কাওয়ালির উত্পত্তিস্থল ভারত, আরো নির্দিষ্ট করে বললে উত্তর ভারত। মধ্যযুগে দিল্লিতে শুরুর পর পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করে সুফি ধারার এ সংগীত। পরবর্তী সময়ে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল যেমন রাজস্থান, হায়দরাবাদে কাওয়ালি গান বিস্তৃতি লাভ করে। সেখান থেকে কাওয়ালি একসময় বাংলায়ও পৌঁছে। কাওয়ালি গানের শিল্পী বা কাওয়ালরা সাধারণত বংশপরম্পরায় এ চর্চায় যুক্ত থাকেন। মধ্যযুগে শুরু হওয়া কাওয়ালি মাজার-দরগা ও ধর্মীয় অঙ্গন থেকে সর্বস্তরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীতে।

কাওয়ালদের পরম্পরায় ‘কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানা’ বা দিল্লি ঘরানা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মূলত কাওয়ালির জনক হযরত আমীর খুসরোর হাত ধরেই এ ঘরানা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমীর খুসরোর সময়ে ঘরানায় যুক্ত হওয়া শিল্পীদের উত্তরপুরুষরা এ উপমহাদেশে কাওয়ালির ধারা অব্যাহত রেখেছেন। এক্ষেত্রে সূচনাকালে বড়ে মোহাম্মদ খাঁ, বড়ে মুবারক আলী খাঁ, নাজির খাঁ, ওয়াহিদ খাঁ, মুরাদ খাঁ থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ধারায় ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান, ফরিদ আয়াজ ও আবু মোহাম্মদ এ ঘরানারই সদস্য।

উপমহাদেশে সর্বস্তরে কাওয়ালি জনপ্রিয় করার কৃতিত্বটা দিতে হয় ফতেহ আলী খানকে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে ফতেহ আলী খানের জন্ম। পিতা মওলা বকস খানের হাতেই ধ্রুপদী সংগীতে তার হাতেখড়ি হয়। পরে তিনি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র সেতার, সরোদ ও বিচিত্রাবাণীর পাশাপাশি পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র ভায়োলিনেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সুফি চিশতি ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ফতেহ আলী খানের বংশপরম্পরাগতভাবে কাওয়ালির চর্চা প্রায় ৬০০ বছর পুরনো। ফতেহ আলী খান ছিলেন পাঞ্জাবি, উর্দু, আরবি ও ফার্সির হাজারো স্তবকে পণ্ডিত।

পারিবারিক কাওয়ালি অনুষ্ঠান আয়োজনের ফতেহ আলী খান প্রধান ভূমিকা নিতেন। তবে সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন ভাই মোবারক আলী খান। এ মোবারকও একই সঙ্গে গান করতেন এবং হারমোনিয়াম বাজাতেন। দুই ভাই ছিলেন তত্কালের অন্যতম সেরা কাওয়াল। আল্লামা ইকবালের বহু কবিতা থেকে তারা কাওয়ালি তৈরি করেছেন ও গেয়েছেন। এর মাধ্যমে একাধারে এ পরিবারের নাম, কাওয়ালি ও ইকবালের কবিতা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ফতেহ আলী খানের পর বংশের ধারায় কাওয়ালি চর্চার অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন তার ছেলে নুসরাত ফতেহ আলী খান। কৈশোরে কাওয়ালির প্রতি আগ্রহ থাকায় নুসরাত ফতেহ আলী খান বাবার কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর চাচা মোবারক আলী খান ও সালামত আলী খানের কাছ থেকে তালিম নিয়ে প্রস্তুতি পর্ব শেষ করেন। কাওয়ালির আসরে ছেলেবেলায় পদার্পণ ঘটলেও বিশ্বজগতে পরিচিতি লাভ করেন আরো কিছুদিন পরে।

বলা যায়, ব্রিটিশ রেকর্ড লেবেল রিয়েল ওয়ার্ল্ডের হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাওয়ালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালে আন্তর্জাতিক উৎসব ওয়ার্ল্ড অব মিউজিক, আর্টস অ্যান্ড ড্যান্স (ডব্লিউএমএডি) আয়োজিত লাইভ অনুষ্ঠানের রেকর্ড অ্যালবাম আকারে প্রকাশ করে রিয়েল ওয়ার্ল্ড। ২০ জুলাই সর্বপ্রথম এশিয়ার বাইরের শ্রোতাদের সামনে কাওয়ালি পরিবেশন করা হয়—শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খান। এর পরই ভারতীয় এক প্রাচীন সংগীত ধারার দরজা খুলে যায় পশ্চিমা শ্রোতাদের সামনে। মূলত ডব্লিউএমএডির অনুষ্ঠানটির পরই কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। পরবর্তী সময়ে যত খ্যাতিই এসেছে নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবনে, সর্বদাই তিনি নিজেকে কাওয়ালি সাধক বলেই আখ্যা দিয়েছেন। ক্রমে তিনি ‘শাহেন শাহ-এ কাওয়ালি’ নামে পরিচিতি পান।

পারিবারিক কাওয়ালি অনুষ্ঠানের আর একজন শিল্পী ছিলেন নুসরাত ফতেহ আলী খানের ভাই ফারুখ ফতেহ আলী খান। তিনি কাওয়ালির আসরে হারমোনিয়াম বাজাতেন। ভাই নুসরাত ফতেহ আলী খানের যুক্তরাজ্যে ভ্রমণকালীন তিনি ‘হারমোনিয়াম রাজা সাহেব’ হিসেবে খ্যাতি পান। বলা হয়, পারিবারিক কাওয়ালি অনুষ্ঠানের বেশকিছু কাওয়ালি গানের সুরকার ছিলেন তিনি। ফররুখ ফতেহ আলী খানও ছিলেন বাচ্চোকা ঘরানার সদস্য। পরে ছেলে রাহাত ফতেহ আলী খান কাওয়ালি ঘরানার প্রধান হওয়ার পর তিনি সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেন।

রাহাত ফতেহ আলী খান তার বংশের ঐতিহ্য ধারাকে আরো এগিয়ে নিয়েছেন। জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন তার বাবা ও চাচার অনুচর। দাদার মৃত্যুবার্ষিকীতে মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসমক্ষে গান পরিবেশন করেন। ১৫ বছর বয়েসী রাহাত, চাচা নুসরাত ফতেহ আলী খানের প্রসিদ্ধ কাওয়ালি গ্রুপের একনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নুসরাত ফতেহ আলী খান কাওয়ালি গ্রুপের সঙ্গে ও এককভাবে দেশে-বিদেশে বহু অনুষ্ঠান করেছেন। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েম্বলি এরেনা ও ম্যানচেস্টার এরেনায় ২০ হাজার শ্রোতার সামনে প্রতিধ্বনিত হয় এক আদি ভারতীয় সংগীতের সুর। রেকর্ড পরিমাণ টিকিট বিক্রি হয় কনসার্টগুলোয়। রাহাত ফতেহ আলী খান ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম কোনো পাকিস্তানি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন। চাচা নুসরাত ফতেহ আলী খানের সর্বাধিক জনপ্রিয় কাওয়ালি ‘তুমহে দিল্লাগি’ ও ‘মাস্ত কালান্দার’-এ মুখরিত হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন।

পাকিস্তানে খান বংশের পর কাওয়াল সাধক হিসেবে নাম আসে সবরী ব্রাদার্সের। খান বংশের মতোই চিশতি ধারার সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র পাওয়া যায় সবরী ভ্রাতাদের। তাদের শাহেনশাহ-এ-কাওয়ালি বলে আখ্যা দেয়া হয়। মূলত ১১ বছর বয়সে মকবুল আহমেদ সবরী ব্যান্ড দল গঠন করেন। পরে এতে যোগ দেন ভাই গোলাম ফরিদ সবরী। পরে এটি বাচ্চা কাওয়াল পার্টি হিসেবে পরিচিতি পায়। আগেই বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে খান বংশীয়রা কাওয়ালি পরিবেশন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কাওয়ালি পরিবেশনায় প্রথম নাম লেখায় সবরী ব্রাদার্স। মার্কিন শ্রোতা ছাড়াও বিভিন্ন দেশের শ্রোতাদের কাওয়ালিতে মুগ্ধ করেন তারা।

কাওয়ালি নিয়ে ফিউশন ও অন্যান্য পরীক্ষামূলক কাজ হয়েছে। তবে পাকিস্তানে কাওয়ালির মূল ধরনটি ধরে রেখেছেন বলতে গেলে গোলাম ফরিদউদ্দীন আয়াজ ও আবু মোহাম্মদ। তারা ওস্তাদ মুনশী রাজিউদ্দীনের পুত্র ও দিল্লির কাওয়াল বাচ্চোকা ঘরানার সদস্য। ফরিদউদ্দীন আয়াজ ও আবু মোহাম্মদের মতে স্রেফ বিনোদন বা পেশার থেকেও তাদের শিল্পকর্ম মূলত আধ্যাত্মবাদের চর্চা। কাওয়ালিতেই মানুষের অন্তরাত্মার শান্তি নিহিত। তাদের মতে, বিশুদ্ধ কাওয়ালির ধারা টিকিয়ে রেখে তা পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াই প্রকৃত কাওয়াল সাধকের উদ্দেশ্য।

ছেলেবেলায় বাবা ওস্তাদ মুনশী রাজিউদ্দীনের কাছেই তালিম শুরু হয়। ন্যাশনাল কলেজ করাচিতে থাকতে ফরিদ আয়াজ বহু ইন্টার কলেজ সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। বলা বাহুল্য, সবগুলোতেই প্রথম স্থান লাভ করেন আয়াজ। মজার কথা, ওই সময়ই তিনি সংগীতে এত বড় পণ্ডিত ছিলেন ছিলেন যে কয়েকটি প্রতিযোগিতায় স্বয়ং বিচারকমণ্ডলী তার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। কৈশোরেই তিনি একজন প্রতিভাধর ধ্রুপদী ও কাওয়ালি শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সাম্প্রতিককালে দুই ভাই মূলধারায় কাওয়ালি পরিবেশনার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। পাকিস্তানের মুষ্টিমেয় অবশিষ্ট কিছু কাওয়ালদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফরিদ আয়াজ ও আবু মোহাম্মাদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠান ছাড়াও টাইমস অব ইন্ডিয়া আয়োজিত আমান কি আশাতেও কাওয়ালি পরিবেশন করেন দুই ভাই। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পীর লাইভ স্টুডিও রেকর্ড সংগীত অনুষ্ঠান কোক স্টুডিওর দ্বাদশ মৌসুমে কাওয়ালি পরিবেশনা করে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তারা।

স্বাধীন ভারতে কাওয়ালি চর্চার নিদর্শন পাওয়া যায় ওয়াদালি ব্রাদার্সের মাঝে। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরে শ্রী গুরু আর্জান সাহেবজি শিখদের ধর্মীয় উপসনালয় গুরুকি ওয়াদালি প্রতিষ্ঠা করেন। ওয়াদালি ব্রাদার্স সেখানকারই কাওয়ালি গায়ক। ওয়াদালি ব্রাদার্স বলতে মূলত বোঝায় পুরন চাঁদ ওয়াদালি ও পেয়ারেলাল ওয়াদালিকে। বাবা ঠাকুর দাস ওয়াদালির পৃষ্ঠপোষকতায় জ্যেষ্ঠ পুত্র পুরন চাঁদ ওয়াদালির সংগীত সাধনা শুরু হয়। তার গুরু ছিলেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান। পেয়ারেলাল ওয়াদালি অগ্রজের থেকেই তালিম গ্রহণ করেন। সুফি ভাবাদর্শকে নিজেদের মাঝে লালন করার মাধ্যমে কাওয়ালি গানের ধারাকে জনপ্রিয় করে তুলছেন ওয়াদালি ব্রাদার্স।

বর্তমানে কাওয়ালির মূল ধরন থেকে বেরিয়ে ফিউশনের আশ্রয়ে বিভিন্ন সংগীতজ্ঞরা শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরছে এক আদি ভারতীয় সংগীতের বার্তা। সমসাময়িককালে এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্বটা দিতে হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় সংগীত পরিচালক, গায়ক ও সংগীত প্রযোজক এআর রহমানকে। বরাবরই সুফিবাদী দর্শনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এসেছেন রহমান। তার সংগীত আয়োজনে কাওয়ালি পপ কালচারের অংশ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ‘পিয়া হাজী আলী’, ‘আর্জিয়া’, ‘খাজা মেরে খাজা’ গানে কাওয়ালির ছোঁয়া পাওয়া যায়। এছাড়া রহমানেরই সংগীতায়োজনে ভারতীয় গায়ক মোহিত চৌহানের সঙ্গে ভারতীয় ‘নিজামি বন্ধু’ কাওয়ালি দলের কণ্ঠে রূপ দেন জনপ্রিয় গান ‘কুন ফায়া কুন’।

বাংলাদেশে যে শিল্পীরা ফিউশনের সমন্বয়ে কাওয়ালি গান টিকিয়ে রেখেছেন তাদের মধ্যে থেকে প্রথম নাম আসে রুনা লায়লার। তার কণ্ঠে ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ গানটি সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পায় বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বের শ্রোতাদের কাছেও। পাকিস্তানি সংগীত অনুষ্ঠান কোক স্টুডিওর কথা এখন সবাই জানে। পাকিস্তান ছাড়াও ভারতেও এ ফ্র্যাঞ্চাইজির মৌসুম অনুষ্ঠিত হয়। কাওয়ালির এক আধুনিক সংস্করণ তুলে ধরেছে কোক স্টুডিও। এতে কাওয়ালি পরিবেশনা করেন ফরিদউদ্দীন আয়াজ ও আবু মোহাম্মাদসহ জনপ্রিয় পাকিস্তানি শিল্পী আবিদা পারভীন, আতিফ আসলাম ও কিংবদন্তি এআর রহমান।

 

সৈয়দ মেহরাজ কবির: সাংবাদিক