বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারীর ইতিহাস অথবা লিঙ্গচর্চাবিষয়ক আন্তঃশাস্ত্রীয় গবেষণার অভাবিত অগ্রগতি হলেও বাংলার ইতিহাসের আদি ও মধ্য পর্বের বয়ানে নারীর প্রতিচ্ছবি কোনো না কোনো রাজা, সম্রাট, সুলতান, বাদশাহর মাতা, স্ত্রী, দুহিতা­—এই ত্রিবিদ ভূমিকার মধ্যেই গতায়াতে লিপ্ত। হালফিলের গবেষকদের এই ভাবনার বাইরে দৃষ্টি ক্ষেপণের আভাস দেখা দিলেও তা কেবল উনিশ-বিশ-একুশ শতকীয় কালপর্বেই ক্রিয়াশীল। এই প্রেক্ষাপটে অনেকটাই ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকার’ বুলি আউড়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর সামাজিক প্রভাব বলয়ে নারীর অবস্থান ও অভিজাত-সম্ভ্রান্ত রাজ অন্তঃপুরের শ্রেণী কাঠামোকে মান্যতা নিয়েই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার জীবনের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নারী মেহেরউননিসা (ঘসেটি বেগম নামে সুপরিচিত) এবং লুৎফুন্নেসার সরব উপস্থিতি খোঁজাই আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য। ইতিহাস লিখনের শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী সমকালীন আকরসূত্রই আমার অন্ধের যষ্ঠি। লিঙ্গচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিহীনতা এবং সূত্রগুলোর লেখকদের লিঙ্গ পরিচয়কে (তারা সকলেই পুরুষ, বর্তমান লেখকের এই পরিচয় সত্তা অস্বীকারের উপায় নেই) সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা মেনেই পরবর্তী রচনা। আশা করি, নারীর ইতিহাসের গবেষক, লিঙ্গচর্চায় বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ পাঠকও অজ্ঞতাকে অযাচিত চর্চা মনে করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে এড়িয়ে যাবেন।

বাংলার শেষ ট্র্যাজিক হিরো নবাব সিরাজউদ্দৌলার জাতীয় নায়কে পরিণত হওয়ার পেছনে উনিশ-বিশ শতকের বাংলা নাটক ও উপন্যাসের ভূমিকা সুবিদিত। প্রসঙ্গত গিরিশচন্দ্র ঘোষের সিরাজদ্দৌলা: ঐতিহাসিক নাটক (কলিকাতা:১৩৬১), শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সিরাজদ্দৌলা (কলিকাতা: ১৩৩৮), অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের সিরাজদ্দৌলা, নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধসহ তালিকাটি দীর্ঘ; বাংলা সিনেমার কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ফর্দের বাইরে পলাশীর যুদ্ধের তিন দশকের মধ্যেই লেখা গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সালাতিন এবং গোলাম হোসেন তবাতবায়ির লেখা সিয়ার-উল মুতাখিখরিন গ্রন্থদ্বয় বর্তমান লেখকের আকর সূত্র। দুজনেই ফারসি ভাষায় তাদের ইতিহাসগ্রন্থ লিখেছেন ইউরোপীয় সাহেবদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তারা উভয়েই সমসাময়িক একাধিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, অধিকন্তু গোলাম হোসেন তবাতবায়ি পলাশীর নাটকের সক্রিয় অভিনেতাদের ঘনিষ্ঠজন, আবার কখনো নিজেই মঞ্চসজ্জায় পর্দার আড়ালের কর্তাব্যক্তি। বাংলার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদে গ্রন্থ দুটি ইতিহাস গবেষক ও পাঠক মহলে সুবিদিত। এ কারণে সীমিত পরিসর বিবেচনায় উৎস পরিচয় অংশটুকু এড়িয়ে যাওয়া হলো।

রিয়াজ-উস-সালাতিনের প্রথম সঠিক বঙ্গানুবাদক শ্রী রামপ্রাণ গুপ্ত (১৩১২ বঙ্গাব্দ) অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ধারাক্রমে ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ উপশিরোনামের প্রথম প্যারাগ্রাফেই মাননীয়া মেহেরউন্নিসা বা ঘসেটি বেগমের উল্লেখ করেন নিম্নরূপে:

সিরাজদ্দৌলা বাঙ্গলা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসন কর্তৃপদে অভিষিক্ত হইয়া ঈশ্বরের অনভিপ্রেত ঘৃণিত কার্য্য অর্থাৎ দুর্ব্বিনীত ব্যবহার করিতে লাগিলেন। সিরাজের সিংহাসনারোহণকালে শেহামত জঙ্গের বেগম ঘসেটি মতিঝিলে বাস করিতেন। তিনি কতিপয় কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার জন্য উদ্যোগ করিয়া আপনার প্রধান অবলম্বন নজর আলীকে অগ্রগামী সেনা দলের অধিনায়ক পদে এবং নবাব বিরাম খাঁকে মিরবক্সীর পদে বরণ করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণা হইলেন। নজর আলী বেগমের সহিত সানুগ্রহ ও বদান্যতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। সিরাজের অনুরোধে আলীবর্দী খাঁর বেগম ও জগেশঠ ঘসেটী বেগমের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে কয়েকটি কথা বলিলেন। তিনি এ বিষয়ে হস্ত সঙ্কুচিত করিলেন। নজর আলী পলায়ন করিলেন এবং বিরাম খাঁ একজন জমাদারের আশ্রিত ও অপদস্থ হইলেন। সিরাজ সৈন্য ঘসেটী বেগমের বাসস্থান ও অট্টালিকা সমূলে বিনষ্ট করিয়া সঞ্চিত ধনরাশি বাহির করিয়া মনশুরগঞ্জে লইয়া গেলেন। (পৃষ্ঠা: ২২২)

গ্রন্থকার গোলাম হোসেন সলিম এই অনুচ্ছেদের পরবর্তী প্যারাগ্রাফ থেকে প্রায় ৪ পৃষ্ঠা (প্রকাশিত অনুবাদে, মূল গ্রন্থের হিসাবে নয়) পর আবারো ঘসেটি বেগমের উল্লেখ করেন:

...এবার তিনি অসতর্কতা পরিত্যাগ করিয়া জাফর আলী খাঁর সহিত সখ্য সংস্থাপনের জন্য মহাবত জঙ্গের বেগমকে তাঁহার নিকট প্রেরণ পূর্ব্বক ক্ষমা প্রার্থনা করেন। (পৃষ্ঠা ২২৬)

উল্লেখ্য, প্রথম ঘটনাটি হয়েছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাংলার মসনদে বসার পরপরই এবং দ্বিতীয়টি পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগেই। এরই মধ্যে ইংরেজ বাহিনী কলকাতা থেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। উপরের দুটি বর্ণনায় ক্ষমতাকাঠামোয় ঘসেটি বেগমের উপস্থিতি সরব। এটি মানতেই হবে, প্রথমবার তিনি নবাবের রোষানলে পড়েছিলেন শওকত জংকে বাংলার মসনদে বসানোর অভিলাষ ও সম্পৃক্ততার কারণে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাকাঠামোয় ‘নারী’ সত্তা পরিচয়ের মাতৃসত্তাই পাঠককে জানান দিচ্ছে। দ্বিতীয় ঘটনাতেও তিনি সিরাজের ‘দূতক’; প্রধান সেনাপতিকে বাগে আনার হাতিয়ার। কূটনৈতিক, নবাবের দূত বা সিরাজের খালা প্রমুখ ব্যক্তি সত্তা বা নারী সত্তা যাই উপস্থাপিত হোক না কেন ক্ষমতাকাঠামোতে তা যেন ছায়া বা পরিপূরক। খালার প্রতি ভাগ্নে সিরাজের অনুরোধ, স্নেহ, ভালোবাসা সেখানে হয়তো মুখ্য নয়; তবে সেটিকে অস্বীকার করার উপায়ও নেই।

রিয়াজের বর্ণনায় ঘসেটি বেগমের উল্লেখের যবনিকাপাত ঘটে পলাশীর যুদ্ধের পর। ‘নবাব সুজাউলমোল্ক জাফর আলী খাঁ’ উপশিরোনামের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে। যুদ্ধ-ষড়যন্ত্র-হত্যা-নির্মমতার চরম দৃষ্টান্ত সেটি। অনুবাদক রামপ্রাণগুপ্তের শব্দ-জালে তা নিম্নরূপ:

জাফর আলী খাঁ ও ছাদেক আলী খাঁ নবাব সিরাজদ্দৌলার ধন সম্পত্তি হস্তগত করিতে প্রবৃত্ত হন। তাঁহারা মহাবত জঙ্গের বেগম, তাঁহার কন্যাদ্বয়, (শেহামত জঙ্গের মহিষী ঘষেটী বেগম ও সিরাজের মাতা আমিনা বেগম) এবং মহাবত জঙ্গের পরিবারভুক্ত অন্যান্য মহিলাদিগকে একদিনের আহার্য্য বস্তুর জন্যও পরমুখাপেক্ষিনী করিয়া তাঁহাদিগকে ইতিপূর্ব্বেই জাহাঙ্গীর নগরে প্রেরণ করিয়াছিলেন; এক্ষণ জাফর আলী খাঁ এবং ছাদেক আলী খাঁ বাখর খাঁ জমাদারকে ১০০ শত অশ্বারোহী সৈন্য সমভিব্যাহারে জাহাঙ্গীর নগরে প্রেরণ করিলেন। এই ব্যক্তির...হস্তে ঘষেটী বেগম ও আমিনা বেগমকে ধৃত করিয়া সমর্পণ করিবার জন্য তথাকার ফৌজদার আদিষ্ট হন।...জাছারাত খাঁ নিরুপায় হইয়া এই আদেশ প্রতিপালন করিলেন। বাখর খাঁ বেগম দিগকে সঙ্গে লইয়া নৌকারহণে কিয়দ্দূর অগ্রসর হইলেন এবং তত্পর তাহাদিগকে জলে ডুবাইয়া দিলেন। এরূপ কথিত আছে, জলে নিমজ্জিত করিয়া তাহাদিগকে নৌকায় আরোহণ করাইলে দুই ভগিনী দুই রেকাত নমাজ পাঠ করেন এবং কুক্ষিতলে কোরাণশরিফ ধারণ পূর্ব্বক পরস্পর আলিঙ্গন বন্ধ হইয়া জলে পতিত হন। (পৃষ্ঠা ২২৯)

এ ঘটনার দীর্ঘ ও নাটকীয় বিবরণ পাওয়া যায় সমসাময়িক আরেকটি সূত্র সিয়ার-উল-মোতাখিখরিন গ্রন্থে। ১৭৫৯ সালের জুন মাসের এই হূদয়বিদারক ঘটনার বঙ্গানুবাদের জন্য আমি দ্বারস্থ হয়েছি মান্যবর প্রয়াত আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া কর্তৃক টীকাসংবলিত বাংলা অনুবাদের নিকট। বর্ণনাটি নিম্নরূপ:

মির জা’ফর খান জাহাঙ্গীর নগর ঢাকার শাসনকর্তা জেসারত খানকে পত্র লিখে প্রয়াত নবাব আলিবর্দী খানের হতভাগিনী দুই বর্ষিয়সী কন্যাকে হত্যা করার জন্য আদেশ দেন।...মিরন এই হতভাগিনী মহিলা দুজনকেও সন্দেহের চোখে দেখেন...জেসারত খান...এই ঘৃণ্য কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। মিরন...নিজের একজন লোককে ঢাকায় প্রেরণ করেন এই হতভাগিনী মহিলাদের হত্যা করার জন্য। তিনি সেই ব্যক্তিকে (গোপনে) বলে দেন যে, সেই ব্যক্তি যেন তাদেরকে মুর্শিদাবাদে আনয়ন করার নাম করে একটি নৌকাতে করে ঢাকা শহর থেকে বাইরে আনার পর সেই নৌকা ডুবিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। (পৃষ্ঠা ৬৪৩-৪৪)

সিয়ারের ভাষ্যমতে, জেসারত খান মিরনের পাঠানো ব্যক্তির হাতে আমেনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে নৌকায় তুলে দেন। নৌকা ঢাকার বাইরে উপযুক্ত স্থানে থামলে দুই বোনকে প্রকৃত উদ্দেশ্য জানানো হয়। বড় বোন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কান্না শুরু করলে ছোট বোন আমেনা বেগম বলেন, ‘আপা আপনি ভয় পেয়ে কাঁদছেন কেন? একদিন তো আমাদের মরতেই হবে। সেদিন আজই হয়ে যাক না কেন।’ (পৃষ্ঠা ৬৪৪) দুজনই পাক-পবিত্র হয়ে কাফনের কাপড়ের বদলে পরিষ্কার চাদর পড়েন। নিজেদের শরীরে মাখেন হযরত আলীর মাজার থেকে আনা মৃত্তিকা। আল্লাহর কাছে হাত তুলে গুনাহ মাফের দোয়া করেন। ‘পবিত্র মাটি চুম্বন করে তারা হাত ধরাধরি করে এক যোগে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন এবং অনন্ত ঐশ্বরিক করুণা লাভ করেন।’ (পৃষ্ঠা ৬৪৪)

দুটি সূত্রেই বর্ণিত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু মহিলাদ্বয়কে উপস্থাপন করা হয়েছে কন্যা, স্ত্রী অথবা মাতারূপে। ব্যক্তি মানুষ পরিচয়ের চাইতে ‘আলিবর্দী খানের অসহায়া দুই কন্যা’, ‘শেহামত জঙ্গের বেগম’, কিংবা ‘সিরাজের মাতা’ পরিচয়ই পেয়েছে প্রাধান্য। নারী অনুগামী, সহগামী কিংবা কর্তা পুরুষ এর সাথে সংযুক্তা সত্তা।

এ প্রসঙ্গে আলিবর্দি খানের দুই কন্যাকে বুড়িগঙ্গার জলে ডুবিয়ে হত্যা করার কহিনীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে মান্যবর অনুবাদকের ভাষ্য অনুল্লেখ পাঠককে কিছুটা অন্ধকারে রাখার শামিল হবে। যাকারিয়ার মতে, ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগমকে ডুবিয়ে মারার ঘটনাটি মিথ্যা। মুর্শিদাবাদের নিযামত রেকর্ডস অনুযায়ী, ‘শরফউননিসা বেগম এবং আমিনা বেগমকে মাসিক বৃত্তি দেওয়া হতো। তাঁদের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে এবং খোশবাগে আলিবর্দী খানের পাশেই কবর দেওয়া হয়েছিল’। (পৃ. ৬৪০-৬৪৩)

এছাড়া যাকারিয়া যুক্তি দেখান যে আলিবর্দী মহিষী শরফ-উন-নিসা বেগম, সিরাজ মহিষী লুৎফুন্নেসা বেগম ও তার বালিকা কন্যা উম্মে জোহরা এবং পরিবারের আরো অনেককে বাদ দিয়ে মিরান কেন কেবল এই দুই বৃদ্ধাকে হত্যা করবেন? সমস্ত কাহিনীটিই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।

ইতিহাসবিদ এমএ রহিম বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস গ্রন্থে সমকালীন নারীদের সামাজিক অবস্থান প্রসঙ্গে কিছু বিশেষ দিক তুলে ধরেন। প্রথমত নারীরা ছিল পুরুষের উপর নির্ভরশীলা। দ্বিতীয়ত তারা হারেমে পর্দান্তরালে বসবাস করতেন। তৃতীয়ত সমাজের উচ্চস্তরেই নারীদের উচ্চশিক্ষা এবং তাদের কাজকর্মের সুযোগ ছিল; তবে তা গৃহাভ্যন্তরেই সীমিত ছিল। চতুর্থত তাদের আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। তবে তিনি এটিও বলেছেন, ব্যক্তিত্ব বলে পুরুষের উপর আধিপত্য করে যাওয়া তেজস্বিনী নারীর দৃষ্টান্তও ছিল। যেমন: মুর্শিদকুলী খানের কন্যা জিন্নতুন্নেছা, দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খানের স্ত্রী দারদানা বেগম, সরফরাজ খানের ভগ্নী নাফিসা বেগম (পৃষ্ঠা ১৮০-১৯২)। আদর্শ স্ত্রী, বিপদে স্বামীর অকৃত্রিম বন্ধু, বিচক্ষণ, ধর্মপরায়ন ও পবিত্র চরিত্রের প্রতি অষ্টাদশ শতকের ফারসি ভাষার ইতিহাসবিদগণের অনুরুক্তি নানা প্রসঙ্গে নানা স্থানে এসেছে।

সিরাজ সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ছিলেন আদর্শায়িত চরিত্র। স্বামীর মৃত্যুর পরও একাধিক ব্যক্তির বিবাহ প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন। এমনকি মীর জাফর ও মিরন তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। করম আলী রচিত মুজফ্ফরনামায় লুৎফুন্নেসার উত্তর বলা হয়েছে: ‘পূর্বে হাতির পিঠে চড়ে এখন আমি গাধার পিঠে চড়তে নিচু হতে পারি না।’ ৩৪ বছর অশ্রুপাত করা এই রমণীর ত্যাগের বর্ণনায় এমএ রহিম বলেন:

চরম অমার্যাদা ও দুঃখ দৈন্যে পতিত হয়েও এবং মীর জাফর ও মিরন কর্তৃক সকল বিষয় সম্পদ থেকে বঞ্চিতা হওয়া সত্ত্বেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকদের প্রদত্ত সামান্য ভাতার উপর নির্ভর করে এই মহত্প্রাণা মহিলা সকল দুঃখ কষ্ট নীরবে সহ্য করেছেন এবং স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন।...তিনি খোশবাগে স্বামীর কবরের উপর ফুল ছড়িয়ে দিতেন এবং প্রতি রাতে প্রদীপ জ্বালাতেন। স্বামীর কবরের পার্শ্বে প্রার্থনারত অবস্থায় একদিন তিনি তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (পৃষ্ঠা ১৯০)

অষ্টাদশ শতাব্দীর লুৎফুন্নেসার পরিচয় বাধা পড়েছিল ভাগ্যহত পরাজিত সিরাজের সমাধিতে। স্ত্রীরূপে নারী সত্তার বহুল ব্যবহূত পরিচয়সত্তায়।

পাঠকের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাই সিয়ারের লেখকের ভাবনার অসংগতির কিছু দিক তুলে ধরে। গোলাম হোসেন গ্রন্থটিতে সর্বত্র অসংখ্য ‘বয়াত’, ‘কিত্তা’, ‘মিসরা’ ইত্যাদি সংযোজন করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের রচয়িতার নাম উল্লেখ করেছেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ও হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় উপস্থাপিত কবিতার পঙিক্তমালায় প্রতিহিংসা প্রাধান্য পেয়েছে। যাকারিয়া মহোদয়ের মতে, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলার ঘোর বিদ্বেষী এবং কারণে-অকারণে সিরাজের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী গ্রন্থকার সৈয়দ গোলাম হোসেন খানের পক্ষেই এই ধরনের বিদ্রূপাত্মক এবং সেই সঙ্গে হিংসাত্মক কবিতা রচনা করা সম্ভব।’ এছাড়া গোলাম হোসেন উপস্থাপিত আলিবর্দি খানের তিন কন্যার মুর্শিদাবাদ নগরীতে প্রকাশ্যে চারিত্রিক স্খলন ও মানসিক ভারসাম্যহীন কর্মকাণ্ডের মনগড়া মিথ্যা অভিযোগ ছিল অলীক বর্ণনা। মান্যবর যাকারিয়ার সাথে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ কিংবা স্পর্ধা বর্তমান লেখকের নেই।

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়