যুক্তরাষ্ট্রে আবারো প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার বাণিজ্যযুদ্ধের প্রথম আঘাতগুলো বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দশকের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে ছেদ ঘটিয়েছে। শুধু চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরই নয়, বরং কানাডা ও মেক্সিকোর মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। এমনকি ন্যাটোর সদস্য এবং কোল্ড ওয়ারের সময় ও পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য মিত্র ডেনমার্কও ট্রাম্পের নিশানায় পড়েছে।
ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে অনেককেই ভাবতে বাধ্য করেছে: শুল্ক আসলে কী এবং তা বৈশ্বিক বাণিজ্যে কীভাবে প্রভাব ফেলে? সহজভাবে বললে, শুল্ক হলো আমদানীকৃত পণ্যের ওপর কর। ধরা যাক, কোনো চীনা প্রস্তুতকারক যুক্তরাষ্ট্রে জুতা বিক্রি করতে চায়। তখন মার্কিন সরকার সেই পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারে। যদি একজন মার্কিন খুচরা বিক্রেতা এক জোড়া জুতার জন্য ১০০ ডলার পরিশোধ করে, তবে চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা ১০ শতাংশ শুল্ক ধরে চীনা বিক্রেতার অতিরিক্ত ১০ ডলার দিতে হবে মার্কিন সরকারকে।
ফলে ১০০ ডলারের জুতার দাম দাঁড়াল ১১০ ডলার। এ অতিরিক্ত ১০ ডলার কে দেয়? ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যখন চীনা আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়েছিলেন, তখন বেশির ভাগ খরচ বহন করেছিলেন মার্কিন আমদানিকারকরাই—বিশেষ করে যখন তারা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পাননি। ফলে অন্তত প্রথম বছরে খুচরা দামে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল।
তবে শুল্ক দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকলে চিত্রটি আরো জটিল হয়ে ওঠে। মার্কিন আমদানিকারকরা অনির্দিষ্টকাল বাড়তি খরচ বহন করতে পারে না। নতুন সরবরাহকারী খুঁজে না পেলে বা সেই খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারলে অনেক প্রতিষ্ঠানই ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। ফলে ভোক্তাদের ব্যয় কমাতে হতে পারে।
যখন কোনো দেশ শুল্ক বা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করে অন্য দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করতে চায়, তখন প্রায়ই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ও বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। উদাহরণস্বরূপ ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে একই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে চীনা ও মার্কিন শুল্ক আরোপ হলেও তাদের প্রভাব এক রকম নাও হতে পারে।
প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীনের প্রতিশোধমূলক শুল্কের বেশির ভাগ বোঝা পড়েছিল মার্কিন রফতানিকারকদের ওপর, চীনা আমদানিকারকদের ওপর নয়। কারণ চীন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পেয়েছিল। তেল ও খাদ্যপণ্য (চীনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ রফতানি পণ্যের মধ্যে দুটি) রাশিয়া ও অন্যান্য দেশ সহজেই সরবরাহ করতে পেরেছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনা আমদানির বিকল্প খুঁজে পেতে হিমশিম খেয়েছিল, ফলে ট্রাম্পের শুল্কের ভার বহন করতে হয়েছে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদেরই।
এ পরিণতিগুলো নজর এড়ায়নি। ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—উভয়ের আমলেই যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ উৎপাদন উৎসাহিত করতে এবং চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব প্রচেষ্টা কতটা যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কের বোঝা চীনের ঘাড়ে চাপাতে সক্ষম করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বিশাল আকার তাকে একটি বড় সুবিধা দেয়। চীনা আমদানিকারকদের জন্য বিকল্প সরবরাহকারী পাওয়া সম্ভব হলেও চীনা রফতানিকারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন হবে। রাশিয়া, ভারত, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার সম্মিলিত জিডিপি প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি। আর যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ২০২৫ সালে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপরন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ওইসিডি’ মিত্রদের বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্ত করতে পারে, তাহলে চীন এমন দেশগুলোর কাছ থেকে শুল্কের মুখোমুখি হবে, যেগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির ৪৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।
ট্রাম্প প্রশাসন এক্ষেত্রে একটা বাজিই ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, তাই চীন ও অন্যান্য বিদেশী রফতানিকারকরা কার্যকর বিকল্প বাজার খুঁজে পেতে হিমশিম খাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এ বাণিজ্যযুদ্ধে নির্ণায়ক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। প্রাথমিক লক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্পের কৌশল অন্তত প্রতীকী সাফল্য এনে দিতে পারে। কেননা মেক্সিকো ও কানাডা তার দাবির কাছে নতি স্বীকার করছে বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য তারা আগে থেকেই যা করছিল, সেটাই চালু রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে শুল্ক প্রায়ই শাঁখের করাতের মতো কাজ করে। একদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র আরো ভালো বাণিজ্য শর্তে দরকষাকষি করতে পারবে। অন্যদিকে এর মূল্য দিতে হতে পারে মার্কিন পরিবারগুলোকে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য কম পণ্য উৎপাদিত ও বিক্রি হবে। আমদানি কমে গেলে দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিদেশী বিকল্পের অনুপস্থিতি খুচরা মূল্যের ওপর চাপ বাড়াবে, যার ভার বহন করতে হবে ভোক্তাকে।
ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক সুফল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তার প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করে বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীর প্রবাহ ঠেকানো এবং প্রত্যাবাসিত অভিবাসীদের গ্রহণে বাধ্য করা। পাশাপাশি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা করা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সম্প্রসারণবাদ নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব। তদুপরি ট্রাম্প পানামা খাল ‘ফিরিয়ে নেয়া’র অঙ্গীকার করেছেন এবং কৌশলগত অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে গ্রিনল্যান্ড কেনার ব্যাপারেও তিনি নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। ১৮৬৮ সাল থেকে এটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে মার্কিনরা।
মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভোক্তা ও উৎপাদকদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে—যেখানে মার্কিন সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসন ও প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ভোট হবে—তাহলে তারা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। এতে চীন ও বাকি বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য ট্রাম্পের হাতে থাকবে মাত্র দুই বছর। অথবা আমেরিকানদের বোঝাতে হবে যে এর জন্য তাদের মূল্য দেয়াটা সার্থক ছিল।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ: মাহমুদুর রহমান
ন্যান্সি চ্যান: নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল পভার্টি রিসার্চ ল্যাবের সহপরিচালক এবং চায়না ইকন ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক










