তারা দুই বোনই কথাসাহিত্যিক— বড় বোন উইনসাম রুথ কে গডেন (১৯০৬-১৯৮৪) আর ছোট বোন মার্গারেট রুমার গডেন (১০ ডিসেম্বর ১৯০৭-৮ নভেম্বর ১৯৯৮)। উইনসাম গডেনই জন গডেন নামে লিখেছেন। পিতার চাকরিসূত্রে ব্রিটেনের নাগরিক এ দুই বোনের শৈশব কেটেছে তত্কালীন পূর্ববঙ্গে, আজকের বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মা-বাবা তাদের ইংল্যান্ড থেকে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। জন ও রুমার গডনের বয়স তখন যথাক্রমে ছয় ও সাত বছর। তাদের পিতা আর্থার লেই গডেন তখন ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানির (ব্রহ্মপুত্র স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি) এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এরপর শুরু হলো জন ও রুমার গডনের ভারতীয় জীবন। তারা বাস করেছেন তত্কালীন পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জে, ঘুরেছেন দার্জিলিং, কাশ্মীর প্রভৃতি স্থান। একবার হুগলি থেকে নদীপথে সফর করেছেন সুন্দরবন। দুই বোন তত্কালীন ভারতবর্ষে কাটানো শৈশব নিয়ে যৌথভাবে স্মৃতিকথা লিখেছিলেন, যা টু আন্ডার দি ইন্ডিয়ান সান নামে ১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। তত্কালীন পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জের জীবন তাদের এ স্মৃতিকথায় অনেকটা জায়গা নিয়ে আছে। কারণ পরিবারের সঙ্গে এ শহরেই তারা বসবাস করেছেন। স্মৃতিকথামূলক এ গ্রন্থে তত্কালীন পূর্ববঙ্গের সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের প্রাণবন্ত বিবরণ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের জীবনযাত্রা, বাংলার মানুষের আচার-প্রথা, ধর্মীয় বিশ্বাস, উত্সব, প্রকৃতির অনুসন্ধিত্সু বিবরণ পাওয়া যায় দুই বোনের স্মৃতিকথায়। গডেনদের নারায়ণগঞ্জের বাড়ির খাবার টেবিলের ভৃত্য ছিলেন মুসলিম, অন্য কাজের জন্য আরো ছিলেন বেশ ক’জন চাকর। আয়া ছিলেন মাদ্রাজের খ্রিস্টান, বাগানের মালি ছিলেন ব্রাহ্মণ আর মেথররা ছিলেন অস্পৃশ্য। ১৯১৯ সালে দুই বোন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন।
রুমার গডেনের প্রকাশিত ৭০টি বইয়ের মধ্যে ২১টি ছিল উপন্যাস। তার উপন্যাসের অনেকগুলোই ছিল বেস্টসেলার এবং সেগুলো অবলম্বনে সিনেমাও নির্মাণ হয়েছে। তার বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ব্ল্যাক নার্সিসাস (১৯৩৮), দ্য রিভার (১৯৪৬), দ্য গ্রিনগেজ সামার (১৯৫৮) প্রভৃতি। বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক জ্যা রেঁনোয়া রুমারের দ্য রিভার উপন্যাসটি অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। এ সময় রুমার এ পরিচালকের সঙ্গে দুই বছর কাজ করেছেন। জন গডেনের প্রথম উপন্যাস দ্য বার্ড এসকেপড প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে— দ্য হাউজ বাই দ্য সি, শিবা’স পিজিয়ন, আহমেদ অ্যান্ড দ্য ওল্ড লেডি প্রভৃতি।
জন ও রুমার গডেনের স্মৃতিকথা টু আন্ডার দি ইন্ডিয়ান সান থেকে নির্বাচিত অংশ এখান অনূদিত হলো—
নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে আমাদের বাড়ির পেছনে তিন ধরনের শব্দ সবসময় শোনা যেত: রাস্তার অপর পাশে থাকা পাটের কারখানা থেকে বের হওয়া বাষ্প— এ বাষ্প যেন আমাদের দিন-রাতের স্পন্দন; তারপর ছিল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাগানে কাকের কা কা; প্রতিদিন ও বেশির ভাগ রাতে বাজার থেকে আসা গমগমে শব্দ: চড়ুইয়ের মতো মানুষের বকবক করার গুঞ্জন, দোকানিদের হাঁকডাক, নারীদের বিলাপ, শিশুদের কান্না। মাঝে মধ্যে হালকা স্বরে ঢোলের শব্দ পাওয়া যেত, এর মানে রাস্তা দিয়ে বানরওয়ালা যাচ্ছে; খেলা দেখানোর জন্য তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুটো বানর ছিল, বানর দুটোর একটা পুরুষ, আরেকটা নারীদের মতো পোশাক পরানো ছিল। চাকররা তাদের ঘিরে থাকত এবং সেখানে কী দেখে তারা হাসছে, সেটা আমাদের দেখতে দিত না। আরো কিছু অবিরাম শব্দ ভেসে আসত— ঠেলাগাড়ি চলার শব্দ, ছাপাখানার শব্দ, ঠেলাগাড়ি বা ভারী মালপত্র ঠেলার সময় কুলিদের ‘হেঁইয়ো! হেঁইয়ো!’ ধ্বনি, কামারশালা থেকে আসা হাপর ও লোহা পেটানোর শব্দ। নদীর শব্দও আসত— লঞ্চের বাঁশি, আরেক ধরনের শব্দ জানান দিত স্টিমারের। মাঝে মধ্যে এসব নিয়মিত শব্দে ব্যাঘাত ঘটত, আর সেটা ছিল আমাদের বাড়ির বিরাট সবুজ গেটটা খোলার শব্দ। এটা সবসময়ই একটা উত্তেজনাকর শব্দ, যা নতুন কারো আগমনের বার্তা ঘোষণা করে। গেটের শব্দ এখনো তেমনই আছে, ডিসেম্বরের এক সুবাসিত দিনে গেটটা আমাদের জন্য প্রথমবারের মতো খুলেছিল, জন ও রুমারের জন্য।
আমরা যখন লন্ডনে রওনা হয়েছিলাম, বাবা তখন আসামেই ছিলেন। কিন্তু এবার আমরা বাংলায় চলে এসেছি, এই নারায়ণগঞ্জ শহরে। তাই আশপাশের সবই ছিল নতুন, শুধু নদী ছাড়া।

আমাদের শিশুবেলার পুরোটাই কেটেছে ভারতীয় নদীর তীরে। সবসময় জোয়ার ও আবহাওয়ার সতর্কতা বার্তা শুনেছি, আর চোখে দেখেছি স্টিমার, লঞ্চ, মোটরচালিত নৌকাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা। নারায়ণগঞ্জের নদীর নাম ছিল লক্ষ্যা, এটা ব্রহ্মপুত্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের একটি অংশ। লক্ষ্যা নদী বেয়ে একবারে শহরে আসা যেত। রেলের একটি শাখা চলে গিয়েছিল ১১ মাইল দূরত্বে ঢাকায়। ঢাকায় যাওয়ার জন্য পাট ও ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া সড়কপথও ছিল, কিন্তু এগুলো সবই ছিল পার্শ্বপথ; মূল যাতায়াত হতো নদীপথে। মা ও বাবা কলকাতায় এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে একত্রিত হতে। আমরা ছিলাম জন, রুমার ও ম্যারি চাচি। শুরুতে মেইল স্টিমারে যাত্রা, রাত ৪টায় আমরা দেখা পেলাম নাইট এক্সপ্রেসের, জায়গাটা ছিল গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থল। এর পর শত মাইল পাড়ি দিয়ে এই ব্রহ্মপুত্র বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এসব নদীর তুলনায় ইউরোপীয় দেশের নদীগুলো নিতান্তই বামনাকার। এখানকার নদীগুলো কোথাও কোথাও প্রস্থে কয়েক মাইল, নদীর পাড় কাদা আর বালিতে পূর্ণ। নদীর তীর থেকে আকাশের তলে ছড়িয়ে থাকে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ।
নদীর তলে ও উপরে বিপুল প্রাণের অস্তিত্ব দেখা যেত। নদীতে কখনো কখনো এত বেশি কচুরিপানা জমে যেত যে, সেগুলো জলযানের চলাচল ব্যাহত করত। বাবা জানিয়েছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে কচুরিপানা নদী থেকে তুলে পাড়ে এনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। নদীতে আছে কুমির আর মাছের বসবাস। আছে শুশুক, যেগুলো পানির ওপর ডিগবাজি খায়। অগভীর পানিতে চলাফেরা করে সারস আর বক। মাছরাঙারা বসে থাকে বিভিন্ন পোস্টের ওপর। স্টিমার চলার সময় নদীর তীরে ডেউ ভাঙে, বাদামি রঙের নগ্ন বালকরা নদীতে ঝাঁপ দেয়, চিত্কার করে, হাসাহাসি করে।
মেইল স্টিমারগুলো ছিল নদীর গ্রেহাউন্ড। মালবাহী স্টিমারগুলোর তুলনায় মেইলগুলো অনেক ছোট। পাট ও চা-বোঝাই বিরাট বার্জও চলত। নদীতে প্রচুর স্থানীয় নৌকা থাকত— ছোট, বড় নানা আকারের। এগুলোর হাল ছিল কাঠের; নৌকাগুলোর অগ্রভাগে চোখ আঁকা থাকত যেন নৌকাগুলো কোথায় যাচ্ছে, সেটা দেখতে পেত। নৌকার এ চোখকে আমাদের খুবই বিচক্ষণ একটা সংযোজন মনে হতো। নৌকাগুলো সাধারণত বৈঠা বেয়ে চালানো হতো, নৌকায় কাঠের তৈরি মাস্তুলে একটা পাল থাকত। বাতাস খুব বেশি হলে পাল বদলে নেয়া হতো, ছিদ্রযুক্ত পাল খাটানো হতো।
আমাদের জীবন বড় বড় নদীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। বাবা এখানকার সবচেয়ে পুরনো স্টিমার কোম্পানিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে যখন মায়ের বিয়ে হয়, তখন তারা আসামে তীরে নোঙর করে থাকা একটা স্টিমারে থাকতেন। জন যখন মায়ের পেটে আসে, তখন তিনি স্টিমারেই, এমনকি জনের জন্মও বলতে গেলে হয়েছে স্টিমারে! এর পর থেকে নদী জনের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল, কিছুটা কম মাত্রায় হলেও এটা রুমারের ক্ষেত্রেও সত্য, যদিও রুমারের জন্ম ইংল্যান্ডের সাগরঘেঁষা এক শহরে। জন ও রুমারের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে, শব্দের আদান-প্রদান ছাড়াই তাদের মধ্যে অনুভূতি আর চিন্তার বিনিময় হতো।
স্টিমারে করে যেদিন আমরা নারায়ণগঞ্জে এসেছিলাম, সেদিন দুই বোনই বুঝেছিলাম— র্যান্ডলফ গার্ডেনের জীবনটা ছিল একটা বিরতি, পরবর্তীতে স্কুলজীবনটাও তা-ই হতে যাচ্ছে। এই নদীমাতৃক দেশই হচ্ছে আমাদের সত্যিকার ঠিকানা।
ঘরাবাড়ি ও গৃহস্থালি
‘ওটা কিসের পতাকা?’
অবশ্যই কোম্পানির পতাকা, একই রকমের পতাকা কোম্পানির স্টিমার, লঞ্চগুলোর পেছনেও উড়তে দেখা যায়। তবে আমাদের জন্য এটা ছিল বাবার পতাকা, আর স্টিমারগুলো ছিল বাবার স্টিমার। ভোরে আমাদের বাড়ির কোণে এ পতাকা উত্তোলন করা হতো। আবার সূর্যাস্তের সময় নামিয়ে ফেলা হতো। আমাদের বাড়ি ছাড়া জীবনে আমরা আরেকটা ব্যক্তিগত বাড়ি দেখেছিলাম, যাদের নিজস্ব পতাকা আছে, সেটা ছিল বাকিংহাম প্রাসাদ।
ভারতীয় রীতি না জানা থাকলে আমাদের বাড়ির চাকরের সংখ্যা যে কারো কাছেই বিস্ময়কর মনে হবে। দারোয়ান গুরু ও মালির বেতন কোম্পানি থেকে দেয়া হতো, পাশাপাশি বাবার সহিসের খরচও। কিন্তু বাকি চাকরদের খরচ বাবাকেই বহন করতে হতো। এটা নিঃসন্দেহে তার বেতনের এক বড় অংশ নিয়ে নিত। কিন্তু কিছুই করার ছিল না, কারণ প্রটোকল কঠোরভাবে মানতে হতো এবং ভারতের নিজস্ব রীতি অনুসারেই এটা নির্ধারণ হতো। একজন পুলিশ সার্জেন্ট তার বাসায় একজন বাবুর্চি নিয়েই চলতে পারতেন, আর তাকে সাহায্য করার জন্য ছিল বাজারের একজন নারী মেথর। কিন্তু বাবাকে কোম্পানির দেয়া নিজের বাসায় এবং একজন এজেন্ট পদমর্যাদার সঙ্গে মানানসই প্রটোকল বজায় রাখতে হতো।
ভারতে বর্ণ প্রথা কঠোরভাবে প্রচলিত ছিল, পেশাও ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত। এখানে পেশার দক্ষতা বংশপরম্পরায় হাতবদল হতো— মালির ছেলে মালি হবে, ধোপার ছেলে ধোপা। জনের মতে, নারায়ণগঞ্জে ধোপার সংখ্যা খুব বেশি ছিল।
নানা বা হান্নাহ কিংবা চাকরদের সঙ্গে ছাড়া একাকী আমাদের বাইরে বেড়ানোর অনুমতি ছিল না। বাবা এটা করেছিলেন ভারতীয় রীতি-নীতি মাথায় রেখেই, সে সময় কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের একা একা ঘরের বাইরে বেরোনোটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার।
যে ভারতীয়দের আমরা সবচেয়ে ভালোভাবে চিনতাম, তারা হলো আমাদের চাকর। আমাদের অনভ্যস্ত চোখে শুরুতে তাদের সবার চেহারা একই রকম লাগত, কিন্তু তারা একে অন্যের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন ছিল। তাদের মধ্যে স্থান, রীতি-নীতি, ধর্ম এমনকি গায়ের রঙের পার্থক্য ছিল। আমাদের একমাত্র ইংরেজ কর্মচারী ছিল মিস অ্যান্ড্রু। নানা ছিল একজন ইউরেশীয়, সে ছিল এক দুর্ভাগা হাউব্রিড, যাকে ইউরোপীয়দের চেয়ে ভারতীয়রা বেশি অবজ্ঞা করত। হান্নাহ ছিল আয়া। সে ছিল মধ্যবয়সী, মর্যাদাবান এবং নানার চেয়ে অনেক বেশি ধীরস্থির। হান্নাহ এসেছে দক্ষিণ ভারত থেকে, মাদ্রাজের নারকেল গাছে ছাওয়া এক গ্রামে তার বাড়ি। আর কোনো চাকর হান্নাহর মাতৃভাষা তামিলের এক বর্ণও বুঝত না। তাতে অবশ্য সমস্যা হতো না, কারণ হান্নাহ সুরেলা স্বরে সবসময় ইংরেজিতে কথা বলত। হান্নাহ ছিল খ্রিস্টান, রোমান ক্যাথলিক থমিস্ট, খুব সম্ভবত খ্রিস্টানদের প্রাচীনতম শাখা। হান্নাহ প্রতি রোববার ভোর ৫টায় উঠে ট্রেনে করে ঢাকায় অবস্থিত রোমান ক্যাথলিক চার্চে যেত। ঢাকায় রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও সেন্ট জোসেফের কনভেন্ট ছিল। আমাদের সবচেয়ে কাছের চার্চ অব ইংল্যান্ড ছিল ঢাকায়। আমাদের একটা ঘোড়ায় টানা ক্যারিজ থাকা সত্ত্বেও দূরত্বটা অনেক বেশি মনে হতো। মেথর নিতাই ছিল হিন্দু। তার মর্যাদা এতটাই নিচে যে, তাকে দূরে রাখা হতো। আর ব্রাহ্মণ মালির স্থান এত উপরে যে, আমরা তার সঙ্গে মিশতে পারতাম না। ব্রাহ্মণরা হিন্দুদের সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত বর্ণ। তারা তিনটা পূত সুতা পরিধান করত— একটি ব্রহ্মা, একটি বিষ্ণু ও একটি শিবের জন্য। এমনকি আমাদের ছায়াও যদি মালির খাবারে পড়ত, তাহলেও তা অপবিত্র হয়ে যেত এবং সে আর তা খেতে পারত না। এ ব্রাহ্মণ শুধু সবজি, ভাত আর ডাল খেত। এমনকি ডিমও খেত না। আমাদের প্রধান মালি গোবিন্দ ছিল বেশ ধার্মিক। তার ঘরের সামনে একটা ছোট পবিত্র তুলসী গাছ ছিল। গোবিন্দ মাঝে মাঝে একাকী বসে ধ্যান করত, তখন তার সঙ্গে কথা বললেও সে শুনতে পেত না। বাবার ব্যক্তিগত ভৃত্য ছিল জেট্টা, সে আমাদের অন্য সব চাকরের তুলনায় হাসিখুশি ছিল; তার মধ্যে কোনো ট্যাবু ছিল না। সে ছিল সিকিম থেকে আসা লেপচা। সিকিম ছিল তিব্বত সীমান্তে একটি ছোট স্বাধীন দেশ। জেট্টা ছিল বৌদ্ধ। আমাদের কয়েকজন মুসলিম চাকরও ছিল। আমাদের টেবিল সারভেন্ট ও মশালচি ছিল মুসলিম। তরুণ খেদমতগার— ওয়েটার মুস্তাফা ছিল আমাদের বন্ধু। কালো কোঁকড়ানো দাড়ি আর ঢলো ঢলো চোখের মুস্তাফা ছিল দারুণ হ্যান্ডসাম। নার্সারি বিয়ারার আবদুল ছিল আমাদের শত্রু। সত্যি বলতে, কেউই তাকে পছন্দ করত না। মুস্তাফা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চাকর আর আবদুল ছিল একটা আপদ, তার ভাব ছিল সবজান্তা এবং সারাক্ষণই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করত। তার চেহারা কুিসত ছিল এবং তার মনটাও তা-ই। সে চুরি করত এবং মিথ্যা বলত। খানসামা আজাদ আলীকে টি-পট বহন আর পাত্রে পানীয় ঢালা ব্যতীত আর কোনো কাজ করতে কেউ দেখেনি।
গোবিন্দের মতো আজাদ আলী ছিল কঠোর ধার্মিক এবং মুস্তাফা সবকিছুতেই আজাদকে অনুকরণ করত। তাই সেও ধার্মিক ছিল। তাদের দুজনের কব্জিতে কোরানের আয়াত সিল্কের কাপড়ে বাঁধা থাকত। ফারসি লিপিতে লেখা এ আয়াত থাকত একটি ছোট্ট ধাতব বক্সের (তাবিজ) মধ্যে। আমরা জানতাম যে, এটা কোনোভাবেই আমাদের স্পর্শ করা উচিত নয়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’— আজাদ আলী, মুস্তাফা এবং মাঝে মাঝে আবদুলও সুর করে আবৃত্তি করত। জেট্টাকে আমরা কখনো প্রার্থনা করতে দেখিনি। দূরে সেই পর্বতের দেশে ঘূর্ণায়মান চাকা আর বাতাসে ওড়া পতাকাগুলো তার হয়ে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা জানায়। ‘রাম, রাম, রাম, রাম’— গোবিন্দ বারবার আওড়াতে থাকে। ‘গড দ্য ফাদার, গড দ্য সন অ্যান্ড গড দ্য হোলি গোস্ট’— রান্না করতে করতে হান্নাহ আওড়ায়। সবার ঈশ্বরই আমাদের ঘরে ছিল।
নারায়ণগঞ্জে আমাদের বাড়ির সঙ্গে অনেক বড় বাগান ছিল, পেছনে ছিল একটা বড় পুকুর। বাংলায় মানুষের খনন করা এ রকম অসংখ্য পুকুর ছিল। আমাদের পেছনের পুকুরের অন্যপ্রান্তে ছিল বস্তি। সেখানকরা ময়লা সব এ পুকুরেই পড়ত। তাই পুকুরে মাছ ধরা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আমরা তার পরও পুকুরে মাছ ধরতে যেতাম। পুকুরের পাড়ে ছিল কিচেন গার্ডেন, আস্তাবল ও চাকরদের থাকার জায়গা।
আমাদের বাড়িতে ছয়টা কক্ষ ছিল, কিন্তু একেকটা কক্ষ বলরুমের মতো বড় ছিল। ঠাণ্ডা রাখার জন্য কক্ষগুলোর ছাদ ছিল মেঝে থেকে অনেক উঁচু, অনেকটা গুহার মতো মনে হতো। নয় মাস বৈদ্যুতিক ফ্যান চলত, দেয়ালগুলো ছিল সাদা চুনকাম করা, মেঝেতে ছিল পাথর।
আমরা সত্যিকার হাতি দেখেছিলাম নিডহ্যামের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। মি. নিডহ্যাম ছিলেন এক নওয়াবের উপদেষ্টা ও ব্যবস্থাপক। তিনি ঢাকার অদূরে একটি ছোট এস্টেটে থাকতেন। সেখানে যাওয়াটা ছিল আমাদের সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটা। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পরে এস্টেটের একটি হাতির পিঠে আমাদের চড়ানো হলো।
পশু-পাখিরা সবসময়ই আমাদের জীবনের একটা অংশ ছিল। র্যান্ডলফ গার্ডেনে যত্ন করার মতো কিছু ছিল না, লন্ডন চড়ুই আর বাগানের দেয়ালে বসে থাকা দু-একটা রাস্তার বেড়াল ছাড়া দেখার মতো জীবিত কিছু ছিল না। কিন্তু এখানে নারায়ণগঞ্জের বাগান অসংখ্য, অদ্ভুত আর মনোমুগ্ধকর পাখিতে পূর্ণ। ডোরাকাটাওয়ালা অনেক কাঠবিড়ালি আসত। ভারতীয় কাহিনী অনুসারে এ ডোরাকাট দাগ দেবতা শিবের পবিত্র আঙুলের ছাপ। আমাদের বাগানে মাঝে মাঝেই বানর আসত। একটা বড় আকারের বদ প্রকৃতির হনুমান ছিল গোবিন্দর শত্রু। কারণ এটা তার বাগানের সবজি চুরি করত এবং লেটুস তুলে ফেলত আর বাগান নষ্ট করত।
রাতে পেঁচার ডাক শুনতে পেতাম, গাছের তলায় শেয়াল দেখা যেত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে আমাদের বাড়িতে ছিল ঘোড়া, শূয়র ও খরগোশ। মেরি আন্টি মাঝে মাঝে বলতেন, ‘এই বাসা শিগগিরই একটা চিড়িয়াখানা হয়ে যাবে।’ এসবের পরও আমরা একটা কুকুর চেয়েছিলাম।
আমরা ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসতাম। রঙিন কাগজ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি ভারতীয় ঘুড়িগুলো ছিল অসাধারণ। দারোয়ান গুরু বাজার থেকে আমাদের জন্য ঘুড়ি কিনে আনত। সে কাচের গুঁড়ো আর ময়দা ব্যবহার করে কীভাবে সুতা ধার করতে হয় তা দেখাত। সুতা ধার করার পর বাঁশ দিয়ে তৈরি লাটাইতে পেঁচানো হতো। সে-ই আমাদের ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়েছিল।
বেশির ভাগ শিশু বড় হয় শুধু তাদের নিজেদের জগত্ জেনে-বুঝে; তাদের নিজেদের মানুষ, নিজেদের জীবনযাপন রীতিতে। কিন্তু আমরা খুবই ভাগ্যবান যে, আমরা অনেক সুতোর মধ্যে বড় হয়েছি। এ সুতোগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের, তারা কিছু সময়ের জন্য আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কখনো মধুর হান্নাহর সঙ্গে আবার কখনো যুদ্ধবস্থা আবদুল ও আজাদ আলীর সঙ্গে।
দিনের বুনট
পুরো পরিবারের একসঙ্গে প্রাতরাশ করাটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। বাগানে বা ডাইনিং রুমে বিরাট গোলটেবিল ঘিরে আমরা সবাই বসতাম। প্রতিদিন পরিষ্কার টেবিল ক্লথ থাকত— থাকবেইবা না কেন? আমাদের তো নিজেদের ধোপা ছিল। টেবিলের মাঝে তাজা ফুল থাকত; মা গোবিন্দকে দিয়ে এ ফুল আনিয়ে নিতেন। লন্ডনের বিস্বাদ ডিম আর ভয়াবহ পরিজের তুলনায় এখানকার খাবার ছিল খুব সুস্বাদু। নারায়ণগঞ্জে আমাদের সকালের নাশতা ছিল খিচুড়ি বা ভাত-ডাল ও ডিম পোচ। তবে সবচেয়ে সেরা ছিল ফল— পেঁপের রঙ ছিল সোনালি, ভেতরে কালো রঙের বিচি। এ কালো বিচিতেই নাকি সব ভিটামিন জমা থাকত কিন্তু আমরা কখনো এ বিচি খেতাম না। লিচু ও আম পাকত গরমের সময় কিন্তু সে সময় আমরা সাধারণত পাহাড়ে থাকতাম। তবে বাবা মাঝে মধ্যে আমাদের কাছে ঝুড়িভর্তি আম-লিচু পাঠিয়ে দিত।
বাজারগুলো বিকালে জমজমাট হয়ে উঠত। মানুষ, গলার স্বর, ঘ্রাণ মিলিয়ে বাজারগুলো প্রাণপূর্ণ হয়ে উঠত। সরু রাস্তা জনাকীর্ণ হয়ে পড়ত, আমাদের জন্য গুরুকে পথ পরিষ্কার করতে হতো। বাজার দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অগণিত কল্পনা আমাদের মনে ডানা মেলত: আমরা যদি হিন্দু হতাম, তাহলে মন্দিরে যেতাম পূজা করতে, সেখানে দেবীর মূর্তির সামনে পুরোহিত প্রদীপ দোলান— তাহলে কেমন হতো? কুঁড়েঘরের সামনে বাবা আর ছেলে মাটিতে মাদুর বিছিয়ে ডান হাত ব্যবহার করে খান, পিতলের থালায় স্তূপ করে রাখা ভাত আর তরকারি, বেশির ভাগ সময় শুধু শাকপাতা— স্ত্রী আর মা চেয়ে চেয়ে একটু দূরে ঘোমটায় মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরুষ সদস্যদের খাওয়া দেখছেন; এমন হলে কেমন হতো? স্ত্রী-কন্যাকে খাওয়ার জন্য তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
দ্য বেঙ্গল ইয়ার
আমাদের জন্য ঠাণ্ডা আবহাওয়া মানে বাংলার শীতকাল শুরু হয় হিন্দুদের আলোর উত্সব দীপাবলির মাধ্যমে। দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির পরই এটা আসে। এ উত্সব কালীর প্রতি উত্সর্গীকৃত। কালী সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না। বাংলায় কালীপূজা খুব জনপ্রিয়। তবে আমাদের খুব অবাক লাগে, মানুষ কী করে কালীর ভীষণ দর্শন রূপকে ভালোবাসে!
আমাদের বাসায় সবসময়ই দীপাবলির উত্সব হতো। সারা দিন আমরা গুরু, গোবিন্দ ও বাগানের অন্য কর্মচারীদের প্রদীপ তৈরি
এবং সেগুলো গেটের খিলান, ছাদের প্রাচীর, বারান্দার রেলিংয়ের ওপর সাজাতে সাহায্য করতাম। আবার নানা রকমের জ্বালাতন করে তাদের কাজে ব্যাঘাতও ঘটাতাম। মুসলিম চাকররাও এ উত্সবে শামিল হতো। কারণ এ উত্সবে সবাই অংশ নিত। বাবা বলেছিলেন, মোগল সম্রাট আকবরও নাকি এ উত্সবের রাতে তার প্রাসাদ প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করতেন। বাগানে গিয়ে আমরা আলোয় উদ্ভাসিত বাসার দিকে চেয়ে থাকতাম। নদীতে নৌকা এমনকি বাবার স্টিমারগুলোয় সোনা রঙের আলো আঁধারে জ্বলজ্বল করত। সন্ধ্যায় আমরা বাবাসহ পরিবারের সবাই ‘আলো’ দেখতে সোনাচরা যেতাম।
রুমার একদিন গোবিন্দকে ক্ষেপানোর জন্য ব্যঙ্গ করে ‘রাম, রাম, রাম’ বলে চিত্কার করেছিল। গোবিন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে ঝট করে রুমারকে চেপে ধরেছিল, তার চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছিল। চোখের এ আগুনে রুমার ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সারা দিন সে এ ঘটনা ভুলতে পারেনি এবং তার মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছিল। শান্ত এবং দয়ালু স্বভাবের গোবিন্দ বাবার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এক বৈঠকে বসল। বাবা একটু পরে রুমারকে সেই কক্ষে ডেকে নিলেন। বাবা কঠোর স্বরে রুমারকে বললেন, ‘ঈশ্বর মানে ঈশ্বর। তা সে আমাদের হোক, আজাদ আলীর কিংবা গোবিন্দের ঈশ্বর।’
রুমার বলল, ‘ইভিলিন কেট আন্টি বলেছেন, আমাদের ঈশ্বরই সত্যিকার ঈশ্বর।’
‘আমি জানি সে এমনটাই বলেছে।’ বাবা আরো কঠোর স্বরে বলেছিলেন, ‘এটা কোনো যুক্তি নয়। তুমি যখন অন্যের দেশে থাকবে তখন তারা যাকে শ্রদ্ধা করে, তোমাকেও তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না।’
আমাদের কাছে শীতকালটাই বছরের সেরা সময়। কিন্তু এটা এখানে খুবই সংক্ষিপ্ত। মার্চ হচ্ছে ঝড়ের সময়। একবার ভয়ানক এক সাইক্লোন নারায়ণগঞ্জ শহর লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। আমরা তখন পাহাড়ে, বাবা বাসায় একলা ছিলেন। পরবর্তীতে বাবা আমাদের বলেছিলেন, সেদিনের ঝড়ে তার সবচেয়ে বড় স্টিমারগুলোর একটিকে বাতাসের তাণ্ডব নদীতীরের ১০০ গজ ভেতরে নিয়ে এসেছিল। আমাদের বাড়ির জানালা ভেঙে গিয়ে উপরের তলা জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে বড় আমগাছটা উপড়ে পড়েছিল। পেছনের বস্তিটা পুরোটাই পুকুরের মধ্যে পড়েছিল।
বছরের একটা সময় আমরা আমাদের মুসলিম চাকরদের উত্ত্যক্ত করতাম না, এমনকি আবদুলকেও না। সেটা ছিল পবিত্র মাস রমজান। এ পবিত্র মাসেই নবী মুহাম্মদের (সা.) ওপর কোরান অবতীর্ণ হয়েছিল। আকাশে নতুন চাঁদ ওঠার আগ পর্যন্ত ২৯ বা ৩০ দিন মুসলমানরা রোজা রাখে।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারা রোজা রাখে কেন?’
মা জবাবে জানালেন, ‘অন্যদের কষ্ট-দুর্দশা অনুভব করতে।’
‘মানে কেউ দুর্দশায় না থাকলেও সে তা অনুভব করবে?’
এটাই ছিল মূল বিষয়; আজাদ আলী ও মুস্তাফা অন্য মুসলমানদের মতো সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছু খেত না বা পান করত না। ‘এক ফোঁটা পানিও না’— আবদুল গর্বের সঙ্গে জানাল। আবদুল বলত, সেও রোজা রাখে কিন্তু আমাদের সন্দেহ আছে সে সত্যি বলে কিনা।
নতুন চাঁদ উঠলে রোজা শেষ হয় এবং সেই চাঁদকে বলা হয় ঈদের চাঁদ। ঈদের উত্সব মানে উপহার আর ভোজ। এই বিশেষ দিনের জন্য উত্তর দিক থেকে উট আসত। এটাই একমাত্র সময় যখন বাংলায় উট দেখা যেত। উট এখানে ব্যয়বহুল। নবীর প্রিয় খাবার ছিল উট।
রমজান মাঝে মাঝে বসন্তের শেষ দিকে আসে। এটা চাঁদের ওপর নির্ভর করে। মুসলমানদের সব উত্সবই চান্দ্রবর্ষ অনুসরণ করে। তাই উত্সবের তারিখগুলো প্রতি বছর পরিবর্তন হয়। এভাবে গরমের দিনে রোজার মাস পড়লে সেটা রোজাদারদের জন্য খুব কষ্টকর হয়।
এপ্রিল, মে মাসে সূর্য দেবতা বেরিয়ে আসেন। প্রতিটা দিন আরো বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ধানক্ষেত, পুকুর শুকিয়ে যায়। মাটি ফেটে চৌচির হয়। গাছ থেকে ফুল শুকিয়ে মাটিতে পড়ে।
আমরা দুই বোন— জন ও রুমার বাংলার পূর্ণাঙ্গ বছর দেখেছি কেবল একবার। বাংলায় প্রথম গরমের মৌসুমে বাবা আমাদের পাহাড়ে পাঠাতে পারেননি। কারণ আমাদের ইংল্যান্ড থেকে আনতে বাবার অনেক টাকা খরচ হয়েছিল, তাই সেবার আর পাহাড়ে গমন সম্ভব হয়নি। গরম সহ্য করা কাকে বলে, সেটা আমরা সেবার বুঝেছিলাম। চারদিকে ধুলা আর শুষ্কতা। শরীরের ত্বক শুকিয়ে গিয়েছিল। চোখের পাপড়ি এমনভাবে পড়ে যেত যে মনে হতো, সেগুলো কাগজের তৈরি। বারান্দায় যেখানে সূর্যের আলো পড়ত, সেখানকার পাথর এত উত্তপ্ত হয়ে উঠত যে, খালি পায়ে পা রাখা যেত না। খুব ভোর বা রাতেই কেবল ছাদে যাওয়া যেত।
নারায়ণগঞ্জের বড়দিন অন্য জায়গার মতো ছিল না। আমাদের পরিবারে ক্রিসমাসের কোনো কেনাকাটা ছিল না। কলকাতা থেকে ডাকযোগে ক্যাটালগ থেকে আমরা জিনিসপত্র কিনতাম। বড়দিনে আমাদের বাড়ি সাজানো হতো না। নারায়ণগঞ্জে কোনো ক্রিসমাস ট্রি ছিল না। একবার শুধু ক্লাব পার্টিতে একটা ক্রিসমাস ট্রি দেখেছিলাম। বাবার উদ্যোগে বড়দিনে আমরা হাঁস শিকারে যেতাম।
নারায়ণগঞ্জে বসবাসকালে আমরা একবার সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সে গল্প পরে একদিন বলা যাবে।






