আরব দুনিয়ায় চলতি কথা, সবাইই কবি। আর প্যারিসে নির্বাসিত আরাবি গদ্য-কবিতার উদ্ভাবক সিরিয়ার কবি আদুনিসকে চেনে সবাই। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের প্রার্থী হিসেবে প্রায়ই যাঁর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে।
২০১১ সাল থেকেই সিরিয়ার যুদ্ধ-বিতর্কে বিতর্কিত নাম হয়ে আছেন তিনি। ২০১১ সালের গোড়ার দিকে সিরীয় আন্দোলন শুরু হলে আরব বুদ্ধিজীবীরা কবি হিসেবে তাঁর মর্যাদার কারণেই নয়, বরং সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের গোত্র আলাবাইতের সদস্য হওয়ায় তাঁর মন্তব্যের অপেক্ষায় ছিলেন। ওই বছর জুনে গণতন্ত্রে রূপায়ণের আহ্বান জানিয়ে আল-আসাদকে চিঠি লেখেন আদুনিস। কিন্তু আসাদ সরকার এরই মধ্যে ১ হাজার ৪০০ বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। এবং প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বেশ দেরি করায় অনেকেই আদুনিসের সমালোচনা করেন।
প্যান-আরব পত্রিকা আল-হায়াতে এক নিয়মিত গদ্য-কবিতার কলাম এবং সাম্প্রতিক বই ভায়োলেন্স অ্যাট ইসলাম-এ আরব বসন্তের ব্যর্থতা সম্পর্কে নিজের বিস্তারিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন আটাশি বছর বয়সী আদুনিস। নভেম্বরে ফ্রান্সে প্রকাশিত হয়েছে বইটি, একই মাসে আইএসআইএস হত্যাযজ্ঞে প্যারিসে ১৩০ জন নিহত হয়। চ্যাম্পস-এলিসির একটি কাফেতে আদুনিসের সঙ্গে মিলিত হই আমি, জনাথন গায়ার
প্রশ্ন: সিরিয়া যুদ্ধের সূচনায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এখন আপনি তাঁকে কী বলবেন?
আদুনিস: কিছুই বদলায়নি। বরং সমস্যাগুলো এখন আরো বড় হয়ে গেছে। এটি কীভাবে হয় যে, ৪০টি দেশ আইএসআইএসের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেও দুই বছরে কিছুই করতে পারল না? রিলিজিয়ন ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতা না ঘটা অবধি কিছুই পাল্টাবে না। আমরা যদি কোন জিনিসটা ধর্মীয় আর কোনটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আর সামাজিক— তার ভেতর পার্থক্য না করি, কিছুই বদলাবে না এবং আরবদের অবনতি আরো খারাপের দিকে যাবে। ধর্ম এখন আর সমস্যার কোনো সমাধান নয়। প্রতিটি মানুষ সে যা চায় তাই বিশ্বাস করে, আমাদের সেটিকে সম্মান দেখানো উচিত। কিন্তু ধর্মকে শুধু সমাজের ভিত্তি করে তোলা? না।
প্রশ্ন: শেষ কবে সিরিয়া সফর করেছেন?
আদুনিস: ২০১০ সালে।
প্রশ্ন: যুদ্ধের আগে। তখনকার পরিবেশ সম্পর্কে বলতে পারেন?
আদুনিস: জানি না, ঠিক আপনার মতোই খবর শুনি আমি। আমি জানি সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু কীসের জন্য? পরিকল্পনাটা কী? দেখুন, বিপ্লবীকে অবশ্যই দেশ রক্ষা করতে হবে। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে সে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করে। শুনেছি আলেপ্পোর বাজারগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সম্পদ আর কারো মতো ছিল না, কীভাবে ওসব ধ্বংস করে ওরা? বিপ্লবীরা জাদুঘরে লুটতরাজ চালায় না। বিপ্লবী খ্রিস্টান, আলাবাইত বা দ্রুজ হওয়ার কারণে কাউকে হত্যা করে না। বিপ্লবী ইয়াজিদিদের মতো একটা গোটা জাতিকে বিতাড়িত করে না। এটি কি বিপ্লব? পশ্চিম কেন একে সমর্থন দিচ্ছে?
প্রশ্ন: সিরিয়া বিরোধ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আরব বিশ্বে সমালোচনার সূচনা ঘটিয়েছে।
আদুনিস: আপনি জানেন বিপ্লবীদের বেতনভুক অনেক আরব আছে, যারা সবসময়ই আমার সমালোচনা করে থাকে। ওরা বলে, আমি বিপ্লবের সঙ্গে নেই— যে [বিপ্লব] জাদুঘর ধ্বংস করে।
প্রশ্ন: বিপ্লব কি জিনিস আর কে আছে এর সঙ্গে?
আদুনিস: বলা যাবে না এমন কিছু... একজন লেখক কখনই হত্যার পক্ষে থাকতে পারেন না। আপনি জানেন, এটি সম্ভবই নয়। কিন্তু কিছু কিছু লোক হত্যা আর সহিংসতা পছন্দ করে। একজন কবি বা চিত্রশিল্পী কীভাবে এক্সপ্লোসিভ বেল্ট পরে স্কুলে ঢুকে পড়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয়া একটা লোকের সঙ্গে একই পক্ষে থাকতে পারেন? কেমন করে? ওরা শিশু। কীভাবে, কীভাবে আপনি ওদের হত্যা করতে পারেন? এটি এক অকল্পনীয় নৃশংসতা। ভাই আমার, শাসকগোষ্ঠী স্বৈরাচারী হলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। শিশু আর স্কুলের বিরুদ্ধে লড়ো না। দেশ ধ্বংস করে দিয়ো না। নিরীহ মানুষকে হত্যা করো না। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করো। এটি অপমানকর। এই জগতের অংশ হওয়াটা অপমানকর। ইতিহাসে এই ধরনের আর কিছু দেখিনি, একটি দেশকে পুরোপুুরি শেষ করে দেয়া— ইয়েমেনের মতো— কেবল একটি নির্বোধকে প্রেসিডেন্ট পদে বসানোর জন্য...
আপনি দেখছেন লোকে একে সমর্থন দিচ্ছে। বুদ্ধিজীবীরা। কেমন করে ওদের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন আপনি? ওদের পক্ষে না থাকায় ওরা আপনার সমালোচনা করছে। ওদের মতো দানবে পরিণত হতে হবে আপনাকে।
প্রশ্ন: জিহাদিদের কথা বলছেন—
শুধু জিহাদি নয়, কারণ জিহাদিরা জাতিরই অংশ। এসব যারা চায় না, তাদের উচিত প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করা। এর বিরুদ্ধে আদৌ কি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা শুনেছেন? আমরা এখন যা বলছি, এখন কিছু লোক ঠিক সেই কথা বলছে। কিন্তু আপনি কি কোনো [আরব] দেশের, কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল বা কোনো বড় গোষ্ঠীর তরফ থেকে জিহাদি গ্রুপগুলো যা করছে, তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা শুনেছেন? এক ধরনের মেনে নেয়ার ব্যাপার আছে। কী ঘটছে তার বিরুদ্ধে, কোনো আরব দেশ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসেনি। এর মানে কী? ওরা মানুষ হত্যা করছে আর নারীদের বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। মানুষের সেরা সাফল্য জাদুঘর ধ্বংস করে দিচ্ছে, অথচ এর বিরুদ্ধে এতটুকু প্রতিবাদ নেই।
প্রশ্ন: আপনার নতুন বই ভায়োলেন্স অ্যাট ইসলাম কী?
আদুনিস: আপনি জানেন, আমাদের বিশ্বাসী হয়ে থাকতে হবে। কীভাবে? মানুষ, মানবজাতি শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীও শেষ হয়ে যাবে। যতক্ষণ ব্যক্তি আছে— এখন আমি যেটি বলছি, সেটি হলো— আমি একাই নই। মিসর আর অন্যান্য দেশে বহু মানুষ আছে, যারা আমার মতো একই কথা বলছে। এ কারণেই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে, মানুষ এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছবে, যেখানে আরো ভালো সমাধান খুঁজে পাবে সে। কিন্তু কবে আর কীভাবে— সময়ই তা স্থির করে দেবে। তবে এ কথা বলতে পারি, যত দিন আরবরা এই প্রাচীন জিহাদিপন্থী ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে কাজ করছে, তত দিন অগ্রসর হতে পারবে না। সেটি সম্ভব নয়। এর বিলোপ ঘটেছে, শেষ হয়ে গেছে। আইএসআইএস-ই শেষ আর্তনাদ। নিভে যাওয়ার আগে মোমবাতির মতো, দপ করে জ্বলে উঠে নিভে যায়।
রেনেসাঁর জন্য সময় লাগে। প্রথম ইসলামী রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত পনের শতাব্দীতে আমাদের সমাজ নাগরিকদের কোনো সমাজ গড়ে তুলতে পারেনি। এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ কিংবা এক মাস বা দুই মাসের ভেতর কেমন করে পনেরশ বছরের সমাধান করব আমরা? তবে আমি বিশ্বাস করি সময় আসবে, কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে।
প্রশ্ন: পরিবর্তনের জন্য কি পাশ্চাত্যের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের প্রয়োজন আছে? ভূমধ্যসাগরে আইফেল টাওয়ার ভাসা নিয়ে আপনার কবিতা ‘ডিজায়ার মুভিং থ্রু ম্যাপস অব ম্যাটার (১০৮৭) এবং আপনার লেখা আবু নাওয়াস ও ভিক্টর হুগোর কথোপকথন পড়েছি আমি। আরব ও পশ্চিমের সেতুবন্ধ—
আদুনিস: পুব আর পশ্চিম হলো অর্থনৈতিক ও সামরিক ধারণা এবং উপনিবেশবাদের সৃষ্টি। ভৌগোলিকভাবে আমরা বলতে পারি যে, পুব আর পশ্চিমের অস্তিত্ব আছে। অর্থনীতি আর উপনিবেশবাদ এর ফায়দা লুটেছে।
কিন্তু শিল্পকলার ক্ষেত্রে পুব-পশ্চিম বলে কিছু নেই। পল ক্লির ছবিতে তা দেখতে পান আপনি, কেমন করে তিউনিসিয়া ও পূর্ব আরবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি। দেখতে পান ইউজিন দেলাকোয়ার ছবিতে, কীভাবে মরক্কোর কারণে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তিনি। র্যাবো পড়ার সময় আপনি দেখেন যে, র্যাবোর সেরা দিক হলো তিনি পশ্চিমা ছিলেন না; যদিও জন্ম নিয়েছিলেন পশ্চিমেই, কিন্তু পুরোপুরি পশ্চিমের বিরুদ্ধে ছিলেন। আপনি আবু নাওয়াস বা আবু আল-মা’রারি পড়ার সময় ওদের প্রাচ্যীয় বা পাশ্চাত্যের বলেন না। কোন দেশ থেকে এসেছে বা সেগুলো কোথায় গেছে— নির্বিশেষে সৃজনশীল বিষয়গুলো একই জগতের। ভূগোল, ভাষা আর জাতীয়তাবাদের অতীত একসঙ্গে বাস করে সেগুলো এবং মানুষের সৃজনশীল জগতে অবস্থান করে। এই অর্থে পুব বা পশ্চিম বলে কিছু নেই। আমার কাছে হুইটম্যান স্রেফ আবু তাম্মামের মতো। তিনি আমার একটি অংশ আর আমি তার একটি অংশ।
প্রশ্ন: কিন্তু পাশ্চাত্য সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে আরব বিশ্বে, যার অভাব আছে বলে মনে করছেন।
আদুনিস: ইউরোপের প্রত্যক্ষ করা সমস্যাগুলো ধর্ম ও গির্জা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে আসা হয়েছে। মধ্যযুগে যাজকীয় বিচারালয়গুলো ঠিক আজকের দিনের জিহাদিদের আদালতের মতোই ছিল। ওরা মানুষ মেরেছে, আগুনে পুড়িয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্য রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে সফল হয়েছে এবং সৃষ্টি করেছে আধুনিক সমাজ। আমরা এখনো এই পর্যায়ে আছি। আর পাশ্চাত্য এই বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে সফল হতে পারলে আরবদেরও এ দুটিকে আলাদা করতে না পারার কোনো কারণ নেই। এই বিচ্ছিন্নতার জন্য সংগ্রাম করছি আমরা। সবকিছু আর পশ্চিমা রাজনীতিকদের ছাড়িয়ে আমরা সেটি করবই, কারণ পশ্চিমা রাজনীতিকরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব এবং আরব শাসকগোষ্ঠীদের ঘৃণা করে। ঘৃণা। [পাশ্চাত্য] নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে।
প্রশ্ন: তাহলে কীভাবে ধর্ম ও সরকারের ভেতর একটি কার্যকর বিচ্ছিন্নতা বা সমন্বয় অর্জন করা যাবে?
আদুনিস: ফের গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। এর জন্য দরকার সংগ্রাম। সংগ্রাম প্রয়োজন। বসে থেকে কিছুই করতে পারবেন না। আপনাকে রুখে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম চালাতে হবে, লড়াই করতে হবে। লিখুন, তার পর কারাবন্দি হোন। আরব কারাগারগুলো লেখকে বোঝাই নয় কেন, তা-ই ভাবি আমি। কারণটা বোঝার চেষ্টা করি। জীবনের গভীরতর, বাস্তব ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলছেন না তারা। বাস্তব বিষয় নিয়ে কথা বলছেন না। তাই রাষ্ট্র নয়, আমার সমালোচনা লেখকদের বিরুদ্ধে। লেখকদের সবসময়ই জেলে থাকা উচিত, তার মানে তারা সত্যি কথা বলছেন। কারাগারের বাইরে অবস্থান করার মানে তারা সত্যি কথা বলছেন না। যতক্ষণ তাদের বইগুলো বাজেয়াপ্ত হতে থাকবে... আমরা বলতে পারব যে সংস্কৃতির একটি ভূমিকা আছে।
প্রশ্ন: কিন্তু কবিতা কি সিরিয়াকে গ্রাস করে নিতে চলা ভয়ঙ্কর, বর্বরোচিত সহিংসতার সমাধান জোগাতে পারবে? অশভিেযর পর আদোর্নোর কবিতার স্বত্ব দাবির কথা মনে করিয়ে দেয়।
এটি কথার কথা। অশভিত্য ছিল সর্বনাশা বিপর্যয়, কিন্তু মানুষ বহু সর্বনাশা বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে গেছে। অন্যদিকে আমি বিশ্বাস করি, যে প্রশ্ন তুলে এবং যেখান থেকেই আসুক না কেন, অশুভর উৎসগুলোকে উন্মোচিত করেই লেখালেখির সূচনা ঘটে। আদোর্নোর কথায় তিনি আমাদের প্রশ্ন তোলা থেকে বিরত রেখে মেনে নিতে বাধ্য করেছেন। এটি ভুল। আমি তার সঙ্গে একমত নই। অশভিেযর পর এখন লেখা শুরু হচ্ছে।
প্রশ্ন: সিরীয় গৃহযুদ্ধের সময় কবিতা লেখা সম্পর্কে কী বলবেন?
আদুনিস: বোমাকে কবিতার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন না। এমনি তুলনা টানা উচিত নয়। যেকোনো মূর্খ বুলেট শাসক পাল্টে দিতে পারে, যেকোনো ঘৃণিত বুলেট কেনেডির মতো একজন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে। মৌলিক দিক থেকে ভ্রান্ত বলে আপনি এই ধরনের তুলনা করতে পারেন না। কবিতা তৈরি বাতাস তৈরির মতো, সৌরভ সৃষ্টির মতো, শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। বস্তুগত মান দিয়ে একে পরিমাপ করা যাবে না। এজন্যই কবিতা যুদ্ধকে ঘৃণা করে আর এর সঙ্গে কখনই সম্পর্কিত ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মরদেহ, আবর্জনা, ধ্বংসলীলা, ধ্বংসস্তূপ নিয়ে ভাবা সম্ভব। তার পর একটি কিছু লিখতে পারি আমরা, কিন্তু তার পরও এটি যুদ্ধের একটি উপাদান।
প্রশ্ন: আমাদের বলা হয়েছে যে, আইএসআইএস কবিতা লিখেছে, ওসামা বিন লাদেন কবিতা লিখেছিলেন।
আদুনিস: এটি কবিতা নয়। একে কবিতা বলে বিবেচনা করা উচিত নয়— অবশ্যই না। কারণ কবিতা একটি সামাজিক ঘটনা। সংস্কৃতি যেখানে দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সেখানে সবাই কবি আর সবাই ঔপন্যাসিক। এখন হাজার হাজার ঔপন্যাসিক আছেন। কিন্তু পাঁচজন ভালো লেখককে যদি খুঁজে বের করতে পারেন, তো আপনি ভালো অবস্থানে আছেন। আমেরিকায়... হাজার হাজার উপন্যাস আছে; পাঁচ কি ছয়টি ভালো জিনিস পাবেন, বাকি সব আবর্জনা। আরবদের বেলায়ও একই কথা খাটে। সব আরবই কবি, তাদের ৯৫ ভাগই আবর্জনা।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আরব সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অভিবাসন নিয়ে লিখেছেন আপনি। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে আমরা এখন অভিবাসন সংকট মোকাবেলা করছি। এ নিয়ে কিছু বলতে পারেন?
আদুনিস: অভিবাসনকে আমি দুটি কারণের ফল হিসেবে দেখি: হয় কাজের সুযোগ নেই কিংবা স্বাধীনতা নেই। ফলে নাগরিক বা মানুষ কাজ আর মুক্তির খোঁজ করে। আরব দেশগুলো দরিদ্র। দুই হাজার বছর ধরে আমরা একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি অথচ আমাদের বিপুল সম্পদ আছে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রের পেছনে আমরা তা খরচ করি, বিমান কিনি; আমরা এমনকি আমাদের হয়ে প্লেন চালিয়ে যুদ্ধ করার জন্য পাইলট পর্যন্ত কিনি, ইয়েমেনে সৌদি আরব যেমনটা করছে।
দুনিয়াটা কাদা। আমরা আদিম। আমরা আজ মধ্যযুগে রয়ে গেছি আর আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন আধুনিককালের। আমরা একটি গাড়ি তৈরি করতে পারি না। একটি কফি কাপ বানাতে পারি না, তাহলে আমরা কীভাবে আধুনিক হলাম? পাশ্চাত্য রাজনীতিকরা আমাদের বোকা বানাচ্ছে। আপনারা বুদ্ধিজীবী। আপনাদের আসল কথা জানা উচিত।
প্রশ্ন: আপনার সাম্প্রতিক লেখায় আরব পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন— ‘আমি কে— আমরা কারা?’ (আল-হায়াত, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৫)
আদুনিস: কেবল আরবদের পক্ষেই এটি কঠিন নয়। মোটা দাগে বলতে গেলে এটি মানুষের জন্যই কঠিন। কেননা ধর্ম উত্তর জুগিয়েছে: খ্রিস্টান হচ্ছে খ্রিস্টান; ইহুদি হচ্ছে ইহুদি; মুসলিম হলো মুসলিম। প্রত্যেক ‘অপর’ই নিরিখ আর সন্দেহের আওতায় আছে। আমি যা বিশ্বাস করি, সেও তাই বিশ্বাস করলে তাকে স্বীকার করছি; কিন্তু বিশ্বাস না করলে মেনে নিচ্ছি না। এ কারণেই অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্মে অন্যের ধারণা অসংজ্ঞায়িত। এভাবে ধর্মহীন মানুষের পক্ষে পরিচয়ের ধারণাটা জটিল।
এ বিষয়ে আরব সুফিদের পরামর্শ আছে। আপনি জানেন, র্যাবো বলেছেন, জে এস্ত উন অত্রে। আমি অন্য একজন। তারও হাজার বছর আগে আরব সুফি বলেছিলেন, ‘অন্যজনই আমি’। আপনি জানেন ইসলামে মুসলিমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পরিচয় লাভ করে, যেভাবে সে তার বাবার বাড়ি, জমিজমা আর টাকা-পয়সার অধিকার পেয়ে থাকে। আগেভাগেই তার ওপর পরিচয় আরোপ করা হয়। সুফি বলেছেন, না, পরিচয় একটি চলমান সৃষ্টি। মানুষ তার কাজ আর আদর্শকে রূপ দেয়ার ভেতর দিয়ে পরিচয়কে গড়ে তোলে। এবং পরিচয় সৃষ্টি হয়ে গেলে আলাদাভাবে ‘আমি’র অস্তিত্ব থাকে না। অন্যের সঙ্গে অস্তিত্ববান থাকে, আর অপর এরই একটি অংশ। আমাকে আমি হতে হলে অন্যের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। একইভাবে সুফিবাদে পরিচয় অন্তহীনভাবে উন্মুক্ত।
একজন ব্যক্তি যতক্ষণ বেঁচে আছে— তার পরিচয় অব্যাহতভাবে নবায়নযোগ্য। সে কবি হলে, মরে গেলেও তার পরিচয় শেষ হবে না; কারণ তার লেখা অবিরাম নবায়িত আর পর্যালোচিত হতে থাকে এবং ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়া হয়। ফলে তার পরিচয় উন্মুক্ত। আর মানুষের প্রকৃত ক্ষমতা উত্তর জোগানোর ভেতর নয়; প্রশ্ন তোলাই আসল শক্তি।
প্রশ্ন: সত্তর বছর আগে আপনি আলি আহমাদ সাইদ এসবার নাম বদলে আদুনিস, ইংরেজি উচ্চারণে অ্যাডোনিস নামটা বেছে নিয়েছিলেন।
আদুনিস: ধর্মের জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে নামটা আমি সৃষ্টি করেছি।
প্রশ্ন: কিন্তু এখন নামটা পরিণত হয়েছে—
আদুনিস: অপরাধে!
প্রশ্ন: কেন?
আদুনিস: আরব বা মুসলিম নাম নয় বলে সমালোচিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ধর্মীয় সংস্কৃতি সব সংস্কৃতিকে খাটো করেছে। অগভীর হয়ে গেছে।
প্রশ্ন: তাহলে আরব সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কি—
আদুনিস: আপনাকে তো বলেছি, যত দিন এখানে মৃত্যু আর ভালোবাসা আছে, শিল্পকলা টিকে থাকবে। উদ্বিগ্ন হবেন না। পাঠকের সংখ্যা কম, কিন্তু ঠিকই আছে। আধুনিক ভাবনার প্রবক্তা নিেশর জীবদ্দশায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়নি। সবসময় এটিই শিল্পকলার নিয়তি। অনেকের লেখাই প্রকাশিত হয় আর মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিকোয়, কিন্তু তাদের বইগুলো আবর্জনার অংশ।
রূূপান্তর: শওকত হোসেন






