অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি) ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে গত ১২ মে ২০২২ ‘দারিদ্র্য ও বৈষম্য রোধে নারী, আদিবাসীসহ প্রান্তিকজনের বর্ধিত বাজেট ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র

 

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক

বণিক বার্তা

দীর্ঘদিন ধরেই বাজেট ঘোষণার আগে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন আলোচনা হয়। কিন্তু তাতে বাজেটের মূল কাঠামোয় যে বড় রকমের পরিবর্তন হয়, তা কিন্তু নয়। বরং যে অঞ্চলগুলোয় দারিদ্র্যের মাত্রা বেশি সেসব জায়গায় তুলনামূলকভাবে বাজেটের বরাদ্দ কম। বিশেষ করে দেশের রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরে দারিদ্র্যের মাত্রা বেশি। অথচ এসব অঞ্চলে বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দ ১ শতাংশের কাছাকাছি। সমতলে আদিবাসীদের কাছে এসব বরাদ্দের ছিটেফোঁটাও পৌঁছায় না। করোনায় আমাদের গ্রামীণ সমাজে নতুন করে দরিদ্রগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তাদের প্রকৃত সংখ্যা কত, আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোয় তাদের জন্য নতুন কী কী সুযোগ তৈরি করা যায়—বিভিন্ন আলোচনায় এ বিষয়গুলোও খুব একটা উঠে আসছে না। বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রকৃত তথ্যপ্রাপ্তি। আমরা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রকৃত তথ্য জানি না। আদমশুমারি শুরু হয়েছে। তবে এর ফলাফল পেতে আরো সময় লাগবে। কভিডের কারণে আমাদের পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে—এ-সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্যগুলো আমাদের কাছে নেই। তথ্য না থাকলে কোন অঞ্চলে কী ধরনের আনুপাতিক বরাদ্দ প্রয়োজন তা ঠিক করা যায় না। এ কারণে কোন কোন অঞ্চলের মানুষের জন্য সরকারের বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে তাও তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।


খুশী কবির

চেয়ারপারসন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)

সমন্বয়কারী, নিজেরা করি

উদ্বোধনী বক্তব্য

বাজেট হচ্ছে জনগণের জন্য। আর জনগণের একটা বিরাট অংশ হলো দরিদ্র, নারী, আদিবাসী—সর্বোপরি তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। শুধু এবার না, অনেক আগে থেকে এটা আমরা মে মাসে আলোচনা করছি। আগামী বছর এটা নিয়ে আমরা আরো আগে থেকে যদি চাপ দিতে পারি, তাহলে হয়তো যখন খসড়া তৈরি হয়, তখন তারা এটি বিবেচনায় নেবে। প্রান্তিক মানুষের কথাগুলো বারবার সামনে নিয়ে আসতে হবে, তবেই আলোচনা বা উদ্যোগ সফল হবে।

সমাপনী বক্তব্য

আমার মনে হয়, আমরা একটা গ্রুপ যারা বাজেট প্রণয়ন করেন তাদের সবার সঙ্গে বসতে পারি এবং কোন কোন বিষয় জনগণের পক্ষ থেকে আসা উচিত, তার একটি তালিকা তাদের হাতে তুলে দেয়া যেতে পারে। বাজেট প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা এসেছে। সেখানে আমরা মাঠ পর্যায় থেকে বক্তব্য ও সুপারিশগুলো নিয়ে আসতে পারি। আসলে বাজেট শুধু বাণিজ্য, ব্যবসা, শিল্প আর অর্থনৈতিক অর্থাৎ জিডিপি বাড়ানোর বিষয় নয়, বাজেট হচ্ছে জনগণের ওপর কী প্রভাব পড়ছে এবং জনগণকে এটা কী দিচ্ছে, তাও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটা খুবই জরুরি।

ড. আবুল বারকাত

প্রধান উপদেষ্টা, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি)

সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

চলমান অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে মূলত চারটি বড় খাত দেখা যাবে। যদিও আমাদের কাছে বড়, কিন্তু সরকারি বাজেট দলিলে বড় না এবং কত ছোট সেটাই মনে হয় পরিমাপ করার বিষয়। আমরা যত বেশি এ ধরনের কাজ করছি, তত বেশি প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, যত গরিব/প্রান্তিক তার বাজেট তত কম। কিন্তু কত কম, কমের চেয়েও তো কম আছে। সে রকম কম কিনা? যখন এটা বুঝতে চাইবেন, প্রথমেই যে জায়গায় হাত দিতে হবে, সেটা হচ্ছে ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’। এ কর্মসূচিতে চলমান অর্থবছরের বাজেটে ২ হাজার ৬৫টি প্রকল্প। এ প্রকল্প যোগ করলেই উন্নয়ন বাজেট। এ প্রকল্পগুলোর শিরোনামের মধ্যে ‘পারিবারিক কৃষি’ শব্দ কোথাও নেই, ‘গ্রামীণ নারী’ এ শব্দও কোথাও নেই, ‘আদিবাসী’ শব্দটা আছে দু-এক জায়গায়, আর কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার এ শব্দই কোথাও নেই। তাহলে আপনি হিসাব করবেন কী দিয়ে?

দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন ও জাতীয় বাজেট: সত্যিকার অর্থে বাজেট একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে, আমরা যা প্রস্তাব করছি তা যদি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত ও বাস্তবায়ন হয়, তাহলে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য রোধে বাজেটের পূর্ণ সম্ভাবনার ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে আমাদের সংশয় আছে। দারিদ্র্যের বিভিন্ন পকেট (যেমন উপকূল, হাওর, আদিবাসী এলাকা, পার্বত্য সমতল প্রভৃতি) এবং দারিদ্র্যের বহুমাত্রা এ সংশয়কে আরো প্রকট করেছে। অতএব প্রশ্ন, বাজেটে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দ কত? আমরা চারটি ক্যাটাগরিতে পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ নারী, আদিবাসী মানুষ ও কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের প্রেক্ষাপটে এটি দেখব। দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিরসনে এ বরাদ্দ যথেষ্ট কিনা? উত্তর হচ্ছে, ‘না’। বাস্তবায়নের নিরিখে বাজেট কি গরিব-প্রান্তজনবান্ধব? নারীবান্ধব? আদিবাসীবান্ধব? খুদে কৃষিবান্ধব? ভূমি সংস্কারবান্ধব? সবগুলোর উত্তর, ‘না’। বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ সালের পর ‘ভূমি সংস্কার’ নামটা কোনো বাজেটে ছিল না। এ নামে কোনো প্রকল্পও ছিল না। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামই পাল্টে দেয়া হয়েছে।

কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট: আমরা ধারণা করেছিলাম, মহামারী-পরবর্তী একটা পুনরুদ্ধার পর্বের মধ্যে আমরা আছি। ওই ধারণাটাও ঠিক না। কারণ কী পুনরুদ্ধার করবেন? ২০১৯ সালের আগে তো বাংলাদেশ বেহেশত ছিল না। বৈষম্য অনেক ছিল, বহুমুখী দারিদ্র্যও ছিল, করোনায় এগুলো বেড়েছে। কভিড, মন্দা আর যুদ্ধ (রাশিয়া-ইউক্রেন) মিলে এগুলো সব বেড়েছে। মহামারীতে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষ। আমরা লক্ষ করেছি গত দুই বছরে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুনভাবে দরিদ্র হয়েছে। অতএব, দারিদ্র্যের ফিগার ৬ কোটি ৮০-৯০ লাখের মতো। কভিড-পূর্ব দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়েছে। দারিদ্র্য-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাভাবিক সময়ে বাজেটের যে গুরুত্ব, তা কভিডের নেতিবাচক অভিঘাত বিবেচনায় বহুগুণ বেড়েছে। আর ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ স্বাভাবিক জীবনধারার অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি জাতীয় বাজেটে দরিদ্র-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও ন্যায়সংগত বাজেট বরাদ্দ থাকে না। মহা দুঃসময়ে এবারের বাজেট সংকুচিত-আঁটোসাঁটো হতে পারে। এ অবস্থায় বাজেটে ক্ষমতাহীন, দুর্বল জনগোষ্ঠীর হিস্যার অংশ যে অপর্যাপ্ত ও অন্যায্য হবে সে আশঙ্কা খুব অমূলক নয়।

পারিবারিক কৃষি ও জাতীয় বাজেট: পারিবারিক কৃষি ও কৃষকের প্রান্তিকতা

বাংলাদেশের কৃষিতে খুদে কৃষক আর পারিবারিক কৃষিই প্রাধান্য। দেড় কোটির বেশি খুদে কৃষক খানার বেশির ভাগই পারিবারিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অল্প কিছু মাঝারি কৃষি খানাও পারিবারিক কৃষিচর্চায় জড়িত। কৃষি খাতের চিরায়ত সমস্যাগুলো কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্য, অপ্রাপ্যতা, নিম্নমান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংরক্ষণ সমস্যা ও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া প্রভৃতি। এগুলোর কারণে বৃহৎ ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকরা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এসব সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন খুদে ও পারিবারিক কৃষক।

বাজেট বক্তৃতায় পারিবারিক কৃষি কভিডের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবার। কিন্তু চলতি বাজেটে (২০২১-২২) পারিবারিক কৃষির জন্য কত বরাদ্দ রয়েছে বা কী কী প্রকল্প রয়েছে, তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। বর্তমান অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার কথা বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর কতটুকু পারিবারিক কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে? এটার কিন্তু কোথাও কোনো উত্তর নেই। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয় প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং কৃষকদের কৃষিযন্ত্রের ওপর ৫০-৭০ শতাংশ সহায়তার মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে, এটা বলা হয়েছে বাজেটে। খামার যান্ত্রিকীকরণে এ প্রকল্পে খুদে পারিবারিক কৃষকদের কাছে কতটুকু পৌঁছেছে, এটা আমরা খুঁজেছি, তেমন কিছু পাইনি, যা পেয়েছি তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কীটনাশকমুক্ত শাকসবজির জোগান দিতে ৪১টি জেলায় কৃষকের বাজার স্থাপন করা হয়েছে। এ বাজারে পারিবারিক কৃষকরা কি পৌঁছতে পেরেছেন?

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে পারিবারিক কৃষির জন্য

আমরা মনে করি, মাথাপিছু দ্বিগুণ বরাদ্দ হওয়া উচিত। তা যদি হয় তাহলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি ওই বরাদ্দে মাথাপিছু হওয়ার কথা মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে ১৪ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এ হিসেবে খুদে পারিবারিক কৃষকদের জন্য গড় বরাদ্দ হওয়া উচিত দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। এটা যদি হয় হিসাবের ভিত্তি, তাহলে পারিবারিক কৃষির জন্য ন্যায্য বরাদ্দ হওয়া উচিত ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

গ্রামীণ নারী ও জাতীয় বাজেট: গ্রামীণ নারী প্রান্তিকতা

বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩২ লাখ। তাদের বৃহদংশই দরিদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন। গ্রামীণ নারীদের অধিকাংশ, অন্তত ৭০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে যুক্ত। আপাতদৃষ্টিতে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে নারীর ক্ষমতায়ন মনে হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে স্বল্প মজুরি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজ করানোর সুযোগ।

কভিড নারীর প্রান্তিকতা আরো গভীরতর করেছে। নারী দিনমজুরের বড় অংশ কর্মহীন হয়েছে। লকডাউনে নারী উদ্যোক্তাদের আয়ের পথ ছিল রুদ্ধ। মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এবং পারিবারিক নির্যাতনও বেড়েছে।

অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় চারটি অনুচ্ছেদে (পৃ. ১০১-১০৪) নারীর ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট বাজেটীয় পদক্ষেপের আলোচনা করলেও ‘গ্রামীণ নারী’ প্রত্যয়টি স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেননি। স্বীকৃতির এ অভাব নির্দেশ করে যে সরকারি উন্নয়ন দর্শনে গ্রামীণ নারীর যথাযোগ্য স্থান নেই। ‘অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসরণে নারীর মানবিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুবিধা বৃদ্ধি, নারীর কণ্ঠস্বর ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারীদের জন্য অবকাঠামো ও যোগাযোগ পরিষেবা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় গ্রামীণ নারীর প্রবেশাধিকার কতটুকু? উত্তর হচ্ছে—নেই, অথবা খুবই সীমিত।

চলতি অর্থবছর ২০২১-২২ বাজেটে গ্রামীণ নারীর বরাদ্দ ও আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটে গ্রামীণ নারীর বরাদ্দ: চলতি (২০২১-২২) বাজেটে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দ দেয়া ৩১টি প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি প্রকল্প ঘোষিত বরাদ্দে গ্রামীণ নারীর পূর্ণাঙ্গ হিস্যা রয়েছে, যার পরিমাণ ১১৩ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ১৩%)। আরো ১১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নারী উন্নয়নের জন্য গৃহীত ১১টি প্রকল্পে ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দে গ্রামীণ নারীর হিস্যা ১ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ৩০%)। আবার মাথাপিছু ‘সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ’ খাতের বরাদ্দ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ অতিদরিদ্র ও প্রান্তিক গ্রামীণ নারীর হিস্যা ৫০ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ৪৮%)। উল্লিখিত তিন খাতের যোগফলে চলমান অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে ৫ কোটি ৩২ লাখ গ্রামীণ নারীর মোট হিস্যা ৫৩ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু ১০ হাজার ১০ টাকা। এটা মাথাপিছু হিসাব; বাস্তবতা কিন্তু এর চেয়ে কম।

২০২২-২৩ অর্থবছরে গ্রামীণ নারীর মাথাপিছু গড় বরাদ্দ জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দের চলমান গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ নির্ধারণ করা যৌক্তিক। সে অনুযায়ী সম্ভাব্য জাতীয় গড় ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’র বরাদ্দ ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা। গ্রামীণ নারীর জন্য এ গড় বরাদ্দ দ্বিগুণ হলে ২৯ হাজার ৭৬২ টাকা হবে। সুতরাং গ্রামীণ নারীর জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত কমপক্ষে ১ লাখ ৬০ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা, যা প্রস্তাব অপেক্ষা মোট বরাদ্দের ৬৪ শতাংশের সমপরিমাণ।

আদিবাসী মানুষ ও জাতীয় বাজেট

আদিবাসী মানুষ বাজেটে নেই বললেই চলে। আদিবাসী মানুষ এককথায় ‘অজনগণ’। মানবসত্তার মর্যাদা ও মানব উন্নয়নের সম্ভাব্য সব মাপকাঠিতেই অতিদরিদ্র, অতিপ্রান্তিক ও বহিঃস্থ মানুষ। কভিডের আগে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। তখন আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোয় তা ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে। সমতলের দুই-তৃতীয়াংশ আদিবাসী কার্যত ভূমিহীন। কভিড, কর্মহীনতা, মজুরিস্বল্পতা, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য না পাওয়া, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এসব আদিবাসী মানুষের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে তীব্রতর করেছে। দারিদ্র্যের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

২০২১-২২ বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ এবং আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটে আদিবাসী মানুষের জন্য বাজেটে বরাদ্দ কত হওয়া উচিত: চারটি খাতে ৪৫টি প্রকল্পে (যার অধিকাংশই আদিবাসী উদ্দিষ্ট নয়) চলতি (২০২১-২২) অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে ৩০ লাখ আদিবাসী মানুষের হিস্যা ৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। মাথাপিছু ১৫ হাজার ৬৪৭ টাকা। বৈষম্য-দারিদ্র্যের শিকার আদিবাসী মানুষের মানবসত্তার স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের ক্ষমতায়নে উন্নয়ন বরাদ্দের জাতীয় গড়ের তুলনায় কমপক্ষে তিনগুণ বরাদ্দ দেয়া যুক্তিসংগত। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সম্ভাব্য মাথাপিছু উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এ গড় বরাদ্দ হওয়া উচিত ৪৪ হাজার ৬৪৩ টাকা। ৩০ লাখ আদিবাসীর জন্য মোট বরাদ্দ হওয়া উচিত ১৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা, যা প্রস্তাব অপেক্ষা মোট বরাদ্দের ৫ দশমিক ৪ শতাংশের সমপরিমাণ।

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার ও জাতীয় বাজেট

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বাজেটে কখনো ছিল না। আজকের যে ‘ভূমি মন্ত্রণালয়’, ১৯৭২ সালে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়’। কী করে এর নাম পরিবর্তন হয়ে গেল এ ইতিহাস অনুসন্ধান করা খুব জরুরি। কারণ ‘ভূমি সংস্কার’ কোনো ধরনের পাবলিক পলিসির অংশ হিসেবে আর থাকল না। ১৯৮৭ সালে নাম থেকে ‘ভূমি সংস্কার’ ফেলে মন্ত্রণালয় বর্তমান নাম ধারণ করে।

বর্তমান বাজেটে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের কোনো সরাসরি বরাদ্দ নেই। আমরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় তিনটি খাতে ২ হাজার ৪৫ কোটি টাকার অনুমিত বরাদ্দের একটি হিসাব পাই। কিন্তু এটাকে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের জন্য বলা যাবে না। আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে বর্তমান উন্নয়ন বাজেট সংশ্লিষ্ট অনুমিত বরাদ্দের ছয়গুণ হওয়া উচিত।


ড. শফিক উজ জামান

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ একই জাতিগোষ্ঠীর হলেও এখানে আরো বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, আদিগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। আদিবাসীর সংখ্যা দেশে যত কমই হোক না কেন, তারা এবং তাদের সংস্কৃতি দেশের সম্পদ। তাই সংখ্যা দিয়ে বিচার না করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। কারণ তারা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী।

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, আদিবাসীদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ১ শতাংশ, এটি বাড়াতে হবে। তবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বরাদ্দের কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটি। বরাদ্দ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ ১০ গুণ বাড়াতে হবে।

করোনায় ভূমিহীনরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি বাজেট আলোচনায় একেবারেই অনুপস্থিত। দিন আনে দিন খায় এমন মানুষের সংখ্যাও বেড়ে এখন দুই-তিন কোটি হয়েছে। চরাঞ্চলে উপকূল এলাকায় দৃশ্যমান বরাদ্দ নেই বললেই চলে।

বিশাল অংকের উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করা হলেও প্রথম নয় মাসে বাস্তবায়ন হয় মাত্র ৫০ শতাংশ। বাকি তিন মাসে অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করে সরকার। এমন প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।


ইদ্রিস আলী

অধ্যাপক, সরকারি হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজ চট্টগ্রাম

১৯৭২ সালে আমাদের বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। আজকে বাজেটের আকার অনেক বড় হয়েছে। অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেছেন, মাথাপিছু আয় দৃশ্যমান নয়। আমি এ বিষয়ে একমত। স্বাস্থ্য খাত কিছুটা এগিয়েছে, তবে শিক্ষা খাত এখনো বিপর্যস্ত। শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো অনেক অগোছালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। এখন আর সে পরিস্থিতি নেই। অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে প্রশাসন ও সরকারের দূরত্ব যতদিন বাড়তে থাকে, ততদিন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকবে। এ আলোচনাগুলো আরো বেশি হওয়া দরকার। আমরা বলি ৫১ বছরের মধ্যে ২৭ বছর আমরা ভিন্ন পথে, ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিচরণ করেছি। ২৪ বছর আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে পেয়েছি। তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভালো। আমরা সঠিক দিকেই যাচ্ছি। তবে অর্থনীতিবিদদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে আমরা আরো ভালো ফল পাব।




সঞ্জীব দ্রং

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

আদিবাসীসহ সবাইকে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দেখতে পারব না। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে প্রমোটিং প্রসপারিটি ফর স্টাডিং ইনক্লুসিভনেস। সেখানে আদিবাসীদের বিষয়গুলো আছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন কীভাবে হবে এবং এতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ আছে কিনা। বাংলাদেশ সঠিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটি আমি তখনই বুঝতে পারব যখন একজন সাঁওতাল এ কথাটা বলবে। একজন সাঁওতাল, খাসিয়া, গারো, মুণ্ডা যদি বলে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে, একজন মণিপুরি ও হাজং যদি বলে বাংলাদেশ আসলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা বুঝব উন্নয়ন হচ্ছে। বাজেটে সমতলের আদিবাসীদের জন্য খুব বেশি কিছু থাকে না। বাজেটের অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং সেখানেও আদিবাসীসহ প্রান্তিক মানুষকে কীভাবে যুক্ত করা যায় সেটা ভাবতে হবে। বিশ্বব্যাপী এটা স্বীকৃত যে করোনার সময় গরিব মানুষ ও আদিবাসী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি অনুরোধ করব, যদি সুযোগ থাকে আগামী বাজেটে অন্তত করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা চাকরি করেন তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হোক।


আবু সুফিয়ান

সভাপতি, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটি

সুনামগঞ্জ

হাওরের যে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের একটা তালিকা করে দ্রুত অনুদান দিতে হবে। কৃষক পরিবারের নারীকে বাদ দিয়ে কৃষিকাজ হবে না। তারা প্রচুর শ্রম দেন। কিন্তু হাওর অঞ্চলের নারীরা অনেক সময়ই চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। হাওর অঞ্চলের নদী-খাল খননের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।





আবু সাঈদ খান

উপদেষ্টা সম্পাদক

দৈনিক সমকাল

বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য বাজেটকে আরো দৃশ্যমান করা দরকার। যারা পিছিয়ে আছে তাদের বিশেষ সহায়তা দেয়া হোক। দেশের সামগ্রিক উৎপাদনের স্বার্থে কৃষিতে নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসীদের বিশেষ সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। সহায়তাটা যেন অদৃশ্য না হয়, সেটা যেন দৃশ্যমান থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা। ন্যায্যমূল্যের দোকান থেকে তাদের খাদ্যসামগ্রী কেনার ব্যবস্থা করা। বিশেষ সহায়তা কার্ডের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চাষীর সন্তানের মেধা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। শুধু স্কুল ফি না, পোশাক, টিফিন ভাতা দেয়াও দরকার। চিকিৎসা সহায়তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি বছর বাজেটের আগে একটা রিভিউ কমিটি হতে পারে। জাতীয় ভোগ, বিলাস, অপচয় কমিয়ে এনে আমরা দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিতে পারি, যেটা মানবিক এবং যেটার দিকনির্দেশনা আমাদের সংবিধানে রয়েছে। উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বৈষম্যও বেড়ে চলেছে। এ বৈষম্যটা শহরের সঙ্গে গ্রামের, ধনীর সঙ্গে দরিদ্রের। সাধারণ মানুষের কথাও শোনা দরকার।


রবীন্দ্রনাথ সরেন

সভাপতি

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ

সাম্প্রতিক সময় রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ীতে দুজন আদিবাসী কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। বরেন্দ্র অঞ্চল আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে আদিবাসীরা জমি চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাননি। তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় ৭০ হাজার খাস পুকুর রয়েছে। এ খাস পুকুর থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমরা চাই এ পুকুর উদ্ধার করা হোক। পুকুরপাড়ে যে আদিবাসীরা আছে তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া হোক। আদিবাসীদের কবরস্থানের এখন ভয়াবহ সংকট।

বর্তমান সরকার প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে ভূমি কমিশন ও হারানো ভূমি আমাদের ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু একটা ভূমিও ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। দিনাজপুরে আদিবাসীরা শিক্ষা প্রসারের জন্য নিজ উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিল। স্কুলের নাম আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু সেখানে একজনও আদিবাসী শিক্ষক নেই। আমরা চাই, আদিবাসী অধ্যুষিত স্কুলগুলোয় কমপক্ষে একজন হলেও আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। আমার মনে হয় সরকার এ কাজগুলো কোনোদিনও করবে না। কারণ ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায়ই এ ভূমিগুলো দখল হয়ে আছে।


আফজাল হোসেন

পরিচালক, রুলফাও রাজশাহী

আমি বরেন্দ্র এলাকার মানুষ, এখানে পদ্মা-যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল আছে, লক্ষাধিক পুকুর আছে। তার পরও জলের সংকট। বর্ষাকালে প্রচুর প্লাবন হয়, খরার সময় জল পাওয়া যায় না। তানোরের বাধাইড় ইউনিয়নে জলের অভাবে আদিবাসী ছাড়াও বাঙালিরা স্থানান্তরিত হচ্ছে। বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ ও ডাস্কো নামে একটা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে ২০০ থেকে দেড় হাজার ফুটের মধ্যে শুধু কাদা, কোনো জল নেই। আর সুপেয় জলের আধার হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি। সেটার যদি এ দুরবস্থা হয়, তাহলে আগামী দিনে এখানে জনপদই থাকবে না। এখানে কিছু শিল্প-কারখানা হচ্ছে, যারা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকেই জল নিচ্ছে ব্যাপক হারে। পানির মূল্য দিতে হয় না বলে অপচয় করছে তারা, কিন্তু দেখার কেউ নেই।

প্রবন্ধে পারিবারিক কৃষির কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখছি প্রচণ্ডভাবে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণীর দাদন ব্যবসা চলছে। সেখানে যুক্ত আছে বিএমডিএর অপারেটররা। তারা ক্ষুদ্র ও আদিবাসী প্রান্তিক কৃষকদের বিতাড়ন করার জন্য উচ্চসুদে টাকা দেয় এবং জল ঠিকমতো দেয় না। গ্রামে সরকার ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রাংশ দিচ্ছে, কিন্তু সেটা দেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের, কৃষকদের না।

আমাদের সুস্পষ্ট দাবি হলো ভূ-উপরিতলে জলের আধার সৃষ্টি করতে হবে। ৩৫ বছর ধরে নিচের জল উত্তোলন করা হয়েছে বেহিসাবিভাবে। যার ফলে ভূগর্ভে জলের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভূমিধস হতে পারে, জনপদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে। সুতরাং জলের আধার সৃষ্টির জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে।

বরেন্দ্র এলাকার পুকুরগুলোর পানি আগে শুকাত না, এখন শুকিয়ে যায়। আদিবাসী ও কৃষকরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পুকুরের পানি ধরে রাখতে পারতেন। সুতরাং এ-সংক্রান্ত চিরায়ত জ্ঞান যাদের আছে, যেমন আদিবাসী ও অন্যান্য কৃষক, তাদের জ্ঞানকে নিয়ে এ এলাকার পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় বরেন্দ্র এলাকাকে বাঁচানো যাবে না।


নিরূপা দেওয়ান

সাবেক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

আমরা চাই আমাদের এলাকার জন্য যে বাজেট হবে, তা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদার ভিত্তিতে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনা করে। আমরা যারা আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আছি, তারা বাজেটের কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ পাই না। যার কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে যেমন প্রান্তিক, দরিদ্র, বঞ্চিত ছিলাম, এখনো সেভাবেই রয়ে গিয়েছি। বাজেট করতে হবে কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সেটাতেই বারবার অবহেলা করা হচ্ছে। এ কারণে বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ আমাদের সমতল বা পার্বত্য এলাকার আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া উচিত, তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বরাদ্দ অনেক কম।

করোনাকালীন যেসব কৃষক দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছেন, অনেকে কর্মহীন হয়েছেন, বেকার হয়ে গিয়েছেন তাদের সহায়তা দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সবল করতে হবে। বাজেটে তাদের আর্থিক সংকট ও কর্মহীনতা থেকে উত্তরণের জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ রাখা উচিত।

বাজেটে পার্বত্য এলাকার জুমচাষীদের জন্য কোনো বরাদ্দ থাকে না। এছাড়া জুমনির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য কখনো ভর্তুকি বা কোনো ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয় না। যে সময়টাতে জুমচাষীদের কোনো কাজ থাকে না, সে সময়টাতে তাদের অন্তত রেশনিংয়ের ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া উচিত।

তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিভিন্নভাষী জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী খাত অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা উচিত। বাজেট প্রণয়নের সময় কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে।

রফিকুল ইসলাম খোকন

নির্বাহী পরিচালক

রূপান্তর, খুলনা

বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের বাজেট হলো মূলত একটা দাপ্তরিক কাজ। অর্থনীতিবিদ ও একটা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার মাত্র। বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা এগুলো করেন। এখানে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের অংশগ্রহণের খুব বেশি সুযোগ নেই। প্রত্যেকবার বাজেটের সময় এলে বিভিন্ন আলোচনা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই কিছু হয় না। সেজন্য আমার প্রস্তাব হলো আমরা শুধু বাজেটের সময় এ আলোচনা অব্যাহত রাখব না, ২০২৩-এর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনের আগে আমরা এটাকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নিয়ে যেতে পারি। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাক-নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে আমাদের এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির জন্য তদবির করতে পারি।



সারা মারান্ডি

অ্যাক্টিভিস্ট, জেন্ডার ইয়ুথ ও জলবায়ু পরিবর্তন

পরিচালক

গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র

রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষ বাস করে। এ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবার অধিকাংশই আদিবাসী। এখানে ভূমি সমস্যা রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভূমির সমস্যা নিয়ে কথা বলছি। ভূমিসংক্রান্ত অনেক সমস্যা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। কোনো স্থানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার আগে সেখানকার আদিবাসীদের অনুমতি নেয়াটাও প্রয়োজন, যা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়।

কভিডে অনেক শিশুই ঝরে পড়েছে, অনেকে বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে, তাদের নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা কি শুধু ডিগ্রি বা মাস্টার্স সম্পূর্ণ করবে নাকি সময়োপযোগী কারিগরি শিক্ষার দিকেও তারা যাবে, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য কতটা বরাদ্দ আমরা বাজেটে রাখছি? ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আমরা চলে গিয়েছি, সেখানে আসলে আমাদের অবস্থানটা কোথায়? আমাদের এখানে তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমি রয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো নিয়োগ সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না। যেখানে আদিবাসীদের প্রাধান্য দেয়ার কথা, সেখানেও তারা উপেক্ষিত। শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়ায়, বিশেষ করে জাতীয় ফুটবল দলেও আদিবাসী নারীরা খেলছে। ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তির ক্ষেত্রে আদিবাসীরা কি আদৌ প্রাধান্য পাচ্ছে?

মং ম্য

কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অফিসার, কারিতাস বরিশাল

বরিশাল অঞ্চলের রাখাইনদের পক্ষ থেকে বলার চেষ্টা করছি। ষাটের দশকেও এ অঞ্চলে লক্ষাধিক রাখাইন ছিল, এখন আছে দুই-আড়াই হাজারের মতো। বাংলাদেশ সরকার কি কখনো গবেষণা করে দেখেছে এখানে রাখাইনদের কমে যাওয়ার কারণ কী? স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়লেও রাখাইন আদিবাসীদের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। রাখাইন নারীরা তাঁতের কাজ খুব ভালো জানেন। কডিডে এ নারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু সরকারের সেই বিশেষ প্রণোদনা থেকে শুরু করে কোনো সহায়তা কেন রাখাইন নারী পাননি?

একসময় এখানে শতভাগ রাখাইন কৃষক ছিলেন। এখন ৯০-৯৫ শতাংশ রাখাইন ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। কলাপাড়া ইউনিয়নে বর্তমানে ২৬টি রাখাইন পল্লী রয়েছে, আগে ছিল ২২৭টি। সম্প্রতি পায়রা বন্দরের জন্য আমাদের একটি রাখাইন পল্লী অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে আমরা লক্ষ করলাম, হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সরকার ভূমি অধিগ্রহণ করল, কিন্তু মাত্র ছয়টি পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করল। আজ পর্যন্ত তারা ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন।


শামসুল হুদা

নির্বাহী পরিচালক এএলআরডি

বাজেটের চাহিদাটা নিরূপিত হবে একেবারে তৃণমূল থেকে। সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষ যেন তার চাহিদা, অভাব-প্রত্যাশার কথা জানাতে পারে। বাজেট প্রণয়ন অবশ্যই এ রকম একটা প্রক্রিয়ায় হতে হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। ব্যাপক অর্থে এসব মানুষের অংশগ্রহণে যদি বাজেট প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করতে না পারি, তাহলে আসলে ‘জনগণের বাজেট’ প্রণয়ন আদৌ সম্ভব কিনা তাতে আমার সন্দেহ আছে। আমলাদের সৃষ্ট বাজেটে আমরা সন্তুষ্ট না, আমাদের কাছে এটা সত্যিকার অর্থে গ্রহণযোগ্যও না। এটা ঔপনিবেশিক আমলের রেওয়াজ ভাঙতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা বড় সমস্যা ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পারসনস বা আইডিপি যাদের বলা হয়। পার্বত্য অঞ্চলের যেসব অধিবাসী উদ্বাস্তু হয়েছে, যারা ভূমি হারিয়েছে সেটেলারদের কারণে এবং ওখানকার বিভিন্ন সরকারি নিরাপত্তা এজেন্সির অত্যাচারে কিংবা ভারত থেকে যারা উদ্বাস্তু হয়ে চুক্তির পর ফিরে এসেছিল তাদের পুনর্বাসন করা হয়নি। তাদের জন্য একটা বরাদ্দ বাজেটে থাকা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বাজেটকে বিভিন্ন খাত-উপখাতে বিভাজন করতে হবে।

 



শ্রুতলিখন: সৈয়দ মেহরাজ কবির, লাইছ ত্বোহা, অন্তু চন্দ্র নাথ