ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নাকি আমাদের বই পড়ার অভ্যাস নষ্ট করে দিয়েছে! ফলে এই যুগে ‘বই’ নামক মাধ্যমটির যেকোনো প্রমোশনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে ভিলেনের দায়িত্ব পালন করে। বলা হয়, ফেসবুকের পাতলা বিনোদন থেকে বইয়ের ভারী ও সুদূরপ্রসারী জগতে ফিরে আসুন। সেটা কীভাবে?
প্রথমত. বইমেলা থেকে সদ্য কেনা বইয়ের সঙ্গে সেলফি-সহযোগে। সেই সেলফি উত্তোলিত হবে ফেসবুকে। মাত্র একখানা সেলফির বদৌলতে বইয়ের ক্রেতা বইয়ের পাঠকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবেন। আর সেই সেলফিতে লাইক দিয়ে অন্যরাও হবেন উপক্রেতা কিংবা উপপাঠক। বই কেনাটাও কি খুব নিরীহ প্রক্রিয়া? অধিকাংশ বইয়ের লেখক ফেসবুকে যে সামাজিক বেষ্টনীর মধ্যে থাকেন, তারাই তার ক্রেতা। বইয়ের মান বা বিষয়বস্তু এখানে গৌণ বিবেচনা। বরং সামাজিক বেষ্টনীর কোনো লেখকের বই কিনে সেটা সেলফি-যোগে ফেসবুকে রেজিস্টারভুক্তির মাধ্যমে তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগ প্রক্রিয়াটিকেই আরো বেগবান করেন। বই বা বইয়ের কাভার এখানে যোগাযোগের কাঁচামাল মাত্র। ফলে প্রকৃত প্রস্তাবে বইয়ের পঠিত হওয়া এই সামগ্রিক রিচুয়ালের বাইরের ঘটনা।
এবার ভেবে দেখুন, এ ফেব্রুয়ারির বইমেলায় আপনি কত কত বইয়ের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন! সমস্যা নেই, আপনার জ্ঞান যাচাই করার জন্য এ লেখা নয়। সেলফি রিচুয়ালই আপনাকে বইটির মারেফতি পাঠক বানিয়ে ফেলেছে। তবু যদি কোনো সিনিকের পাল্লায় পড়েন, যার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, তার জন্য আপনি কেনা বইগুলোর সঙ্গে টেক্সচুয়াল সেলফি তুলে রাখতে পারেন। টেক্সচুয়াল সেলফি হলো পুস্তক সমালোচনার একটি উত্তরাধুনিক ভার্সন। সেটা কীভাবে করবেন?
বদর বদর নামে শুরু করুন। প্রথমেই আপনার হাতে উঠে আসতে পারে গোলাম মুরশিদ রচিত ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল জীবনী’ নামক বইটি। সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠা। বাজারে নজরুল জীবনী বহু আছে, এটার দরকার পড়ল কেন? কারণ গোলাম মুরশিদ দাবি করছেন তার এই বই নজরুলের ‘পূর্ণাঙ্গ এবং অভ্রান্ত’ জীবনকথা। ফলে এ রকম একটি গবেষণা গ্রন্থ পড়ার প্রস্তুতি আপনি নিতেই পারেন। শুরুতে মাত্র দুই পৃষ্ঠার ভূমিকা আপনাকে অবশ্য আশাহত করতে পারে। লেখকের শক্ত দাবির প্রেক্ষিতে আপনি হয়তো মনে মনে একটা দীর্ঘ ভূমিকা আশা করছিলেন। যেখানে তিনি এই বই রচবার পূর্বাপর নিয়ে বলবেন, উপাত্ত সংগ্রহের রীতিনীতি নিয়ে বলবেন, ভাষ্য রচনার পদ্ধতি বিষয়ে বলবেন। সেটা না করে তিনি যখন মাত্র দুই পৃষ্ঠার কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপন সেরে ঝড়ের বেগে নজরুলের শৈশবে ঢুকে পড়েন, আপনার মনে হতেই পারে যে লেখক আপনাকে ইতিহাস-পাঠক নন, বরং বিনোদনপ্রত্যাশী উপন্যাস-পাঠক ঠাউরেছেন।
ফলে খানিক দম নিন; ঘুরে আসুন এই বইখানার পরিশিষ্ট থেকে। সেখানকার দুটি রচনা আপনাকে নিশ্চিত আকর্ষণ করবে। একটি গোলাম মুরশিদের নিজের লেখা— ‘প্রমীলার প্রতীক্ষা’ নামে। অত্যন্ত মনোহারী জিনিস। ইতিহাস হিসেবে। ইতিহাসের পরিবেশনা হিসাবে। এই গোলাম মুরশিদকে আপনি পছন্দ না করে পারবেন না। পরের লেখাটি একজন ডাক্তারের। শিরোনাম ‘নজরুলের কী রোগ হয়েছিল’। ডাক্তারি শাস্ত্রে ঐতিহাসিক রোগ নির্ণয় বলে কোনো পদ্ধতি আছে কিনা জানি না, তবে এখানে সেই ডাক্তার মহাশয় সেটিই করেছেন। তাতে নজরুলের ঐতিহাসিক ভাবমূর্তিটি সিফিলিসমুক্ত হতে পেরেছে!
এইক্ষণে গোলাম মুরশিদকে নিকট-ভবিষ্যতের জন্য সরিয়ে রেখে আপনি ‘সদরুদ্দীন’ খুলে বসুন। ফরহাদ মজহার রচিত কবিতার বই। বইটি আপনি কিনবেন, কারণ এর নামটি আপনার রুচিবোধের মধ্যে গড়ে ওঠা কবিতার পেলব নান্দনিকতার ধারণাটিকে বিলো দ্য বেল্ট মেরে বসেছে! ফরহাদ মজহার নিয়ে আপনার আগ্রহ তো আছেই। আপনি ক্রমে আবিষ্কার করতে থাকবেন যে, এবাদতনামার ফরহাদ মজহার ক্যামেরাগিরি পার হয়ে এই সদরুদ্দীনের আখ্যান রচনায় লিরিক কবিতার অন্তঃসার আর পয়ারের লিগ্যাসি থেকে কতখানি দূরে সরে গেছেন। তার একাকী ও নিঃসঙ্গ দিনপঞ্জি, কারণ তিনি জেনেছেন যে, পরস্পরের ভাষা বোঝে এমন কেউই আজ আর জীবিত নেই। এই বইতেও ফরহাদ মজহারের চিরচেনা কৌশল: ধর্মতত্ত্বকে রাষ্ট্রনীতির সমালোচনা আকারে পাঠ করা। হত্যা, খুন আর মৃত্যুর আখ্যান এই সদরুদ্দীন, কবিতা বটেই, কিন্তু ন্যূনতম কাব্যিক উছিলায়।
হে পাঠক-পর্যটক, এই বেলা আপনি খানিক প্রসন্ন হওয়ার কোশেশ করতে চাইতেই পারেন, যেহেতু আপনার হাতে আছে ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’। মাসুদ খানের নবতম কবিতা বই। যেহেতু আপনি সদরুদ্দীনের দার্শনিকতায় বিহ্বল হয়ে আছেন, প্রসন্ন দ্বীপদেশের ফ্ল্যাপের দাবি আপনাকে আকর্ষণ করবে। মাসুদ খানের কবিতায় দার্শনিক অনুভব আছে বটে, কিন্তু দার্শনিকতা তার মোকাম নয়। তার কবিতাকৌশল মিলসন্ধানী, উেপ্রক্ষা-প্রয়াসী এবং বহুদূর অব্দি আলঙ্কারিক। তিনি ধারাবাহিক এবং নিয়মিত। পর্যটক হিসেবে লাজুক। প্রসন্ন দ্বীপদেশ নিয়ে আপনি একটা অদ্ভুত উপসংহারে পৌঁছাতে পারেন। বলতে পারেন, এটি একটি আদ্যোপান্ত নস্টালজিয়া। দৈশিকভাবে নয়, কারণ এ বইয়ের কোনো কবিতারই বিষয়বস্তুর মধ্যে নস্টালজিয়া নেই। কিন্তু মর্মের মধ্যে আছে। এই নস্টালজিয়া মাসুদ খানের পুরনো কাব্যভূগোল এবং কাব্যপ্রকরণের নস্টালজিয়া। প্রসন্ন দ্বীপদেশ মিস করছে পাখিতীর্থদিনকে!
তার চেয়ে আপনি বরং উদযাপন করুন। কাজল শাহনেওয়াজের গল্প আর কবিতাসংগ্রহ নিয়ে। তার মতো উভচর লেখক স্বকালে বিরল। উভগামী লেখক বিস্তর পাওয়া যায়। তিনি আপনার বই কেনার বাজেটে একটা গুরুতর রকমের সংকট লাগিয়ে দিতে পারেন। কারণ আপনি কখনই পরিষ্কারভাবে ঠিক করতে পারবেন না যে, কা.শা.র গল্প না কবিতার সংগ্রহটি কিনবেন। আপনার অর্থসামর্থ্য সীমিত। কিন্তু শেষাবধি দুটো কিনেই আপনাকে বাড়ি ফিরতে হবে। তবে কা.শা.র সারল্যের ধারাক্রম আপনাকে চমকিত করবে। ফলে ভবিষ্যতের জন্য তাকে তুলে রাখবেন না, প্রতিদিন একটু একটু পড়ুন। এই উভচর লেখকের বৃহদায়তন দুই গ্রন্থের প্রকাশকে এভাবেই উদযাপন করুন।
এই ক্ষণে আবারো মননশীল গদ্যে ফিরতে ইচ্ছা করবে। সোহেল হাসান গালিবের ‘বাদ-মাগরিব: ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ’ আপনার হাতে উঠে আসুক। সাহিত্যের ভাষা প্রসঙ্গে বাংলাদেশে বর্তমানকালের বহুল আলোচিত প্রমিত-আঞ্চলিক ডাইকাটমির বাইরে তৃতীয় একটি পজিশনে দাঁড়ানোর কোশেশ করেছেন তিনি। ছোট ছোট গদ্যে, কিন্তু ফোকাসটি অনেকাংশে অক্ষুণ্ন রেখে। অনেকাংশে বললাম, কারণ কয়েকটি জায়গায় মনে হয়েছে যেন তিনি ভাষা-রাজনীতির বাইরেও জাল বিছিয়েছেন। যেমন ‘পাঠ করি সংশয়ে, সংকল্পে’ নামক লেখাটি। এ রকম আরো অল্প কয়েকটি। পাশাপাশি ফারুক ওয়াসিফের ‘জীবনানন্দের মায়াবাস্তব’ও ফোকাসড বই। ‘মায়াবাস্তব’ নামক একটি প্রত্যয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে জীবনানন্দ দাশকে দার্শনিকভাবে বোঝার একটা চেষ্টা আছে এ বইয়ে। ফারুকের মতে, মায়া ইলিউশন নয়, বরং লগ্নতা। ফলে জীবনানন্দ বিষণ্ন হলেও অবসন্ন নন। এই মায়া শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ নয়, বরং গ্রাম্যগীত, মেয়েলিগান, মঙ্গলকাব্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এ মায়ার নিশানা। প্রবন্ধের বই মানেই বাহারি বিষয়ে লেখা প্রবন্ধ সংকলন— এ চর্চা থেকে গালিব আর ফারুক আপনাকে স্বস্তি দেবেন।
ফাঁকে ফাঁকে পড়ুন কবিতা। দেখুন কত না আশ্চর্যজনকভাবে কামরুজ্জামান কামু রোহিঙ্গা হয়ে উঠলেন তার ‘আমি রোহিঙ্গা’ কাব্যগ্রন্থে। বিষয়কে বিষয়ীর শরীরে স্থাপন করা, এটা যেমন আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত, আবার রাজনৈতিকতারও। কামুর কবিতায় তা প্রত্যক্ষ করা আনন্দের বটেই। পাশে রাখুন স্থিতধী আর মিতবাক হিজল জোবায়েরকে তার বই ‘ধুলা পবনের দেশ’সমেত। আর ভুলে যাবেন না ঘর পালানো ছত্রখান পর্যটক তানিম কবিরকেও। ‘কেটে যাচ্ছে মালিহা জেরিন’ কোথাও কোথাও আপনাকে আপনার পূর্ব ধারণা থেকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করে দিতে সক্ষম।
তো এই টেক্সচুয়াল সেলফি পোস্ট করার আগেই কমেন্ট চলে এসেছে কিন্তু! কেউ একজন জানতে চাইছেন, ভাই, যে বইগুলোর কথা বললেন, এগুলো কি আপনার সচেতন নির্বাচন? এর পেছনে কি কোনো রাজনীতি আছে, সিন্ডিকেটবাজি আছে?
আপনি কী জবাব দেবেন জানি না। তবে আমি হলে জবাব দেব, না ভাই, সচেতন নির্বাচন নয়। নেহাত দৈবচয়ন।
ব্যস! যা বলার বলা হলো, কিন্তু কোনো রকম দায়দায়িত্ব নিতে হলো না!






