ভূমিহার জাতের শূদ্রাণী মন্থরাকে কেকয়ের প্রাসাদে যখন কিনে আনা হয়েছিল, তখন সে পঞ্চদশী। সে সময় কুঁজ ছিল না তার। ছিপছিপে, চঞ্চল প্রজাতির মতো প্রায় উড়ে বেড়ানোর গতিতে হাঁটত সে। শূদ্রাণী হলেও সে মিশ্র ত্বকের কিশোরী। এক ক্ষত্রিয় রাজপুরুষ একবার ঘোড়া ছুটিয়ে মন্থরার বাবার ক্ষেতের সামনে দিয়ে যাবার সময় চারাগাছ নিড়াতে ব্যস্ত মন্থরার মায়ের ঘামে ভেজা কোমর আর পিঠের কালো তবে নির্মেদ বাঁক আর আজানুলম্বিত কালো কেশদাম দেখে মোহিত হয়ে পড়েন। এর পর মাঝে মাঝেই হাতে কয়েকটি স্বর্ণ মুদ্রা বা কখনো রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে মন্থরাদের কুটিরে সেই রাজপুরুষ যাওয়া-আসা শুরু করেন। কেকয়ের বালক রাজপুত্র অশ্বপতির তিনি ছিলেন আপন মাতুল। ধবধবে সাদা সে রাজপুরুষের গায়ের রঙ। কোনো রাজপুরুষ ঘরে এলে ভূমিহার দাসের সাধ্য কি প্রত্যাখ্যান করে? কাজেই স্ত্রীকে রাজপুরুষের জিম্মায় রেখে ঘরের বাইরে বের হয়ে যেত সে।

এভাবেই মন্থরার জন্ম। ঘরে অন্য ভাইবোনদের থেকে সে দেখতে আলাদা। তার না সাদা, না কালো; খানিকটা পীতাভ গোছের রঙ, না কালো, না সবুজ। তবে বাদামি চোখের মণি আর খানিকটা খাড়া নাকে পাড়ার অন্য শিশুদের চেয়ে তাকে চট করেই আলাদাভাবে চোখে পড়ে। মন্থরার জন্ম হতে হতেই অবশ্য সেই রাজপুরুষ দূত হিসেবে চলে গেছেন দূর পারস্যে। শোনা যায় সেখানে এক পারস্যদেশীয় কন্যাকে বিয়ে করে তিনি সংসার পাতেন। মন্থরার পর মন্থরার যতগুলো ভাইবোন হয়, তারা সবাই তাদের বাবা-মায়ের মতোই দেখতে। বাবা নামের ঘরের সে অদ্ভুত মানুষটা মন্থরাকে তাই কখনই ভালোবাসেনি। কথায় কথায় ‘জারজ বাচ্চাটাকে নিয়ে আমার সামনে থেকে দূর হ!’ বলে বউকে পেটানো আর মাতাল হয়ে কান্নাকাটি করা ছিল তার একটি রোগ। বাবা নামে সেই মানুষটির মুখে শুনে হোক বা যেকোনো কারণেই হোক, অন্য ভাইবোনরা একটু বড় হতেই বা পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েরাও কিছুতে একটু বিরক্ত হলেই মন্থরাকে ‘জারজ-জারজ!’ বলে হাততালি দিয়ে খেপাত। একটু একটু করে বড় হতে হতে মন্থরা শব্দটির অর্থ বুঝতে পারে। আরো বুঝতে পারে, তার বিয়ে হওয়া পাড়ার অন্য মেয়েদের মতো অত সহজ নয়! সে মিশ্র রক্তের শিশু। না তাকে বিয়ে করবে কালো মহিষের মতো তাগড়াই কোনো ভূমিহার যুবা, না তাকে বিয়ে করবে কোনো উজ্জ্বল ত্বকের ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় কি বৈশ্য রাজপুরুষ। পল্লীর কোনো কোনো যুবক যে তার অনুরাগী নয় তেমন না, তবে মন্থরা তাদের সাথেও নিজেকে মেলাতে পারে না!

‘কে আমি? আমি কে?’ আয়নার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝেই ভাবে মন্থরা। তবে এমনটা ভাবতে ভাবতে মন্থরা দেখে, তাদের ভূমিহার পল্লীতে তার মতো খানিকটা হলদে বা খানিকটা বাদামি রঙের আরো কিছু ছেলেমেয়ে জন্মাচ্ছে। না তারা কাকিমা বা বৌদিদের কুটিরের সামনে ঘোড়া বা রথ চালিয়ে আসা শ্বেতকায় রাজপুরুষদের মতো অতিশয় শুভ্র, না এই পল্লীর অধিকাংশ নর-নারীর মতো অতিশয় কালো। এটা যে সময়ের কথা, তখনো শ্বেতকায় বহিরাগতদের সাথে কেকয়, কোশল, আয়োধা বা অযোধ্যা, মিথিলা, মগধসহ ভারতের সর্বত্র কালো আদিবাসীদের সাথে অত বেশি মিশ্রণ হয়নি। পাশের বাসার এক কাকির ঘরে এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় মন্থরার মতোই আরেক হলদে রঙের শিশু যেদিন জন্ম নিল আর মন্থরা দেখতে গেল তাকে, তার মা আঁতুড় ঘরের সামনে থেকে মেয়েকে ডেকে নিয়ে এল।

‘মা মন্থরা, তোমাকে একটা কথা বলি?’

‘কী কথা মা?’

‘তুমি তো জানো মা, আমরা ভূমিহার গোত্রের মানুষ। রাজপুরুষরা আমাদের কুটিরে এলে আমাদের সাধ্য নেই তাদের মানা করি। এমন এক রাজপুরুষ বহু আগে আমার বিয়ের পর পরই আমাদের এই কুঁড়েঘরে এসেছিলেন। সত্যি বলতে তুমি তারই সন্তান। শুনেছি তিনি এখন দূরদেশে প্রবাসী। বাবা বলে যাকে জানো, স্বাভাবিকভাবেই তিনি তোমাকে পছন্দ করেন না। তোমার ভাইবোনরা কি পাড়ায় সমবয়সীরা প্রায়ই তোমাকে খোঁটা দেয়। তোমার বিয়ে হওয়াও শক্ত। কারণ তোমার বর্ণের কোনো শুদ্ধতা নেই। তুমি না আর্য, না অনার্য!’

এটুকু বলতে বলতে মন্থরার কালো মা মুখে কাপড় গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কান্না খানিকটা শমিত হলে ভাঙা গলায় বলে, ‘আগামীকাল কেকয় রাজগৃহ থেকে এক অমাত্য আসবেন। আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম থেকে যে ১০০ তরুণী দাসী পছন্দ করা হয়েছে, তুমি তাদের একজন।

আমরা বেশকিছু সুবর্ণ মুদ্রা পাব। তোমার বাবার যে জমিটা মাঝখানে বন্ধক হয়েছিল, তা ছাড়াতে পারব আমরা নিজেদের চাষের জন্য। আর- আর- পারলে আমাদের সবাইকে তুমি ক্ষমা করে দিও!’

মা এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখন বয়স কম ছিল। কাজেই জন্মাবধি ঘৃণা আর বিদ্রূপের যে জীবনটা সে বয়ে বেড়াচ্ছিল, তা থেকে হয়তো মুক্তি মিলবে ভেবে বরং মনে মনে খুশিই হয়ে ওঠে মন্থরা। শুধু মায়ের জন্য খানিকটা খারাপ লাগে তার। খারাপ লাগে এত দিনের চিরচেনা গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে ভেবে। আবার রাজপ্রাসাদ দেখতে পাবে ভেবে উত্তেজনাও বোধ করে। দুঃখ আর মুক্তি বোধের এক মিশ্র অনুভূতিতে মাকে জড়িয়ে ধরে সে-ও। সে রাতে বাবা নামের মানুষটা কোনো কঠোর কথা বলে না। কেমন অপরাধী মুখ করে বসে থাকে! অন্য ভাইবোনরাও চুপ হয়ে থাকে।

তাদের সবার চেয়ে দেখতে আলাদা দিদি আজ চলে যাবে। যাকে তারা ‘জারজ’ বলত শব্দটির অর্থ না বুঝেই।

‘উফ! কুঁজো বুড়িটাকে দেখে দিন শুরু হলো। দিনটাই খারাপ যাবে!’

রাজা দশরথের প্রথমা কৌশল্যার খাস দাসী মন্থরাকে দেখেই মুখ বাঁকালো। জ্বলে উঠতে গিয়েও চুপ করে যায় মন্থরা। ধীর পায়ে এঁকেবেঁকে নিজের ছোট কামরায় ঢুকে পুঁটুলি থেকে আয়না বের করে তার দিকে তাকায় মন্থরা। কত বয়স হলো তোমার মন্থরা? চোখ ঘোলা হয়ে গেছে। মুখে বলিরেখা।

চুলগুলো সাদা। আর এই কুঁজ। হা ভগবান! কুঁজ তো তার জন্মগত নয়। দশরথের নয়নের মণি ওই রাম একদিন বালক বয়সে বল হাতে খেলতে খেলতে যখন ছুটছিল প্রাসাদের গবাক্ষপথে, বালকের খেলার চঞ্চলতার আনন্দ মন্থরাকেও স্পর্শ করেছিল! দুষ্টুমি করে রামের হাত থেকে গড়িয়ে পড়া বল মন্থরা কুড়িয়ে বিপরীত দিকে ছুড়ে মারতেই ক্রুদ্ধ বালক রাম তার সবল দুই হাতের কাঠি দিয়ে এত জোরে মন্থরার দুই হাঁটুতে আঘাত করল যে, তখনই সে ভূমিতে পড়ে গেল। কৈকেয়ী তক্ষুনি রাজবৈদ্যকে ডাকল ঠিকই, কিন্তু রাজবৈদ্যর সাধ্য হলো না তাঁর যাবতীয় ভেষজ বিদ্যার প্রয়োগ করে, লতা-পাতা-শিকড় বেটে মন্থরার আহত হাঁটুতে দিয়ে তা সারায়। এছাড়া মন্থরা দাসী, রাজকন্যা বা রাজবধূ নয়। গোটা জীবনেও বিরাম বা বিশ্রাম মেলেনি তার। হাড়ের ব্যথায় টানা দুদিন শুয়ে থাকার কপাল কি তার আছে? কাজেই দেখতে দেখতে হাঁটুর জোর কমে ক্রমাগত সামনে ঝুঁকে যেতে থাকে মন্থরা। ধীরে ধীরে একদিন ফড়িঙের মতো ছুটে বেড়ানো কিশোরী মন্থরা হয়ে ওঠে কুঁজো বুড়ি মন্থরা। তাকে দেখে দিন শুরু হলে দিন অশুভ হয়। তার মুখ দেখে যাত্রা করলে যাত্রা নাস্তি। এ ভিনদেশী রাজপ্রাসাদে তাকে ভালোবাসে ওই এক কৈকেয়ী। বাসবে না? হাজার হোক নাড়ি-ছেঁড়া ধন যে! চুপ-চুপ-মন্থরা! এ গোপন কথা যে ভাবতেও নেই! এ রুদ্ধ সত্য চিরদিন অপ্রকাশিত থাকুক। খোদ কৈকেয়ীও না জানুক কোনোদিন। এ সত্য জানে এক কৈকেয়ীর পিতা কেকয়রাজ অশ্বপতি, মন্থরা আর অশ্বপতির বৈধ স্ত্রী। 

অশ্বপতি। নামটি উচ্চারণ করতেই এ পঁয়ষট্টি বছরের দেহে আজো বিদ্যুত্ খেলে যায়। তাঁর যৌবরাজ্যের অভিষেকের দিনেই ২০০ নবীন দাস এবং ১০০ নবীনা দাসীর যে বহরটি যুবরাজকে উপহার দেয়া হয়েছিল, মন্থরা তাদেরই একজন। যুবরাজের অভিষেকে মন্থরাও নতুন চোলি আর ঘাগরা পেয়েছিল। পেয়েছিল স্বর্ণের না হোক, কানে ও গলায় পরার রৌপ্য অলঙ্কার। পায়ে পেতলের মল। আর সব কালো ত্বকের দাসীর চেয়ে মন্থরাকে তার গাত্রবর্ণের কারণেই অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা লাগছিল। পীতাভ ত্বকের সাথে ভূমিহার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আজানুলম্বিত চুল খোঁপার বাঁধন খুলে সহসা উচ্ছ্বসিত হয় হাঁটু অবধি। সেদিকে একবারই যেন চোখ চলে গেছিল বর্ণিল সে রাজ্যাভিষেক কক্ষের বৃদ্ধ রাজা ও রানী, যুবরাজ স্বয়ং, মন্ত্রী, পাত্র-মিত্র, সভাসদ ও পুরোহিতবর্গের। তার পর আবার সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। না, তখনো অবিবাহিত যুবরাজ সব দাসীকে শয্যায় টেনে নিচ্ছিল এমন নয়। অভিষেকের কদিনের মাথায় তাঁর বিয়েই হয়। মন্থরার সাথে তাঁর ভালোবাসার ঘটনাটা ঘটেছিল আরো কিছুদিন পরে। অশ্বপাগল অশ্বপতির সারাদিন আস্তাবলে পড়ে থাকা ভালো লাগত না নতুন রানীর। মন্থরা নিজেও ভালোবাসত অশ্ব। এত অশ্ব জীবনে দেখেনি সে। টকটকে লাল, রাত্রির অন্ধকারের মতো কালো কি শুভ্র বর্ণ অশ্ব দেখে হাঁ হয়ে যেত সে। টগবগ ছুটতে থাকা অশ্বের গতি দেখে প্রায়ই মন্থরার মনে হতো, সে নিজেও যদি তার ফেলে আসা গ্রামের পর এই প্রাসাদের দাসী জীবন, অন্য দাসদের মাঝে মাঝেই তাদের দাসীদের উত্ত্যক্ত করা এসব পেছনে ফেলে তুমুল গতিতে দূর কোনো অজানা প্রান্তরে ছুটে যেতে পারত, যেখানে আর কেউ কোনোদিন তাকে খুঁজে পাবে না! নয়ারানীর পায়ে আলতা পরিয়ে দেয়া, তাঁর পূজার ঘরের ধোয়া-মোছা কি আহারের আয়োজনের হাজার কাজ সেরে এক ছুটে সে চলে যেত আস্তাবলে। ঘোড়ার সহিসদের কাছ থেকে সে জেনে গেছিল ঘোড়াদের কীভাবে খাওয়াতে হয়, অসুখ হলে কি পথ্য দিতে হয়, কীভাবে তাদের গায়ে তেল মালিশ করতে হয়।

ঘোড়াদের সুখ-দুঃখও সে যেন বুঝে নিতে শিখেছিল। একবার অশ্বপতির প্রিয়তম অশ্ব বিশোকা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশোকার মৃত্যুর চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন যুবরাজ। মন্থরা সে সময় বিশোকার সেবা করে খুব। সুস্থ হয়ে ওঠে বিশোকা। রাত-দিন আস্তাবলে পড়ে থেকে বিশোকাকে মন্থরার সেবা আর ওদিকে তুচ্ছ অশ্ব নিয়ে স্ত্রীর তর্জন-গর্জনের ভেতর এক সন্ধ্যায় আস্তাবলে মন দিয়ে বিশোকাকে জল পান করাতে থাকা মন্থরার দিকে মশালের আলোয় যুবরাজের দৃষ্টিতে সহসা যেন একটি ঘোর নেমে এসেছিল!

তোমার নাম মন্থরা না?

হ্যাঁ- প্রভু!

কোন গ্রাম থেকে এসেছো?

সুদামা নদী পার হয়ে বহলিকা, দারাদাস, বার্বারাস, চীনাস, তুষারসসহ উদীচ্যের জনপদগুলো যেদিকে গেছে, সেখানে আমার গ্রাম প্রভু।

তুমি কি অশ্ব ভালোবাসো?

হ্যাঁ— লজ্জিতভাবে মাথা নেড়ে হাসে সপ্তদশী মন্থরা।

কেন?

জানি না কেন প্রভু— ওরা যখন খুব জোরে ছোটে, তখন মনে হয় পা নয় যেন ডানায় উড়ে চলেছে। মার কাছে শোনা পঙ্খীরাজ ঘোড়ার গল্পের মতো। তখন মনে হয় আমিও যদি ওদের মতো টগবগিয়ে ছুটে দূরে কোথাও যেতে পারতাম!

কেন জানি এ উত্তরে হা হা করে হেসে উঠেছিলেন যুবরাজ অশ্বপতি।

কিন্তু অনেক দূরে তুমি কেন যেতে চাও?

আমার যে পৃথিবীতে কেউ নেই যুবরাজ!

মুহূর্তে মলিন হয়ে উঠেছিল মন্থরার মুখ। আর কাজল আঁকা দুই চোখে গভীর বিষাদ মেখে অশ্বপতির চোখে দাসী হয়েও আশ্চর্য সাহসে সে সরাসরি তাকায়— ভাবে, মার কাছে শুনেছি আমার পিতাও একজন রাজপুরুষ। তবু আমি দাসী তোমাদের, যদিও হয়তো আমার দেহের শিরায় তোমাদের রক্তের অর্ধেক অন্তত বইছে হে যুবরাজ!

যুবরাজ অশ্বপতি তখন... সেই ঘোর সন্ধ্যায় যখন সহিসেরা এদিক সেদিক গেছে নানা কাজে... আস্তাবলের এক নিভৃত কোনায় মশালের আলোয় কি মনে করে কিছু না ভেবেচিন্তেই মন্থরার খুব কাছে ঝুঁকে আসেন।

পৃথিবীতে কেউ নেই অর্থ? তোমার কি দাসীবৃত্তি ভালো লাগে না? তুমি মুক্তি চাও? বিশোকাকে বাঁচাতে অনেক পরিশ্রম করেছো তুমি। চাইলে তোমাকে আমি মুক্তি দিতে পারি। গ্রামে ফিরে যাবে? মা-বাবার কাছে? পছন্দের কেউ আছে তোমার?

শেষ প্রশ্নটি করে যুবরাজ সকৌতুকে চোখ নাচায়।

না প্রভু, গ্রামে আমার কেউ নেই।

তোমার মা-বাবা মৃত?

মন্থরা মিথ্যে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়। সত্যি কি কেউ তার আছে? কার কাছে ফিরে যাবে সে?

সে সময় আস্তাবলে দমকা হাওয়া ঢুকে পড়ে সশব্দ সহসা আর যেন কিছু না বুঝে অনেকটা ঘোরগ্রস্তের মতো বাতাসে দুলতে থাকা মশালের লালাভ আলোয় যুবরাজ অশ্বপতি মন্থরাকে কাছে টেনে নেন। জ্বরে কাঁপতে থাকা রোগীর মতো কৈকেয় যুবরাজ জড়িয়ে ধরেন এক ভূমিহার দাসীকে।

আমিও বড় একা মন্থরা! আমার স্ত্রী আমাকে বোঝে না, বুঝতে চায় না। তুমি আমার দায়িত্ব নেবে?

মন্থরাকে প্রচণ্ড বিস্মিত করে কাঙালের মতো বলে ওঠে স্বয়ং কৈকেয় অধিপতি। মন্থরা সহসা ধরা দেয়নি। নরমভাবে সে ছাড়িয়ে নিয়েছিল স্বয়ং রাজার আলিঙ্গন, আমি দাসী প্রভু। আমরা শূদ্র। আমাদের কাছে আসাও আপনাদের পাপ!

কিন্তু তুমি তো দেখতে শূদ্রদের মতো নও। তোমার রক্তে অবশ্যই উচ্চবর্ণের মিশ্রণ আছে।

মাথা নত করেছিল মন্থরা আর তার চোখ উপচে গড়িয়ে পড়েছিল জল। সে হতে পারে প্রভু। কিন্তু ঘরে আপনার অগ্নিসাক্ষী, মন্ত্রসাক্ষী করা রানী থাকতে আমার মতো তুচ্ছ দাসী— আমাকে ক্ষমা করবেন প্রভু!

এটুকু বলে এক ছুটে সেই সন্ধ্যায় বের হয়েছিল মন্থরা আস্তাবল থেকে। যুবরাজ অশ্বপতি কিন্তু তাকে জোর করেনি। যত্রতত্র দাসী গমন তাঁর স্বভাবে ছিলও না। কিন্তু স্ত্রীর সাথে দিন দিন দূরত্ব বাড়ছিল তাঁর। যদিও নিয়মমাফিক একের পর এক পুত্রসন্তান জন্ম দিচ্ছিলেন যুবরাজ আর যুবরানী মিলে। মন্থরা দিন দিন হয়ে উঠেছিল যুবরাজের প্রিয় পাত্রী, যে অশ্ব ভালোবাসে, বোঝে খানিকটা রাজনীতি আর সমরনীতির আলাপ— প্রাসাদে সে নিজের চেষ্টায় একে-তাকে ধরে কিছুটা লিখতে-পড়তে শিখেছে।

একটা পর্যায়ে যুবরাজ আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। নিয়মিতই আসতে শুরু করেন মন্থরার কাছে। একটা চাপা ক্ষোভ বা কষ্ট অবশ্যই ছিল মন্থরার।

তোমার এ অপমান আমারও ভালো লাগে না মন্থরা! কিন্তু তোমাকে বিয়ে করলে রাজপুরোহিতরা সবাই ক্রুদ্ধ হবেন। ভালো লাগে না পুরোহিতদের এ অত্যাচার। উদীচ্য থেকে মগধ, গান্ধার থেকে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ... ব্রাহ্মণদের নিয়মের কঠোরতায় মানুষে মানুষে শুধু বিভেদ। আমাদের ধর্মে সব আছে শুধু প্রাণটা নেই। এই অর্জুন ঔপবেসি বলো, গৌতম কি সত্যজন পৌলুষি, বুদিলা অশ্বতরস্বী, ইন্দ্রদ্যুন্ম বল্লভেয়, জন সরকারক্ষা, প্রাচীনশালা, অপমান্যব কি উদ্দালক আরুণি— এরা কেউ শাস্ত্রের বাইরে যাবে না। অথচ এদের প্রতিপালনে রাজকোষ থেকে কত অর্থই না ব্যয় করি!

দরকার নেই প্রভু!

তুমি মা হতে চাও না মন্থরা?

একদিন কেন জানি মিলনের আগে তির্যক দৃষ্টিতে মন্থরার দিকে তাকান যুবরাজ। রাজকবিরাজের কাছ থেকে নিয়মিত ভেষজ ওষুধ গ্রহণ করত মন্থরা। নিজে সে শৈশবে যে অপবাদ শুনে বড় হয়েছে, তা যেন তার সন্তানকে শুনতে না হয়। ‘জারজ’ কাউকে সে পৃথিবীতে আসতে দেবে না।

যদি তোমার সন্তানকে আমি স্বীকৃতি দিই?

কেঁপে ওঠে মন্থরা, সেটা রানী মেনে নেবেন কেন?

রাজাদের শত শত স্ত্রী থাকে মন্থরা। আমি সে তুলনায় খুবই একনিষ্ঠ। ও আমাকে একটু বুঝতে চাইলে তোমার কাছে আমার হয়তো আসাই হতো না।

থাক প্রভু এসব কথা!

মা হতে চাও না তুমি মন্থরা?

তরুণী মন্থরার হাতে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে অধীর উত্তেজনায় প্রশ্ন করেন অশ্বপতি, আমি কিন্তু চাই।

আমি চাই আমার প্রিয়তমা নারীর গর্ভে আমার একটি সন্তান অন্তত আসুক। স্বীকৃতি নিয়ে ভেবো না। তোমাকে যা দিতে পারি  নি, তা সেই সন্তানকে দেব।

এ আপনি কী বলছেন মহারাজ?

অশ্বপতি সেদিন মন্থরার আর কোনো প্রতিরোধই মানেন না। মন্থরাও ভুলে গেছিল রাজকবিরাজের সব নির্দেশ, যাতে জন্মনিরোধ হয়। নিজেকে চূড়ান্ত নিয়তির কাছে সমর্পণ করে সে।  

কৈকেয়ী- কৈকেয়ী- কন্যা আমার!

নিদ্রিত একমাত্র কন্যার মুখের দিকে তাকায় মন্থরা। কি সরল আর বিশ্বাসী মেয়ে তার কৈকেয়ী!

নিজের মাকে যে আজীবন দাসী জেনে গেল! কৈকেয়ী মন্থরার গর্ভে আসার পরই অশ্বপতির স্ত্রী আর সহ্য করতে পারলেন না। পিতৃগৃহে চলে গেলেন তিনি চিরতরে। মানুষ জানল পশু-পাখির ভাষা বোঝা অশ্বপতি একদিন এক পুরুষ ও স্ত্রী পাখির আলাপ শুনে হাসার সময় অশ্বপতির স্ত্রী স্বামীর কাছে কেন হাসলেন, তা জানতে চান। কৌতূহলী রানী পীড়াপীড়ি করতে থাকেন পাখির ভাষার অর্থ তাঁকে বলার জন্য। কিন্তু অশ্বপতির ওপর এই মুনী বাক্য ছিল যে যেদিন তিনি পশুপাখির কোনো কথা কোনো মানুষকে তর্জমা করবেন, সেদিনই তাঁর মৃত্যু হবে। বিরক্ত অশ্বপতি এই ভেবে ক্রুদ্ধ হন যে রানীর কাছে তো তার জীবন-মৃত্যু তবে সমান কথা! এত মমতাহীন স্ত্রীকে তখন পিতৃগৃহে তিনি আজীবন নির্বাসনে পাঠান। অবশ্য গল্পটা পুরোও মিথ্যে নয়। রানী রাজার ভালো-মন্দ নিয়ে কমই ভাবতেন। আর মাঝে মাঝেই পশু-পাখির কথা অনুবাদ করলে বৈধব্যযোগ আছে জেনেও বোকার মতো রাজাকে অনুরোধ করতেন সেসব কথা তর্জমা করে দেয়ার জন্য।

অশ্বপতির শত অনুরোধেও গর্ভাবস্থার শেষ দিনগুলো সে পার করেছে দাসীর কুঠুরিতেই। কৈকেয়ীর জন্মের পর পরই প্রচুর পুরনো দাস-দাসী ছাঁটাই করা হয়, যেন ভেতরের বিষয়গুলো কেউ না জানে!

নতুন যারা দাস-দাসী এল, তারা নির্বাসিতা রানীর এক মাস বয়সী শিশুকন্যার দুধমা হিসেবে চিনল মন্থরাকে। কৈকেয়ী বড় হয়ে উঠল তার চেয়ে এক থেকে সাত বছরের বড় সাত বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সাথে। সাত ভাইয়ের সাথে অশ্ব চালনা, তীরন্দাজি আর অসি চালনা শিখে বড় হয়ে উঠল কৈকেয়ী। তবু রাজকন্যাদের দুর্ভাগ্য এই যে, উপযুক্ত রাজবংশে বিয়ে দিতে প্রায়ই তাদের বয়স্ক রাজার দ্বিতীয়া বা তৃতীয়া স্ত্রী হতে হয়। কৈকেয়ীর জন্যও তেমন একদিন আয়োধা বা অযোধ্যার রাজা দশরথের বিয়ের সন্বন্ধ এল। তাঁর প্রথমা স্ত্রী তো কেকয় রাজ্যেরই পড়শি রাজ্য কোশলের রাজকন্যা কৌশল্যা। বিয়ের পর একটি মাত্র কন্যা শান্তার জন্ম দিয়ে কাক বন্ধ্যা হয়ে আছে সে।

এদিকে দশরথের তো রাজত্ব দেখতে মৃত্যুর পর রাজপুত্র দরকার। তাই একদিন দূত এল অযোধ্যা থেকে কেকয় রাজের কাছে। যেহেতু দশরথ আজো অপুত্রক, কৈকেয়ী দ্বিতীয়া রানী হলেও তাঁর আগে পুত্র হলে সে-ই হবে রাজমাতা। রাজি হলেন অশ্বপতি এবং কৈকেয়ীর বড় দাদা যুধজিত।

সালঙ্কারা কৈকেয়ীকে যখন বিয়ের মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনি জীবনের একমাত্র চাওয়া প্রিয়তম পুরুষ অশ্বপতিকে কাছে চেয়েছিল মন্থরা। অনুরোধ শুনে অশ্বপতির চোখে জল এল, কৈকেয়ীর শ্বশুরবাড়িতে যেতে চাও? চিরদিনের মতো? দাসী পরিচয়ে?

তবু তো মেয়ের কাছে কাছে থাকতে পারব। যা বালক স্বভাবের মেয়ে আমার! নিজ স্বার্থ কিছুই বোঝে না। ঘর-সংসার বোঝে না— বোঝে শুধু ঘোড়দৌড় আর রথ চালনা।

আর খানিকটা আমার প্রতি অভিমান? তোমাকে যা কিছু আমি দিতে পারিনি তার শোধ নিয়ে চিরবিদায় নেয়া, তাই না? কি জেদি তুমি মন্থরা!

মন্থরার চোখ এ কথায় এতটুকু ছলছল করে না। প্রথম যৌবনের মতো কথায় কথায় অশ্রু আর আসে না চোখে। এক দীর্ঘ জীবনের তাপ তাকে শুষ্ক, কঠোর করে তুলেছে। কৈকেয়ীর সাথে পরিচর্যাকারী দাসী হিসেবেই অযোধ্যার প্রাসাদে এল সে। দশরথের শশ্রুমাতা হিসেবে নয়, স্ত্রীর পরিচারিকা হিসেবে। কিন্তু হায় ভাগ্য! দশরথ আটকুঁড়ে না তাঁর রানীরা বন্ধ্যা কে জানে, কি বিয়ের বহু বছর পরও কৈকেয়ীও প্রথমা রানী কৌশল্যার মতো বন্ধ্যাই রইলেন। পুত্র চাহিদায় অস্থির দশরথ এবার ঘরে নিয়ে এলেন কাশির রাজকুমারী সুমিত্রাকে। একই ফলাফল। বহু পরে না পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করে আর যজ্ঞের চরু প্রসাদের ভাগ খেয়ে তিন রানী চার রাজপুত্রের ভাগ হলেন। কিন্তু কৈকেয়ীর সন্তান যেহেতু কৌশল্যার আগে হলো না, বড় রানীর সন্তান হিসেবে রামই ভবিষ্যতের যুবরাজ। হায় ভাগ্য তোমার মন্থরা! তোমার মা ছিল এক রাজপুরুষের হাতে ব্যবহূতা— তার মেয়ে তুমি ‘জারজ’ গালি শুনে বড় হয়েছো। কয়েকটি স্বর্ণ মুদ্রায় তোমাকে দাসী হিসেবে কিনে নিয়েছে কেকয়ের রাজগৃহ।

সেখানে তোমার গুণ-বুদ্ধি-বিবেচনায় রাজা অশ্বপতি মুগ্ধ হয়েছেন। তুমি তাঁর প্রিয় নারী হয়েছো, তাঁর কন্যার মা হয়েছো, তবু সেই দাসীই রয়ে গেছো। কৈকেয়ীর বৈধ স্ত্রী হয়ে লাভ কি যদি তার সন্তানও রাজা না হয়? মন্থরার মা, মন্থরা থেকে কৈকেয়ী— মাতামহী থেকে দৌহিত্রী— তিনটি প্রজন্ম নানাভাবে তারা কি শুধু ব্যবহূতই হয়ে যাবে? প্রাণ থাকতে এ আর হতে দেবে না মন্থরা। তাতে ওই রাম— ওই রামের জন্য হাঁটু ভেঙে মন্থরা আজ কুঁজো বুড়ি, কদর্য দেখতে।

কৈকেয়ী— নিদ্রা যাচ্ছিলে কি? ঘুম ভাঙালাম?

না- না- এই তো উঠে পড়েছি। অনেক দিন অসি চালনা করি না। আজ বিকালে ভাবছি অস্ত্রাগারে যাব।

মেয়ের মুখের দিকে গভীর মমতায় তাকায় মন্থরা। পুরুষ মানুষ কিছুদিন নারীর রূপে ভুললেও দীর্ঘদিনের যাত্রায় চায় যথার্থ সঙ্গিনী। তাই অশ্বপতি ঘোড়ার শুশ্রূষাকারিণী মন্থরায় ভুলেছিলেন। দশরথ যেমন কৌশল্যা বা সুমিত্রার চেয়ে একই কারণে কৈকেয়ীকে বেশি ভালোবাসেন। বাসবেন না-ই বা কেন? সম্বরসুরের সাথে যুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৈকেয়ী গেছিল স্বামীর সাথে খোদ রণক্ষেত্রে।

দেবরাজ ইন্দ্রের ত্রাস এই সম্বরসুর যখন দশরথের রথের চাকা ভেঙে ফেলল আর তার একটি তীর দশরথের বর্ম ভেদ করে তার বক্ষ ভেদ করল, দুঃসাহসী কৈকেয়ী চোখের পলকে সেই রথের ভগ্ন চাকা মেরামত করে অসুস্থ রাজাকে রথে তুলে প্রবল গতিতে ছোটাল রথ। রণক্ষেত্রের বাইরে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে এর পর রাজাকে সুস্থ করে তোলার জন্য তার বিরামহীন সেবা।

দিন-রাত নিষ্পলক জেগে থেকে শুশ্রূষা। সুস্থ হয়ে উঠে কৃতজ্ঞ, অভিভূত দশরথ কৈকেয়ীকে দুটো বর দিতে চাইলেন। সরল, বিষয়বুদ্ধিহীন আর লাজুক কৈকেয়ী হেসে উড়িয়ে দিলেন। দশরথের অনেক অনুরোধে বললেন, ঠিক আছে। পরে কখনো দরকার হলে চেয়ে নেব।

আজ এসেছে সে মুহূর্ত। রাজপ্রাসাদের সব দেয়াল আজ নতুন খবরের খুশিতে ঠিকরে পড়ছে আলো আর গানে। সামনে যৌবরাজ্যে রামের অভিষেক। প্রাণ থাকতে এ হতে দেবে না মন্থরা।

খবর জানো কিছু কৈকেয়ী?

কী খবর?

রাম যে যুবরাজ হতে চলেছে?

কি সুসংবাদ শোনালে! হাসিমুখে কৈকেয়ী গলা থেকে একটি মুক্তোর মালা বাড়িয়ে দেয় দাসী অথবা মা মন্থরার দিকে।

বোকা মেয়ে! কপাল চাপড়ায় মন্থরা, বুদ্ধু কোথাকার! রাম যুবরাজ হলে ওই কৌশল্যা হবে রাজমাতা। তখন তোমার কী হাল হবে ভেবে দেখেছো? দাসী— এই আমার মতো দাসী হতে হবে তোমাকে!

 

প্রিয় পাঠক, আমাদের গল্পের রাত— আমাদের আলিফ লায়লা— এখানেই শেষ হয়ে আসছে। এর পরের কাহিনীটুকু রামায়ণের সুবাদে আপনারা সবাই জানেন। কীভাবে কৈকেয়ী মন্থরার কথায় দশরথকে বাধ্য করেছিলেন পূর্বপ্রতিশ্রুতির জের ধরে রামকে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে পাঠাতে ও ভরতকে সে সময়ের জন্য রাজা করতে এবং এর পরিণতিতে আরো কী কী ঘটেছিল তা আমরা সবাই জানি। তবে রামায়ণের এ কাহিনী যা ভারত ছাড়িয়ে শ্যাম দেশ, ব্রহ্ম দেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, লাওস বা কাম্পুচিয়া পর্যন্ত নানাভাবে ছড়িয়ে গেছে, তার কোনো কোনো সংস্করণে এটাও বলা হয়, যেহেতু কৈকেয়ীর পিতা অশ্বপতি পশু-পাখির ভাষা বুঝতেন, রামের জীবনের চৌদ্দ বছরের বনবাস, রাবণবধ প্রভৃতি দৈব নির্দেশিত ঘটনা তিনি আগেই জেনে গেছিলেন। দেবতারা অবতার পুরুষ রামের জন্য তাঁর মনুষ্যজীবনের যে ছক এঁকে রেখেছিলেন, সেটা যেন ঠিকঠাক পূরণ হয়, তাই অশ্বপতি গোটা বিষয়টি আগেই কৈকেয়ী ও মন্থরাকে জানিয়ে রেখেছিলেন। আর তাঁরা স্ক্রিপ্ট মেনে অভিনয় করে গেছিলেন। কৈকেয়ী তাই চৌদ্দ বছর রামের জন্য রামের গর্ভধারিণী মা কৌশল্যার চেয়েও বেশি আকুল হয়ে অপেক্ষা করেছে। মর্যাদা পুরুষোত্তম রাম যেন দেবতাদের সব পরিকল্পনা সফল করতে পারেন, এজন্য খল চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল বীর নারী কৈকেয়ী ও তাঁর ততোধিক ধৈর্যশীল, মমতাময়ী মা মন্থরাকে। বদলে প্রজন্মান্তরে সবার কাছে ঘৃণিত হয়েছেন তাঁরা। তবু দেবতাদের উদ্দেশ্য পূরণকেই ধর্ম মেনেছেন।