১৯২৯ সালে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত The Great Depression বা অর্থনৈতিক মহামন্দার ঢেউ ভারতবর্ষকেও নাড়া দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ব্রিটিশ শোষণতান্ত্রিক রাজশাসন ও ইংল্যান্ডে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের ফলে বাংলায় পশ্চিমা ধারার আধুনিকতার প্রবাহ কিছুটা চালু হলেও এখানকার অথনৈতিক ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৩-৪৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়, যা বাংলা ১৩৫০ সনে সংঘটিত হওয়ায় অনেকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামেও আখ্যায়িত করেন। অমর্ত্য সেনের মতে, মনুষ্যসৃষ্ট এ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোকে ভুগে করুণভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল।

১৯৪৩ সালে সংঘটিত এ মহা দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা ১৯৪২ সালে জাপান কর্তৃক মিয়ানমার দখল ও ভারতে আক্রমণের আশঙ্কা থেকে ইংরেজ জনগোষ্ঠী ও ব্রিটিশ সেনাদের খাদ্য জোগানের জন্য ৭০ হাজার টন খাবার মজুদ, ধানের খেতে ব্রাউন স্পট ডিজিজ নামক রোগের প্রভাবে আমন ধানের নিম্ন ফলনসহ একই বছরের অক্টোবরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ব্যাপক ফসলহানি, কলকাতায় জাপানের বিমান হামলা, মিয়ানমার থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ঢল, স্থানীয় ও ব্রিটিশ বণিকদের মজুদদারি, কালোবাজারিসহ নানা কারণের কথা উল্লেখ করলেও এ দুর্ভিক্ষে ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের দায় নিয়ে তেমন আলোচনা নেই বললেই চলে। আলোচ্য প্রবন্ধে বাংলার তৎকালীন নেতারা কেন ব্রিটিশ প্রশাসকদের গৃহীত পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং মানবসৃষ্ট এ মহা দুর্ভিক্ষে কেন গঠনমূলক অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। মূল আলোচনার আগে কেন বাঙালির প্রতিনিধিত্বশীল সরকার থাকার পরও বাংলা ১৯৪৩-৪৪ সালের মহা দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে এর কারণ খুঁজতে হলে তৎকালীন রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়ে।

আমরা লক্ষ করি, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ সংঘটিত হলে ব্রিটিশ বাংলার জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক চেতনাও ব্যাপকতর হতে থাকে। কেননা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণী বাংলা বিভক্তিকে স্বাগত জানায়নি এবং এটিকে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যা দিলে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে ভাটা পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে স্বদেশী আন্দোলন, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বাংলার হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে প্রায়ই ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা পরিলক্ষিত হতে থাকে, যা তৎকালীন ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কার্যপরিক্রমায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এরই ধারায় কংগ্রেস সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মন্ত্রী খাজা হাবীবুল্লাহ প্রমুখের সঙ্গে রাজনৈতিক হিস্যা ও অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করলেও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি। ড. জনম মুখার্জির মতে, Alliances across the sub-continent remained complex and fluid and Bengal politics were as always, especially complex and fragmented.১

এমতাবস্থায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের ‘মুসলিম ঐক্যে’র পরিবর্তে বাংলার সাধারণ মানুষের মুখে দু-মুঠো খাদ্য তুলে দেয়ার জন্য ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন এবং এ লক্ষ্য পূরণে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠন করলে খুব দ্রুত দলটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।২ এমতাবস্থায় ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠেয় প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত কৃষক প্রজা পাটির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৬ সালে ‘ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি’ নামক একটি রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটলে ফজলুল হক এ দলের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তৎকালীন লাট সাহেবের (স্যার জন অ্যান্ডারসন) কাছে এর বিহিত চেয়ে একটি খোলা চিঠি লেখেন।৩ যুক্ত নির্বাচন না হলেও ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে হিন্দু-মুসলিম নেতাদের মধ্যে আরো দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

05

চিত্তপ্রসাদের তুলিতে দুর্ভিক্ষ

১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের সঙ্গে ফজলুল হকের একটি অলিখিত যুক্ততা হলেও পরে ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করেন এবং প্রাদেশিক পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ না করায় যুক্ত সরকার গঠন করেন এবং তিনি এ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে (১৯৩৭-১৯৪১ খ্রি.) দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।৪ কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় যোগদান করেনি। ১১ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ছয়জন ছিলেন মুসলমান। এর মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টির ছিলেন মাত্র দুজন। এ নিয়ে কৃষক প্রজা পার্টিতে প্রথমে অসন্তোষ এবং পরে প্রকাশ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত কৃষক প্রজা পার্টির সংসদীয় শাখা এবং মূল সংগঠন দুটোই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে সম্মিলিত মন্ত্রিসভাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় মন্ত্রিসভার স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম লীগে যোগ দেন। তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি এবং সোহরাওয়ার্দী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সরকার গঠনের পর থেকে মুসলিম প্রতিনিধিত্বশীল এ সরকার হিন্দু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি কর্তৃক প্রায়ই বাধার সম্মুখীন হতে থাকেন এবং ক্রমেই হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে তিক্ততা বাড়তে থাকে; ন্যাশনাল কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভার মতো প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলোর প্রতিরোধও বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ফজলুল হক কংগ্রেসের সভাপতি নেহরুকে মুসলিমদের প্রতি সংঘটিত অনাচার সম্পর্কে ১৯৩৯ সালের ৩০ অক্টোবর পত্র লেখেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানালে নেহরু এতে সম্মতি দিলেও পরে নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এ আলোচনা আর এগোয়নি।৫

10

দুর্ভিক্ষের সময় উইলোবি ওয়ালেস হুপারের তোলা ফটো ছবি: দ্য ওয়্যার

এ পরিস্থিতিতে ক্রিপস মিশন বাংলায় আগমনপূর্বক মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহরু, মাওলানা আজাদ, জিন্নাহ ও ফজলুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের ভবিষ্যৎ বিষয়ে আলোচনা করে ১৯৩৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর রেঙ্গুন গমন করলে বাংলার রাজনীতি আরো সরব হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিল’-এর সদস্য হওয়াকে কেন্দ্র করে হক-জিন্নাহর মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাপক তিক্ত হয় এবং সোহরাওয়ার্দী ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে ১৯৪১ সালের ১ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলে হক সরকারের পতন হয়। এরপর ফজলুল হক তার অনুসারীদের নিয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, ইনডিপেনডেন্ট তফসিলি হিন্দু এবং কৃষক প্রজা পার্টির সমন্বয়ে ‘প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি’ নামে একটি নতুন সম্মিলিত দল গঠন করেন। এ দলের উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান ও বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং এ লক্ষ্যে তিনি আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন নিয়ে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে ১১ সদস্যের একটি পূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভায় ছয়জন মুসলমান এবং পাঁচজন হিন্দু সদস্য ছিলেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা দমন করতে না পারা, আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যক্রম ও ব্যাপক খাদ্য সংকটকে কেন্দ্র করে এ সরকারের পতন ঘটে।

দ্বিতীয়বার গঠিত এ সরকারের পতন ঘটায় বাংলার গভর্নর হার্বার্ট মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা খাজা নাজিমউদ্দীনকে সরকার গঠনের আহ্বান জানালে খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে ২৪ এপ্রিল ১৯৪৩ সালে সাতজন মুসলিম ও ছয়জন হিন্দু সদস্য নিয়ে একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক তলানিতে চলে যাওয়ায় বাজেটে গৃহীত ভোটে ১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চ এ সরকারেরও পতন ঘটে।

এসব রাজনৈতিক ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ১৯৪৩ সালে বাংলায় সংঘটিত মহা দুর্ভিক্ষের জন্য শুধু ব্রিটিশ সরকারের নীতি ও গৃহীত পদক্ষেপই দায়ী ছিল না। এ দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করতে না পারার পেছনে বাংলার নেতাদের দায়কে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ড. কুঞ্জরু স্টেট কাউন্সিলের সভায় এক বিতর্কে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, তারা (রাজনৈতিক নেতা) প্রদেশগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকায় এবং সাধারণ জনগণের কল্যাণ নিয়ে কম কাজ করায় আসন্ন এ মহা দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছেন।৬

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের ৭৩ ভাগ মানুষ ছিল কৃষিজীবী৭ এবং বাংলার ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৯০ শতাংশ।৮ উপকূলীয় জেলাগুলোয় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নকল্পে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কৃষি বীজের জোগান, সার ও কীটনাশক প্রদানে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু সহায়তা প্রদান দরকার ছিল তা করা হয়নি। ফলে এ দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল, যার দায় থেকে বাংলার তৎকালীন নেতারা মুক্তি পেতে পারেন না। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্বযুদ্ধে হু হু করে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। ফলে আগে যেখানে এক মণ চাল ৬-৭ টাকায় পাওয়া যেত, তা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে এবং ১৯৪৩ সালে এসে এক মণ চালের দাম ৩০ টাকায় উপনীত হয়। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকা, ব্যাপক মূল্যস্ফীতি, কালোবাজারি ও মজুদদারি বৃদ্ধির মতো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা এবং সর্বোপরি প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় বাংলা সরকারের পক্ষে এ মহা দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি।৯ এমতাবস্থায় সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাপক মুদ্রা ছাপা হলে দেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়।

১৯৪৩ সালের ২৭ নভেম্বর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ড. এল সি জৈনের ‘Economic India’ মতটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, ভারতীয়দের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৫ ইউরোর (পক্ষান্তরে একজন ব্রিটিশের মাথাপিছু আয় ছিল ৭৫ ইউরো) কম হলেও ভারতীয়দের জন্মহার তিন গুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ায় এ উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠীর খাবারের জোগানদানের কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।১০ বাংলার তৎকালীন নেতারা ব্যাপক এ জন্মহার প্রশমনে এমনকি তাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণ কামনায় আগে থেকে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় উদ্ভূত এ দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা সম্ভব হয়নি।’ The Statesman পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক মি. আর্থার মুর অবশ্য বাংলার সব শ্রেণীর মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের অভাব, দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধারকাজ না হওয়া এবং উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম যথাসময়ে শুরু না হওয়ার বিষয়টিকে সামনে এনে তৎকালীন ব্রিটিশ নীতি ও বাংলা সরকারের সমালোচনা করেছেন।১১

দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পর হিন্দু মহাসভা, ন্যাশনাল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, ফরওয়ার্ড ব্লকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ভারতবর্ষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলেও শাসনতান্ত্রিক অবস্থান ও নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল ও নেতারা সদাজাগ্রত থাকায় বিশ্বযুদ্ধকালে ধেয়ে আসা এ মহামারী সম্পর্কে তাদের মধ্যে এক ধরনের নির্জীবতা লক্ষ করা যায়। ফলে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, খাজা হাবীবুল্লাহ, খাজা নাজিমউদ্দীন, শরৎ বসুদের মতো নেতারা রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলার ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ করলেও সমকালীন আর্থসামাজিক অবস্থানকে দূরবর্তী চোখে দেখতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৪৩-৪৪ সালে বাংলা এক মহা দুর্ভিক্ষকে বরণ করতে বাধ্য হয়েছিল। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে এ ক্ষত কিছুটা হলেও এড়ানো যেত।

গ্রন্থসূত্র:

১. Janam Mukherjee, Hungry Bengal: War, Famine, Riots, and the End of Empire 1939-1946, A Dissertation submitted in partial Fulfillment of the requirement for the degree of Doctor of philosophy in the University of MIichigan, 2011, P.71

২. Janam Mukherjee, Revisiting the Bengal Famine of 1943, The Daily Star, Jan 17, 2022

৩. এস এম আজিজুল হক শাজাহান, শতাব্দীর কণ্ঠস্বর আবদুল কাশেম ফজলুল হক, ঢাকা, ১৩৮৭ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৮৯-৯৪

৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২১-১২২৪

৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৭-২৮৬

৬. Prof. T. K. Dutt, Hungry Bengal, Indian Printing Works, Lahore, 1944, P. 149

৭. Ibid, P.148

৮. Janam Mukherjee, Po. Cit., P. 76

৯. Prof. T. K. Dutt, Op. cit, P. 150-151, Joanna Simonov, Understanding Humanitarian action in South asia: The Bengal Famine of 1943, 2015, P. 14

১০. Prof. T. K. Dutt, Op. cit., pp. 150-151

১১. Prof. T. K. Dutt, Op. cit., P. 152

ড. এ. টি. এম. সামছুজ্জোহা: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়