আমরা যেমন বলি ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’, ঠিক তেমনি এসএমই খাত হলো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ খাত বিকশিত না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বিকশিত হতে পারে না। দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশ এসএমইনির্ভর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের আবার প্রায় ৭০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। এ ইউনিটগুলোতে প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সুতরাং অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি যেমনই হোক, এসএমই খাতের অবদান অনস্বীকার্য নয়।
আপনি বলছেন, জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। কিন্তু কম্বোডিয়া, শ্রীলংকার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ হার ৫২-৫৮ শতাংশ। প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোও বেশ এগিয়ে আছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে কেন?
এটা সত্য যে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। এজন্য আমাদের কার্যক্রম বাড়াতে হবে, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজন যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে এ হার দ্রুত সময়ের মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। কারণ এসএমই খাত যত বিকশিত হবে, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও তত বাড়বে। এজন্য আমাদের মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে ঋণ প্রদানে আরো এগিয়ে আসতে হবে।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এসএমই খাতের জন্য একাধিক তহবিল আছে। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই এসব তহবিলের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ব্যবহৃত হয় না। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক সাক্ষরতা ও নথিপত্র জটিলতাও আছে। উদ্যোক্তা ও ঋণদাতা এসব প্রতিষ্ঠানের মাঝে ঘটাতে এসএমই ফাউন্ডেশন কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
আমরা অ্যাডভোকেসি এবং নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ করছি। সরকার আমাদের যে তহবিল দেয়, আমরা কিন্তু তার শতভাগ সফলভাবে ব্যয় করি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও চেষ্টা করছে, তবে একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মানসিকতার অভাব। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় করপোরেটদের ঋণ দিতে যতটা আগ্রহী, ক্ষুদ্রদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা টাকা লোপাট বা চুরি করে না, তারা যেকোনো উপায়ে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে। ব্যাংকগুলোর এ লোন শিফটিং বা মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।
আমরা যখন উদ্যোক্তা ও ব্যাংকগুলোকে নিয়ে ম্যাচ-মেকিং কনফারেন্স করি, তখন ব্যাংকগুলো এ ‘নট ব্যাংকেবল’ ইস্যুটা তোলে। একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকেবল করতে হলে প্রাথমিক কিছু নথিপত্র দরকার হয়, আমরা উদ্যোক্তাদের এসব নথি তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। তবে সীমাবদ্ধতার কারণে সবার কাছে পৌঁছাতে পারছি না।
আন্তর্জাতিক বাজারে এসএমই পণ্য রফতানি চ্যালেঞ্জ দূর করতে এসএমই ফাউন্ডেশন কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে গুণগত মানের পাশাপাশি সনদ সবচেয়ে জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সনদ না থাকলে পণ্য গ্রহণ করা হয় না। আবার বৈশ্বিকভাবে হালাল পণ্যের বিশাল চাহিদা রয়েছে। আমরা এসব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছি। গত এক বছরে ৩০টি এসএমই প্রতিষ্ঠানকে আইএসও সনদ অর্জনে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বাড়ানো এবং ম্যাচ-মেকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা করেছি।
আবার আমাদের উদ্যোক্তারা পণ্য রফতানি করতে চাইলেও সরাসরি পারে না, তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করে। আমরা এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সরাসরি রফতানির উপযোগী করে গড়ে তুলতে রফতানি প্রস্তুতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এ কাজে আমরা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিএফটিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিচ্ছি। আমাদের এ ধরনের কার্যক্রম আরো এগিয়ে যাবে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের সঙ্গে আমাদের এসএমইগুলো কতটা নিজেদের এগিয়ে নিতে পারছে?
এখন আর সনাতনী ধারায় উৎপাদন, বিপণন বা রফতানি সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখনো আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেনি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণে উদ্ভাবনী শক্তি ও প্রযুক্তি নির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। এমএমই ফাউন্ডেশন এসব ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে। আমরা উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে এসএমই উদ্যোক্তাদের এআই-ভিত্তিক ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এছাড়া ‘এসো উদ্যোক্তা হই’ এবং ‘নিউ বিজনেস ক্রিয়েশন’ এর আওতায় দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দিনব্যাপী মোটিভেশনাল সেশন করছি। সেখানে সফল উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
প্রায় দুই দশক হলো এসএমই ফাউন্ডেশনের পথচলা। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার কতটুকু অর্জন হয়েছে?
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশ, কর্মসংস্থান বাড়ানো ও দারিদ্র্য হ্রাসে আমাদের ভূমিকা ইতিবাচক, তবে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। এটি আরো বেশি বিকশিত হওয়া দরকার ছিল। সরকার যদি স্থায়ী বাজেটারি সাপোর্ট দেয় এবং দেশী-বিদেশী অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা যায়, তবে আমরা আরো অনেক দূর এগিয়ে যাব।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
আমাদের পরিকল্পনা হলো জিডিপিতে বর্তমানে ৩০ শতাংশ অবদানকে আগামী পাঁচ বছরে ৪০ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই। এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সংকট দূর করতে প্রস্তাবিত বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ঋণ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করি, তা পাস হবে। এসএমই খাতে যদি এভাবে অর্থায়ন করা হয় তাহলে এ খাতের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা যাবে। কারণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতাই যদি বাড়ানো না যায় এবং তাদের যদি রফতানিযোগ্য করে গড়ে তোলা না হয়, তাহলে তাদের বিকাশ হবে না। আমরা এসএমই খাতের রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ করতে চাই। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্যের প্রসারেরও পরিকল্পনা আছে আমাদের।










