প্রেক্ষাপট

নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে প্রচুর কথাসাহিত্য কি বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক ভাষ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ-প্রবন্ধ-ইতিহাসের বই যেমন লেখা হয়েছে, তেমনি পশ্চিম বাংলার এ আলোচিত কৃষক আন্দোলনের অভিঘাতে কবিতাও কম রচিত হয়নি বলেই পরিলক্ষিত হয়। নকশালবাড়ি প্রসঙ্গে কিংবা এর অনুষঙ্গে রচিত কবিতাগুচ্ছের মধ্যে ‘বিপ্লবী সাহিত্য’ তথা ওই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী-সমর্থকদের লেখা রক্ত গরম গনগনে কবিতা যেমন রয়েছে, তেমনি আছে কিছুটা দূরত্ব রেখে নকশালবাড়ির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে লেখা তুলনামূলকভাবে নির্লিপ্ত ও পরিপার্শ্বের মানসিক বাস্তবতালগ্ন কবিতাও।

‘নকশালপন্থী কবিতা’?

প্রথমোক্ত ধারার কবিতাকে নকশাল আন্দোলনের ইতিহাসকার নির্মল ঘোষ সরাসরি ‘নকশালপন্থী কবিতা’ বলেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে— (১) কৃষকের ওপর সামন্তবাদী শোষণ ও তার বিরুদ্ধে কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রাম, (২) শহরাঞ্চলে হত্যা-সন্ত্রাস ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও (৩) ‘লাল সন্ত্রাসের’ আহ্বান। নকশালপন্থী পত্রপত্রিকায় মণীন্দ্র গুপ্ত বা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো নকশাল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল কয়েকজন কবির কবিতা ছাপা হলেও ওইসব বিষয়াদি তাদের লেখনীতে অনুপস্থিত। তাই তাদের নির্মল ঘোষ অভিহিত করেছেন ‘সাধারণভাবে বামপন্থী কবিতার রচয়িতা’ বলে। উপরোক্ত প্রথম লক্ষণাক্রান্ত কবিতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন কুশল সেনের ‘চাষাড়ে’ (‘তুমিই ঠিক করবে/মরবে কিংবা মারবে।/মাঠ গেছে বলদ গেছে/হাতের কাস্তে বৈরী/ভুলেছো ওটা ধানের নয়/নালার মাপেও তৈরি—’) ও দীপক আচার্যের ‘নকশাল কোন সাল ইতিহাসে আনলে’ (‘নকশাল কি মশাল আসমানে জ্বলছে,/কিষাণের ক্ষোভে আজ হিমালয় টলছে,/অনেক দিনের পুরোনো সে জিজ্ঞাসা—/মিটবে কি কভু চাষির জমির আশা?/লড়াইয়ের ঢেউয়ে উত্তর উত্তাল—/নকশাল, নকশাল, নকশাল, নকশাল’) কবিতা দুটির কথা। এ ধরনের কবিতায় আন্দোলনগত আবেগের দিক থেকে ঘাটতি নেই কোনো, কিন্তু কবিতার ব্যাকরণের খোপে ঠিক এঁটে ওঠে না যেন।

নকশালপন্থী আন্দোলনে শাসনযন্ত্রের যেনতেন প্রকারে বাধাদান, আন্দোলনরত তরুণদের হত্যা ও সংগ্রামে ঘটে যাওয়া রক্তপাত-মৃত্যু বিষয়ে রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে নজরে আসে প্রতিশোধ নেয়ার অগ্নিগর্ভ আকাঙ্ক্ষা, আবার এক ধরনের তীব্র মানবিক বেদনাবোধও এসব কবিতায় ধরা পড়ে। যেমনটি পাই নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘মস্তান’ কবিতায়: ‘রক্তে শহরটা ডুবে যায় পার্লামেন্ট/ সূর্যটা রক্তের মধ্যে আছড়ে পড়ে/ইস্কুলের দেওয়ালের ওপর রক্ত/সাদা গীর্জার ওপর রক্ত/গাড়ির উইন্ড স্ক্রীনের ওপর রক্ত/ দোয়াত উপচে পড়ে রক্ত/সাদা ফুলের ওপর জ্বলজ্বল করে রক্ত/রক্ত ছিটকে লাগে খবরের কাগজে/একটা পুলিশ একটা বন্দুক/বন্দুকে তিনটে বুলেট/একটা ছেলে ছুটছে...’। এ ধরনের হাহাকার মাখা রক্তাক্ত চিত্রাবলিলভ্য রাম বসুর ‘কানামাছি’ শীর্ষক হাড়হিম কবিতাটিতেও: ‘একটুও কাঁপে না হাত/ছোরা রড মলোটভ ককটেল/নিরুত্তাপ মুখ/দৃঢ় চোয়ালের হাড়/চোখে ছানি/...স্থাণু দৃশ্যপট/হাত একটুও কাঁপে না/শোরগোল নেই/কেবল কিঞ্চিত্ ধোঁয়া/শব্দ/অন্তিম চিত্কার/...আমি মানি জানি নে/ঘরের ছেলে মানি নে/কানামাছি ভোঁ ভোঁ/যাকে পাবি তাকে ছোঁ/...চোখে ছানি/হাতে ছোরা/রক্তাক্ত সময়/...মাটিতে লুণ্ঠিত লাশ/হিম দেহে জেগে আছে ছুরি/...নিভে যায় পড়শীদের সতর্ক জটলা/পুনরায়, কিছু পরে/সাজানো সংসার, সাজা, সিনেমা, বোনাস...’।

সৃজন সেনের দীর্ঘ কবিতা ‘থানাগারদ থেকে মাকে’ কবিতায় আবার মেলে জেলবন্দি আন্দোলনকর্মীর রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা ও আত্মদর্শনের আবেগমথিত খতিয়ান: ‘ওদের বিচারে মাগো দেশকে ভালোবাসাটা প্রচ্ল দেশদ্রোহিতা,/ওদের বিচারে শোষণমুক্তির জন্যে সংগ্রাম করাটা মারাত্মক ব্যভিচার,/শোষণের লৌহ-শৃঙ্খলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার কথাটা/ওদের বিচারে বে-আব্রু বে-আইন!/ওরা আজ তাই আমাদের হত্যা করছে/রাজপথে জনপথে ধানক্ষেতে মিলগেটে অলিতে গলিতে!/দেশকে ওরা বেঁধে ফেলেছে রাইফেল আর কার্ফুর চাবুকে!/কিন্তু সিসের বুলেট আর পৈশাচিক নিপীড়ন দিয়ে,/ইতিহাসের অগ্রগতিকে রুখতে চায় কোন আহাম্মকের দল?/কোন হিটলার আজ কলকাতার রাস্তায়?/শোষিতের প্রতিটি ঘর আজ বিপ্লবের দুর্গ/শোষিতের প্রতিটি হাতে আজ লাল পতাকার উল্লাস...’। সৃজন সেনের উল্লিখিত কবিতাংশে আবেগের প্রাবল্য ও বিপ্লবের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যই প্রধানত নজরে আসে। এর নেপথ্যের কারণ হিসেবে ওই সময় তথা সত্তর দশকের নিদারুণ উত্তাপ ও নকশাল আন্দোলনের দিকে তরুণদের আকৃষ্ট হওয়া— এ দুই ঘটনাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।  কবি-সম্পাদক অর্জুন গোস্বামী তখন লিখেছিলেন, ‘আমরা এমন কোনো কবিতা পড়তে চাই না, যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই, যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা হবে প্রকৃতই শোষিত শ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন, কবিতা হলো এমন একটা জিনিস, যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এ দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক।... স্লোগানই হলো সত্তর দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’ এ বক্তব্য কার্যত ওই সময়ের অনেক আন্দোলনকর্মী ও আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট তরুণেরই মনের কথা হয়ে উঠেছিল, এতে কোনো সংশয় নেই।

তাই বলে কি শিল্পসফল কবিতা নকশালবাড়ি আন্দোলন প্রসঙ্গে বা এর অনুষঙ্গে রচিত হয়নি? বিশেষ করে এ আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীদের দ্বারা? তা একেবারেই নয়। নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘সামন্তর বন্দুক উধাও’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক: ‘এই অন্ধকারে স্তনবৃন্তে দুধ আসে/মাঠের মধ্য দিয়ে আলো বয়ে নিয়ে আসে ট্রেন/শিশুর ঘুমের মধ্যে ট্রেনের অযুত শব্দ চলে গেল দূরে/দূরপাল্লার তারা ঘুরপাক খেয়ে খসে পড়ে/কী দাহ্য তার ঠোঁট/ বারুদ রেখেছে কেউ ঘরে/...ঐ জাগে/চাঁদের ছদ্মবেশে আশ্চর্য গোলক/উপবাস অন্তে তুমি অন্নের পিণ্ড হতে চাও/ জ্যোত্স্নায় কখনও কি তেজস্ক্রিয়া থাকে/...সামন্তর বন্দুক উধাও...’। নকশাল আন্দোলনে জড়িত থাকার দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন যে কবি, সব্যসাচী দেব, তার লেখায়ও পাই অসামান্য সাবলীলতা, সময় ও শিল্পের দাবি মিটিয়ে তার বিপ্লবমুখর সময়ের কবিতার সুর মনে গেঁথে যায়, যেখানে এক হয়ে যায় ফ্যাসিস্টদের হাতে নিহত লোরকা আর মৃত্যুমুখে ঢলে পড়া আন্দোলনকর্মী কবি সরোজ দত্তের দেশ-কাল-রক্ত: ‘আর গ্রানাদার রাস্তায় থেমে যায়/গুলিবিদ্ধ লোরকার গান;/ময়দানের সবুজের ওপর গড়িয়ে আসে/সরোজ দত্তের রক্ত;/পাহাড়ের ঢালে আলোকরেখার মতো কাঁপতে থাকে/সুব্বারাও পাণিগ্রাহীর শেষ কবিতা;/রৌদ্রের নিচে বেড়ে ওঠে রূপশালি ধান,/শিশু স্নান করে স্বপ্নের ঝর্ণায়...’ (‘কবির স্বদেশ’)।

নিহত কবিরা

উল্লেখ্য, কবি সরোজ দত্তকে ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কলকাতার বসন্ত রায় রোডের বাড়ি থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে ময়দানে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু সে কথা চেপে গিয়ে প্রশাসন গুজব রটিয়ে দেয়, তিনি আদতে নিখোঁজ হয়েছেন। এ কবি ‘কোনো বিপ্লবী কবির মর্মকথা’ শিরোনামের কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন: ‘গণ গগনের পথে অগ্নিরথে জনমানবেরে/যাহারা টানিয়া আনে তাহাদের সহকর্মী আমি।/আমার পাবে না দেখা আমার কাব্যের পৃষ্ঠপটে/সেথায় আমার সীমা অসংখ্যের অসীমে বিলীন,—/...কবরে প্রেতনী হয়ে কাঁদিবে না আমার বেদনা/দুঃসাহসী বিন্দু আমি, বুকে বহি সিন্দুর চেতনা।’

একই বছর একাধিক জেলখানায় নিহত হন নকশাল আন্দোলনকর্মী আরো চার কবি: দ্রোণাচার্য ঘোষ, তিমিরবরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় ও মুরারি মুখোপাধ্যায়। দ্রোণাচার্য ঘোষের প্রথম জীবনের কবিতায়ও সাম্যবাদের প্রতি তার ভালোবাসার কথা চোখে পড়ে। পাশাপাশি মানবিক সরল প্রেমের বয়ানও। পরে এ দুই বিষয়কেই তিনি মিলিয়ে নেন এভাবে: ‘শেষকে পাবার আশা নিয়েই আমার শুরু/যেমন শুরু করেছিলাম তোমাকে ভালোবাসা।/আমি জানি জয় আমাদের হবেই/আমাদের সংগ্রাম খেয়ালী মনের কল্পনা নয়,/তা কঠিন বাস্তব।/তাই এটাও আজ স্পষ্ট/ভালোবাসা আর বিপ্লব, বিপ্লব আর ভালোবাসা—/কেউ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।/বিপ্লবের জন্যই ভালোবাসা/ভালোবাসার জন্যই বিপ্লব।’ (‘কৃষ্ণার উদ্দেশ্যে কয়েক ছত্র’) আরো দৃঢ় কণ্ঠস্বর মেলে তার আরেকটি কবিতায়: ‘সেই হিংস্র চতুরতা ভেঙে দিয়ে চরম নির্দেশে/এবার বন্দুক তোলো; যেরকম বয়স আড়ালে/খুলে যায় লোকায়ত সময়ের সিঁড়ির কিনার/সাম্যবাদের রূপ খুঁজে পেতে দৃঢ়।/...আমাদের জন্মে শুধু অবিরাম শোষণের গ্লানি;/এখন সময় নেই চপল ছায়ায় বসে গল্পের আসর/এখন সময় নেই পান করি অসহায় চরিত্রের মদ/তীক্ষ বুলেটের মুখে বস্তুত এখন প্রয়োজন/ শ্রেণীশত্রু নিধনের কঠিন কঠোর এক দৃঢ় সংগঠন।’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিমিরবরণ সিংহ বহরমপুর জেলে পুলিশের অত্যাচারে নিহত হয়েছিলেন। তার শিক্ষক শঙ্খ ঘোষ ছাত্রজীবনেই তার মধ্যে দেখেছিলেন ‘রাজনৈতিক ভাবনার দৃঢ়তা’, যার কারণে একদিন তিনি নিজের শিক্ষককে বলেই বসেন, ‘এমএ পড়ছি না আমি। পড়ে কোনো লাভ নেই... আপনি জানেন আমি রাজনীতি করি... গ্রামে চলে যাচ্ছি... কোথায় থাকব, কবে ফিরব কিছুই ঠিক নেই।’ তিমিবরণ ওই সময়ে লিখেছিলেন, ‘ও পাগল, ও পথ তুই মাড়াসনে মাড়াসনে/ও পাগল, পাগলামি তুই ছাড়/ঘরে তোর মুমূর্ষু বোন/পাগলামি তুই ছাড়/বল তো/শহীদ হওয়া কি আমাদের পোষায়?’ (‘ও পাগল’)  ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু লাশ হয়ে। শঙ্খ ঘোষ ছাত্রের এ অকস্মাত্ বলিদানে লিখলেন: ‘ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়/দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ/তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?/নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই/তোমার ছিন্ন শির, তিমির।’ (‘তিমির বিষয়ে দু-টুকরো’)।

অমিয় চট্টোপাধ্যায় ছিলেন শ্রমিক নেতা। নকশালবাড়ি আন্দোলনের আগে অঞ্চল বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। পুরুলিয়ায় নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সংগঠিত করতে গিয়ে ধৃত হন। পরে আলিপুরের জেলে তিনি নিহত হন।  একটি কবিতায় তাকে দেখি চট্টগ্রাম বিদ্রোহ. নৌ-বিদ্রোহ ও তেলেঙ্গানা কৃষক বিপ্লবকে নকশালবাড়ির সঙ্গে এক করে সংগ্রামী প্রেরণা খুঁজতে: ‘যৌবনে, তুমি ছিলে ভয়ংকর বন্দরের শহরের গ্রামের শত্রুর কাছে/আমি জানি তুমি লাল ফুল ভালোবাস/তোমার বুকে চট্টগ্রামের লাল আগুন/তেলেঙ্গানার মানুষের অসীম লড়াইয়ের গাঁথা/নৌবিদ্রোহের কল্লোল এখনও বাজে তোমার বুকে/তুমি ভারতের ইতিহাস, আমাদের ঈর্ষা, যৌবনের আবেগ।’ (‘আমার প্রিয় কমরেডকে’)

মুরারি মুখোপাধ্যায় কবিতার পাশাপাশি গল্প ও কাব্যনাট্যও লিখতেন। হাজারীবাগ সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তার মাকে তিনি একটি চিঠি লেখেন, তাতে তিনি বলেছিলেন: ‘ওরা আমাদের জেলে পুরছে, হত্যা করছে, আরও অনেক কিছু করার কুমতলব আঁটছে, কিন্তু মূর্খ ওরা। তুমিও বলো হাত দিয়ে সূর্যের আলো ঠেকানো যায়?’ এ অবিচল অবিরাম আত্মবিশ্বাসের কথাই মেলে তার ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’ কবিতায়: ‘ক্রোধ ঘৃণা বলিষ্ঠতা ক্রমে ক্রমে হতে থাকে জমা/কলকাতা শ্রমিকের, কলকাতা জানে নাকো ক্ষমা/প্রতিজ্ঞা আগুন হয়ে গেল,/প্রতিশোধ স্প্রিন্টার ছড়ানো,/চতুর্দিকে লাল হ’ল বিজয়ের রক্তাক্ত নিশানে/কলকাতা কাঁদে নাকো, কলকাতা বদলা নিতে জানে।’

আন্দোলনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া: দূরবর্তী কবিদের কবিতায়

ঠিক নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ছিলেন না, কিন্তু সেই আন্দোলন ও সময়ের উত্তাপ নিজের মধ্যে ধারণ করে অনেক বিশিষ্ট কবিই তখন কবিতা রচনা করেছেন। এ রকম কয়েকটি কবিতার কথা দিয়েই এ জোড়াতালি মার্কা আলোচনার অন্তিম পর্যায়।  সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কবিতা ‘ছেলে গেছে বনে’ ধারার কবিতা অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে।  কবি এখানে যেন নিজেকে রামায়ণ কাহিনীর অক্ষম-অসহায় বৃদ্ধ রাজা দশরথ হিসেবে দেখিয়েছেন, আর অবিচারের কারণে বনবাসে যাওয়া দশরথপুত্র ন্যায়নিষ্ঠ অবিচল রামের রূপক দ্বারা উপস্থাপন করেছেন নকশাল আন্দোলনের টানে ঘর ছাড়া শত শত তরুণকে: ‘ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে/মুক্তির লড়াই লড়বে বলে/ছেলে গেছে বনে।/... পাবে না জেনেও কাল রাত-দুপুর বন্দুক উঁচিয়ে/দু’গাড়ি পুলিশ/সারা বাড়ি খুঁজে গেলে তন্ন তন্ন করে।/পেরিয়ে চল্লিশ/ যে আগুন প্রায় নিবন্ত, ওরা তুলছে আঁচ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে।/এখনও মিছিল গেলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াই রাস্তায়,/যে কোনো সভায় গিয়ে শুনি/কে কী বলে।/... আমার যখন এল বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়স—/ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে/ ছেলে গেছে বনে।/অথচ তারই হাতে দেখছি মুক্তপাখা/যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত/আমারই পতাকা।’

কবি ও সাংবাদিক কৃষ্ণ ধরের কবিতায়ও ধরা পড়েছে সত্তর দশকের রক্ত মাখা ঘটনার হাড় হিম চিত্রাবলি ও বিপ্লবের স্বপ্নভঙ্গের বেদনার্ত কথকতা: ‘মধ্যরাতে বারবার তিনবার কড়া নড়ে ওঠে/ঘুমন্ত দরজা জানালার সব স্বপ্ন ভেঙে যায়/রাত জেগে ওঠে আচমকা/মাঝরাতে একদিন সত্তর দশকে/গৃহবন্দী ছাড়া অন্য কোনো সঙ্গী ছিল না,/শুধু আড়চোখে দেখেছিল ফুটপাতের উলঙ্গ মানুষ/ শিকারকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে/অন্ধকারে মিলিয়ে যায় জল্লাদের গাড়ি/শহরের দেয়ালে দেয়ালে পরদিন দেখা যায় তারই কথা/সে নিদারুণ তৃষ্ণায় একবার জল চেয়েছিল/যে যন্ত্রণায় নীল হয়ে একবার ডেকেছিল মাকে/তবু স্বপ্নকে অক্ষত রেখেই সে/বধ্যভূমিতে গিয়েছিল/একদিন সত্তর দশকে।’ (‘একদিন সত্তর দশকে’)

সত্তরের দশকের ভাঙাগড়াময় আগুনে সময়কে যিনি ধারণ করেছিলেন সর্বতোভাবে, সেই কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ওই সময়ের শাসনযন্ত্রের সন্ত্রাস ও বিপ্লবীদের অবিচল প্রতিজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলেন বহু কবিতা। তার ‘নিহত কবির উদ্দেশ্যে’ কবিতাটি থেকে পড়া যাক কয়েকটি লাইন: ‘যারা এই শতাব্দীর রক্ত আর ক্লেদ নিয়ে খেলা করে/সেইসব কালের জল্লাদ/তোমাকে পশুর মতো বধ করে আহ্লাদিত?/নাকি স্বদেশের নিরাপত্তা চায় কবির হূিপণ্ড?/তবে শান্তি! কার শান্তি? হাজার কুকুর ঘোরে/দুর্ভিক্ষের নবাবী বাংলায়/গান গায় দরবারি কানাড়া, লেখে পোশাকী কবিতা—/তুমি মৃত! বহুদিন কবিতা লেখনি। বহুদিন/পরিছন্ন পোশাক পরোনি; ঘুরেছ উন্মাদ হয়/উলঙ্গের নিরন্নের দেশে— তাই মৃত— তুমি পোশাক ছেড়েছো তার অপরাধ...’।

পশ্চিম বাংলার গান্ধীনগরে সংঘটিত একটি ‘ফেক এনকাউন্টার’-এ কয়েকজন নকশালকর্মীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে মণিভূষণ ভট্টাচার্য রচনা করেছিলেন তার অসামান্য সংহত ও তীব্র কবিতা ‘গান্ধীনগরে এক রাত্রি’। এখানে মহাভারতে বর্ণিত নিরস্ত্র অভিমন্যুকে হত্যার কাহিনীর সঙ্গে ওই ঘটনাটিকে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন (সুভদ্রার উল্লেখ লক্ষ্যণীয়), এমনটা ধারণা করেছেন কোনো কোনো সাহিত্য-আলোচক। এ নাতিদীর্ঘ অথচ প্রবল অভিঘাতময় কবিতাটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করেই আজ ক্ষান্ত দিচ্ছি:  ‘গোকুলকে সবাই জানে, চিনে রাখেল ডি.আই.বি-র লোক/স্টেটসম্যান পড়ার ফাঁকে আড়চোখে গোকুলের মা/অন্ধকার ঘন হলে বলেছিল, ‘আর নয়, এবার ফিরে যা’—/ফেরার আগেই খাকি রঙের বিদ্যুত্ দরজায়/রিভলবার গর্জে ওঠে গর্জায় গোকুল/রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তা ঝুঁকে ছিঁড়ে নিলো এক খাবলা চুল/রাতকানা মায়ের চোখে কুরুক্ষেত্রে বেল্টের পিতল বুট,/জলস্রোতে নামে অন্ধকার,/শবচক্রমহাবেলা প্রশস্ত প্রাঙ্গণ,/পাথরে পাথরে গর্জে কলোনির সুভদ্রার শোক।/...উনুন জ্বলেনি আর, বেড়ার ধারেই সেই ডানপিটের তেজি রক্তধারা,/গোধূলিগগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা।...’

তথ্যসূত্র:

সত্তর দশক (দুই খণ্ড)— সম্পাদনা অনিল আচার্য। অনুষ্টুপ, কলকাতা।

নকশালবাদী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য— নির্মল ঘোষ। করুণা প্রকাশনী, কলকাতা।

এবং অন্যকথা: নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর বিশেষ সংখ্যা। সম্পাদক: বিশ্বজিত্ ঘোষ ও জলধি হালদার।

কবিতার মুহূর্ত— শঙ্খ ঘোষ। অনুষ্টুপ, কলকাতা।