফিজের নাম আর ওর বাবার কথা শুনেই আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোলাম নাফিজের ছবিটি। অভ্যুত্থানে শহীদ সন্তানের পিতার সামনে যেতে আমার বুকে একটু তিরতির করে কাঁপন ধরে গেল। সন্তানহারা এ পিতার সামনে গিয়ে আমি ঠিক কী বলব, উনাকে কী সান্ত্বনা দেব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
আমি রাজুকে বললাম, ‘আপনি যান, আমি আসতেছি।’ রাজু চলে যাওয়ার পর, আমি পানি খেলাম। একটু লম্বা দম নিলাম। এক শহীদ পিতার সামনে গিয়ে বসার জন্য নিজেকে একটু প্রস্তুত করলাম।
২.
নাফিজের বাবার সঙ্গে কী কথা বলেছিলাম, আর কী কথা বলতে পারিনি তাই আপনাদের বলব। তার আগে একটু পেছন ফিরে দেখতে পারি আমরা। বছর ঘুরেছে। কিন্তু স্মৃতিটা এখনো তাজা। ৪ আগস্ট ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নিয়েছে সরকার পতনের আন্দোলনে। নয় দফার আন্দোলন চলে এসেছে এক দফায়। সরকার সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ চলছে। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসছে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। চারপাশে কাঁদানে গ্যাসের শেলের ঝাঁজ। সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলিতে প্রকম্পিত ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের একটি এলাকা ফার্মগেট। ফার্মগেটের কালো পিচের রাস্তায় একটি রিকশা। রিকশার সিটে বসা চালক। পাদানিতে আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে এক তরুণ। পরনে নীল টি-শার্ট। আকাশের দিকে মুখ। চোখ বন্ধ। কপালে বাঁধা স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার ফিতা। হয়তো তরুণটি গুলিবিদ্ধ। হয়তো তরুণটি বেঁচে আছে। নাকি পরিণত হয়ে গেছে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত লাশের সংখ্যায়? ছবিটি দেখে আমরা তা বুঝতে পারি না। তবে পত্রিকায় ছাপা ক্যাপশন দেখে আমরা সেদিন বুঝতে পারি, গুলিবিদ্ধ তরুণ তখনো বেঁচে ছিলেন।
৫ আগস্ট ওপরের দৃশ্যকল্পের ছবি ছাপা হয়েছিল ঢাকার দু-তিনটি পত্রিকায়। দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্র সাংবাদিক জীবন আহমেদ। জীবনের তোলা ছবিটির ফ্রেম ক্লোজ শট। যেনবা রিকশায় আড়াআড়িভাবে পড়ে থাকা একাত্তর সালের একটি ছবির মতো। পার্থক্য এতটুকুই, একাত্তরের ছবিতে রিকশাওয়ালা ও যাত্রী, উভয়েই নিহত। আর চব্বিশের ছবিটিতে রিকশাচালক জীবিত। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে ছাপা হওয়া ছবিটা একই, তবে এতটা ক্লোজ নয়। একটু দূরের শট।
অন্যদিকে আমাদের পত্রিকা বণিক বার্তায় ছাপা হওয়া কাজী সালাহউদ্দীন রাজুর তোলা ছবিটি আরেকটু বড় ফ্রেমের। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে গুলিবিদ্ধ তরুণকে বহন করা রিকশাটি হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন চালক। চালকের আশপাশে দেখা যাচ্ছে বেশকিছু পুলিশ। ওয়াকিটকি হাতে পুলিশ কর্মকর্তা হাতের আঙুল উঁচিয়ে সোজা একটি দিক দেখাচ্ছেন। অন্য পুলিশগুলো কর্মকর্তার দিকনির্দেশিত আঙুলের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবি দেখে যা বোঝা যাচ্ছে, হয়তো তিনি বলছেন, ‘ভাগো! এখনি এদিক দিয়ে একে নিয়ে জলদি যাও! না হলে বেটা তোকেও এখন গুলি করে মারব!’
পরে আমরা জানতে পারি, গুলিবিদ্ধ তরুণের নাম গোলাম নাফিজ। সে রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল। পরিবারসহ থাকত মহাখালীতে। দুই ভাই তারা। নাফিজ ছোট। আন্দোলন করতে গিয়ে ৪ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ফার্মগেটের ওভারব্রিজের নিচে নাফিজ গুলিবিদ্ধ হয়।
নূর মোহাম্মদ নামের এক রিকশাচালক তাকে নিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ঢুকতে গেলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বাধা দেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক। পরে ১৭ বছরের গোলাম নাফিজকে নিয়ে রিকশাচালক খামারবাড়ির দিকে চলে যান। স্পটে উপস্থিত দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদ ও বণিক বার্তার কাজী সালাহউদ্দীন রাজু পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাধার পরও রিকশার পাদানিতে ঝুলতে থাকা নাফিজের কয়েকটি ছবি তুলতে পেরেছিলেন।
মানবজমিন পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া নাফিজের ছবি ওই রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছবি দেখেই নাফিজের মা-বাবা সন্তানের খোঁজ পান। নাফিজের লাশ তারা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে নিয়ে আসেন।
৩.
আমি গেলাম গোলাম নাফিজের বাবার সামনে। সাধারণ পরিবারের এক পিতা। ছোটখাটো গড়নের একজন মানুষ। আমি যেতেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, ‘নাফিজের ছবি নিয়ে আপনার লেখা পড়েছি। আপনার লেখা আমরা অনেক যত্ন করে রেখেছি। আর রাজু ভাইয়ের তোলা ছবিটা। জীবন ভাইয়ের ছবিটা।’ আমি নাফিজের বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখলাম। এক শহীদের পিতার উষ্ণতা আমার বুকটা ভরিয়ে দিল। এক বীরের বাবার বুকের সঙ্গে আমার বুক মিলিয়ে নিজেকে গর্বিত অনুভব করলাম।
আমার প্রশ্নের জবাবে নাফিজের বাবা বললেন, ‘ভাই, সংসারে আমার স্ত্রী আছে, ওর বড় একটা ভাই আছে। আমার সোনার সন্তানটা চলে গেল, কিছুতেই মানতে পারছি না। আমাদের একটু দেখে রাখবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন।’
বললাম, ‘আপনার ছেলে দেশের মানুষের অধিকারের জন্য জীবন দিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য, সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে, রাজপথে তাজা রক্ত দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখে গেছে। হয়তো আপনি, এক সন্তান হারিয়েছেন। আপনার সন্তানের জীবনের বিনিময়ে দেশ দানবীয় এক সরকারের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে মুক্তির জন্য নাফিজদের মতো কিশোর-তরুণরা জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৭১-এর বীর যোদ্ধাদের যেমন জাতি পরম মহিমায় স্মরণ করে, আপনার সন্তানকেও জাতি কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করবে। চব্বিশের জুলাই যোদ্ধাদের তালিকায় আপনার সন্তানের নাম জ্বলজ্বল করবে আজীবন। আপনার সন্তানকে নিয়ে আমরা গর্ব করে যাব আমৃত্য। যতদিন অধিকারের জন্য মানুষ লড়াই করবে, ততদিন গোলাম নাফিজরা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
বললাম, ‘রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। কবর জিয়ারতে গেলে বা বাসায় মিলাদ হলে আমাদের জানাবেন। আমরা সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করব। সময় পেলেই আপন মনে করে বণিক বার্তায় চলে আসবেন।’
৪.
নাফিজের বাবার সঙ্গে কথা শেষ করে বিদায় দিয়ে এসে ডেস্কে বসলাম। মনের আয়নায় কিছু কথা ভেসে উঠল। কিছু কথা নিজে নিজে ভাবলাম, যা গোলাম নাফিজের বাবাকে বলতে পারিনি। যা একজন শহীদের পিতাকে বলা যায় না। ১৯৭১ সালে আমরা জীবন দিয়েছিলাম পরাধীন অবস্থা থেকে জাতীয় মুক্তির জন্য। স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ২০২৪ সালে আমাদের ছাত্র-জনতা, আমাদের সন্তান গোলাম নাফিজরা রক্ত দিল, লাশ হয়ে রাস্তায় পড়ে রইল সার্বিক অধিকার আদায়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পাওয়া স্বাধীন দেশে নির্যাতন-নিপীড়ন ও বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভ করার জন্য। ১৯৭১ সালে পাওয়া স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে অর্থবহ করে তোলার জন্য।
এক নতুন ইতিহাস লেখা হলো স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে, ১৯৭১ সালের দৃশ্যান্তরের ছবি চলে এল দৃশ্যপটে, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধের ছবি চলে এল স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই যে গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ছবি তা কি আমাদের জন্য সত্যিকারের নতুন দিশা নিয়ে আসবে? নাকি আবারো ফিরে আসবে রক্ত, আবারো রাস্তায় পড়বে লাশ? অধিকারের প্রশ্নে আবারো ফিরে আসবে হত্যা ও লাশের এসব ছবি বা দৃশ্যচিত্র? এসব রক্ত-লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা কি গড়ে তুলতে পারব একটি আধুনিক, উদারবাদী ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ? নাকি এসব ছবি ভুলে গিয়ে আমরা ফিরে যাব সেই পুরনোতেই?
গোলাম নাফিজদের মতো হাজারো শিশু, কিশোর, তরুণের রক্ত আর জীবনের দামে লেখা চব্বিশের জুলাই কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যেতে পারবে? নাকি আমরা নাফিজদের হৃদয়বিদারক এসব ছবি ভুলে গিয়ে ফিরে যাব সেই পুরনোতেই? জুলাই অভ্যুত্থানের বছরপূর্তিতে তা-ই এখন দেখার পালা।
৫.
তবে যেদিকেই আমরা অগ্রসর হই না কেন, নাফিজদের ছবি আমাদের পিছু ছাড়বে না। স্মৃতির নিউরনে আঘাত করবে। বারবার টেনে নিয়ে যাবে ইতিহাসের শিক্ষার দিকে। সেই শিক্ষা যদি আমরা মাথা ও হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে নিশ্চয়ই তা আমাদের ঠেলে নিয়ে যাবে অগ্রসরমাণ আগামীর দিকে। আমাদের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা আপাত দৃশ্যান্তরের এসব ছবি—ঠিক করে দিক আমাদের, বাংলাদেশের অগ্রসরতার সম্মুখগতি।
গোলাম নাফিজের লড়াইয়ের স্মৃতি যুগ যুগ জাগরূক থাকুক। আমরা তার বাবার ছেলে হারানোর গর্বিত সমব্যথী। নাফিজের করকমলে গভীর শ্রদ্ধা।










