চার বছর হলো আমরা একটা অতিমারী পার করে এসেছি। কভিড-১৯ পুরো বিশ্বেই তার থাবা বিস্তার করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এর জন্য গুনেছে চরম মূল্য। তবে কভিডের প্রতিক্রিয়া এখনো বুঝে ওঠেনি বিশ্ব। নানা রকম প্রাক্কলন আর গবেষণার আড়ালে পড়ে গেছে প্রাত্যহিক জীবনের বদলে যাওয়া। বাস্তবিক, মহামারী/অতিমারী সবসময়ই প্রাত্যহিক জীবনকে বদলে দেয়। সমস্যা হলো ২০২০ সালের অতিমারী নিয়ে মানুষের চিন্তা ছিল মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষকেন্দ্রিক। কেননা বরাবরই মহামারী ও অতিমারী নিয়ে আসে এ দুটি বিষয়। মোগল আমলও দেখেছে তা-ই। একাধিক মহামারী ও দুর্ভিক্ষ ওই সময় মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। সে কারণে শাসন থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনেও পড়েছিল প্রভাব।
লোদি বংশের শাসককে পরাজিত করে ভারতে শুরু হয়েছিল মোগল শাসন। দিল্লি থেকেই সূচনা। বাবরের হাত ধরে। বাবর তার রোজনামচায় সেকালের রোগশোক, মহামারীর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রথমেই বলেছেন ম্যালেরিয়ার কথা। বাবর যখন দিল্লিতে মোগল শাসনের সূচনা করেন এবং এরপর রাজ্য বাড়াতে থাকেন সে সময় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল বেশি। অনেক সময়ই মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে চাইত না। কাছাকাছি সময়ে সিন্ধে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। মূলত ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে এ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিল। এদিকে ১৫৭৪-৭৫ সালে গুজরাটেও প্লেগ দেখা দেয়। মূলত সে সময় বিশ্বজুড়ে প্লেগের আধিপত্য ছিল বেশি। আকবর ও জাহাঙ্গীরের শাসনামলেও দেখা দেয় প্লেগ।
মহামারী ছড়িয়ে পড়া ও তার কারণে ঘটা অন্যান্য নাগরিক সংকট সাধারণত মূলধারার ইতিহাস এড়িয়ে যায়। যেমন আকবরের শাসনামলের শেষ দিকে যখন প্লেগ দেখা দিচ্ছে তখন তিনি কাশ্মীর অভিযানের কথা চিন্তা করছেন। মূলধারার ইতিহাসে আছে তার কাশ্মীর অভিযানের পরিকল্পনা। কিন্তু প্লেগ নিয়ে তেমন কিছু নেই। ফাদার মনসারেত (আন্তোনিও মনসারেত) অবশ্য এ নিয়ে লিখেছেন। তিনি জানান, এ সময় লোকজন রীতিমতো তাদের বসত তুলে পালাচ্ছিল। কিন্তু কে কোথায় পালাবে তার কোনো ঠিক ছিল না। পুরো বিষয়টি তখন বিশৃঙ্খল হয়েছিল। বাদশাহ আকবর এসব নিয়ে ভাবেননি ব্যাপারটা এমনও নয়। তিনি তার বাদশাহির মানুষকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অতিমারী তাকে পুরোপুরি সফল হতে দেয়নি। আকবরের আমলে প্লেগে বহু মানুষ মারা যায়।
বাদশাহ জাহাঙ্গীর নিজেই লিখেছেন তার আমলে প্লেগের প্রাদুর্ভাবের কথা। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে এ মাহামারী চলেছিল প্রায় চার বছর। মূলত ১৬১৬ সালের শীতে শুরু হয় এবং গ্রীষ্মে প্রাদুর্ভাব কমেছিল। কিন্তু তারপর নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসে প্লেগ। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে একদিনে এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এ প্লেগে। বাদশাহ জাহাঙ্গীর তার আত্মজীবনীতে জানান, এ বছরই পাঞ্জাবে মারাত্মক প্লেগ দেখা দেয়। মোগল শাসন ব্যবস্থা এ মহামারী সামলাতে গলদ্ঘর্ম হয়। মূলত সে সময় যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। এ সময়ের মতো পাওয়া যেত না প্রতিষেধক। তাছাড়া মহামারী ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল মানুষের অসতর্কতা ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
মোগল আমলের হেমিকদের (সে সময়কার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ) মতে, খরা ও বাতাসে জীবাণুর ছড়িয়ে পড়াই ছিল মহামারীর কারণ। তবে এ নিয়ে আরো স্পষ্ট মতামত আশা করা যায়, কিন্তু ওই সময়ে মহামারী বা রোগকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে না দেখার কারণে বিষয়গুলো আলোচিত হতো না।
মোগল শাসনের সমসাময়িক ইতিহাস লেখক (ক্রনিকলারও বলা যায়) মোহম্মদ আরিফ কান্দাহারি আকবরের আমলে হওয়া মহামারী বিষয়ে কিছু আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, ‘কেবল দূষিত পানি ও বাতাসে জীবাণু ছড়ানোর কারণেই প্লেগ ছড়ায়নি। এর পেছনে ছিল আফগানি ও মীর্জাদের শাসনের ব্যর্থতা। তাদের শাসনের বিশৃঙ্খলার কারণেই এ মহামারী প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি। তাদের অপশাসনের কারণে মাহামারী পাঞ্জাব থেকে গুজরাটের দিকে ছড়িয়ে যায়।’ অর্থাৎ, কেন্দ্র যা-ই করুক না কেন, স্থানীয় শাসকরা মাহামারী নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দেননি।
আরিফ কান্দাহারি তার ‘তারিখ-ই-আকবরি’তে বলেন, ‘অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আহমেদাবাদ, ভরোচ, পাটনা ও বরোদা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ গাড়ি ভরে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হতো সৎকারের জন্য।’
মহামারী কেবল মধ্য বা দক্ষিণ ভারতেই আক্রমণ করেনি, ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব ভারতেও। ১৫৭৫ সালের দিকে আকবর অভিযান করেন ভারতে। দাউদ কররাণীর বিরুদ্ধে অভিযানের সেনাপতি ছিলেন মুনিম খান। কান্দাহারি জানান, এ সময় বাংলায়ও প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং সেখানকার আবহাওয়া অস্বাস্থ্যকর হওয়ার কারণে মাহামারী ছড়িয়ে পড়ে এবং মোগল বাহিনীর অনেকে রাজমহল ও ওড়িশায় মারা যায়।
মোগল আমলের ক্রনিকলার বা কার্যবিবরণী লেখকরা এভাবেই বিষয়টি দেখেছেন, কিন্তু বাস্তবে কেবল অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়াই মহামারীর কারণ ছিল না। বাংলায় ম্যালেরিয়া অনেক আগে থেকেই মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এর কারণ ছিল বাংলার প্রকৃতি। মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা করেনি প্রশাসন। করার সুযোগও ছিল না। এ অবস্থা থেকে সেকালের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের মান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ম্যালেরিয়া এখন প্রায় সাধারণ একটা সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সে সময় সাধারণ মানুষের ছিল না এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান, ছিল না প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ফলে তারা কেবল মারাই পড়ত। মোগল শাসনও এ নিয়ে খুব যে মাথা ঘামিয়েছে এমন মনে হয় না। তারা যুদ্ধ, রাজ্যবিস্তার ও বড় বড় ইমারত নির্মাণেই মন দিয়েছে।
ইমারত নির্মাণ থেকে আরেকটি বিষয়ে আসা যাক—তাজমহল। বাদশাহ শাহজাহানের তৈরি করা তাজমহল এখন পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্যের একটি হওয়ার মর্যাদা পায়, কিন্তু এ ইমারত নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি ডেকে এনেছিলেন দুর্ভিক্ষ। ১৬৩০-৩২ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হয়। এর অন্যতম কারণ ছিল খরা ও ফসলহানি। পরপর তিন ফসল মার খেয়েছিল সেখানে। ফলে দুর্ভিক্ষ ছিল অপ্রতিরোধ্য। এর মধ্যে দেখা দেয় প্লেগ। কিন্তু শাহজাহানের ব্যর্থতা ছিল তিনি ইমারত গড়ায় এতই মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং খরচ করেছিলেন যে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার মতো অর্থ তার তহবিলে ছিল না। একই কারণে মালওয়ার মোগল সুবাদার শাহজাহানের বিরোধী হয়ে ওঠেন এবং দাক্ষিণাত্যের নিজাম শাহ ও আদিল শাহর পক্ষাবলম্বন করেন।
দাক্ষিণাত্যের দুর্ভিক্ষ নিয়ে পর্যটক পিটার মান্ডি লিখেছেন, ‘১৬৩০ সালের খরা থেকে গুজরাটের দুর্ভিক্ষের শুরু। পরের বছর ফসলে ইঁদুর ও পঙ্গপালের আক্রমণে ফসলহানি হয়েছিল। তার পরের বছর আবার অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছিল ফসল।’
পিটারের বর্ণনা থেকে মানুষের জীবনমান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘দুর্ভিক্ষ ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে থাকে এ অঞ্চলের মানুষ। ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়। অনেকেই কম প্রাদুর্ভাবের এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পথে মারা যায়। পথে পড়ে ছিল মরদেহ এবং তা অন্যদের চলাচলে বিঘ্ন তৈরি করে।’ অর্থাৎ এত মানুষ মারা গিয়েছিল যে পথই এক হিসেবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলেই মনে হয়।
পারস্য ও ইউরোপীয় বহু সূত্র এ কথা সমর্থন করে। সেসব থেকে জানা যায়, প্রচুর মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাওয়ার পাশাপাশি উদরাময় ও অন্যান্য অসুখে মারা যায়। অনেকে পশুর জন্য রাখা খাবার খেয়ে ফেলেছিল। তবু বাঁচতে পারেনি। মৃত মানুষ শুকিয়ে তার হাড়গোড় পড়ে ছিল বাড়ির দাওয়া এমনকি পথের মধ্যে।
এ অবস্থার পেছনে আরো প্রভাব ফেলে শাহজাহানের সেনাদল। বুরহানপুরে অবস্থিত এ সেনাদলের জন্য নিয়মিত রসদ পাঠানো হচ্ছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের আগে প্রতি মণ গমের মূল্য ১ মাহমুদি থাকলেও ১৬৩১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ মাহমুদিতে।
তবে বাদশাহির তরফ থেকে লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। যেমন খুলেছিলেন আকবর ও জাহাঙ্গীর তাদের আমলে। কিন্তু তা কেবল কিছু মানুষকে পেটে-ভাতে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া তেমন কোনো কাজে আসেনি। বস্তুত দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে মানুষের জীবনের কোনো মানই থাকে না।
তথ্যসূত্র
১. জেসুইট পাদ্রির আকবরনামা
২. তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী
৩. তারিখ-ই-আকবরী: মোহম্মদ আরিফ কান্দাহারি
৪. Malik, Muqaddisa; Ahmed, Fouzia Farooq (2020); Famines and Epidemics in Medieval India: Climatic Change or a Policy Failure?
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক









