রক্ষণে অটুট সংহতি, মাঝমাঠে রদ্রির নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণে লামিনে ইয়ামালদের নিরন্তর তৎপরতায় বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়েছে লা রোজারা। মিকেল ওয়ারজাবালের পেনাল্টির পর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। এ জয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন।

টেক্সাসের আর্লিংটনে ডালাস স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খেলতে থাকে স্পেন। প্রথম কয়েক মিনিট মাঝমাঠে সমানে-সমান লড়াই হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের দখল নিজেদের হাতে নেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের পাসিংয়ে মাঝমাঠে ছন্দ তৈরি হয়, আর দুই প্রান্তে ইয়ামাল ও অ্যালেক্স বায়েনা বারবার চাপ সৃষ্টি করেন ফরাসি রক্ষণে।

নবম মিনিটেই বক্সের একেবারে সামনে দানি ওলমোকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন আদ্রিয়েন রাবিও। সেই ফ্রি কিক থেকে অবশ্য গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্পেন। ১১তম মিনিটে বায়েনার শট ফরাসি দেয়ালে আটকে যায়। অন্যদিকে ফ্রান্সের আক্রমণগুলো শুরুতেই ভেঙে দিচ্ছিল স্প্যানিশরা। এমবাপ্পে বল পেলেই তার চারপাশের জায়গা সংকুচিত করে ফেলছিলেন রদ্রি, মার্ক কুকুরেয়া ও রবিন লে নরমাঁরা।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ২১তম মিনিটে। বক্সের ভেতরে একটি উঁচু বল নিয়ন্ত্রণে নিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় ইয়ামালকে সজোরে আঘাত করেন লুকাস দিনিয়ে। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হন ফরাসি ডিফেন্ডার। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। রিপ্লেতে বলটি ইয়ামালের হাতে সামান্য লাগতে দেখা গেলেও পরের মুহূর্তে দিনিয়ের স্পষ্ট ফাউলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

ফরাসি খেলোয়াড়েরা স্পট কিক নিতে কিছুটা বিলম্ব ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও মনঃসংযোগ হারাননি ওয়ারজাবাল। ২৩তম মিনিটে জোরালো শটে বল ডান দিকের ওপরের কোণে পাঠান তিনি। মাইক মাইনান সঠিক দিকেই ঝাঁপিয়েছিলেন, তবে শটের গতি ও উচ্চতার কাছে তার কিছুই করার ছিল না। টুর্নামেন্টে ওয়ারজাবালের পঞ্চম গোলে এগিয়ে যায় স্পেন।

এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবার পিছিয়ে পড়ে দৃশ্যতই বিচলিত হয়ে যায় ফ্রান্স। গোল হজমের কয়েক মিনিট পরই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় উইলিয়াম সালিবাকে। তার বদলে নামেন ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া। ফরাসি রক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে হারানো দিদিয়ের দেশমের দলের জন্য ছিল আরেকটি বড় ধাক্কা।

প্রথমার্ধে ব্যবধান দ্বিগুণ করার দারুণ সুযোগও পেয়েছিল স্পেন। ৩৯তম মিনিটে ইয়ামাল ও ওলমোর এক-দুই পাসে দৃষ্টিনন্দন আক্রমণ গড়ে ওঠে। ওলমোর ব্যাকহিল থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে ফাবিয়ান রুইসকে পাস দেন ইয়ামাল। কিন্তু ছয় গজ বক্সের কাছ থেকে রুইসের শট বাইরে চলে যায়। এর দুই মিনিট আগে ফ্রান্সের হয়ে বারকোলা বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়েছিলেন, তবে সেটিও ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে এমবাপ্পেকে একাধিকবার অফসাইডের ফাঁদে ফেলেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা। ৪৩তম মিনিটে অবশ্য ফরাসি অধিনায়ক রক্ষণ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বক্সের বাইরে ছুটে এসে নিখুঁত টাইমিংয়ে বল ক্লিয়ার করেন উনাই সিমন। ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়েই বিরতিতে যায় স্পেন।

বিরতিতে রাবিওর বদলে মানু কোনেকে নামিয়ে মাঝমাঠে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করেন দেশম। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ফ্রান্সকে আক্রমণ গুছিয়ে তুলতে দেয়নি স্পেন। প্রতিপক্ষের কেউ বল পেলেই কাছাকাছি থাকা দুই-তিনজন খেলোয়াড় তাকে ঘিরে ধরেছেন। সেই সমন্বিত প্রেসিংয়ে এমবাপ্পে ও দেম্বেলেরা বারবার জায়গা হারিয়েছেন।

৫৮তম মিনিটে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ পূর্ণতা পায় দ্বিতীয় গোলে। বক্সের প্রান্তে ওলমোর সঙ্গে এক-দুই পাস খেলেন পোরো। বল ফেরত পেয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে মাইনানের পাশ দিয়ে জোরালো শটে জাল খুঁজে নেন টটেনহাম ডিফেন্ডার। ওলমো পাস দেয়ার সময় ফাউলের শিকার হয়েছিলেন, তবে পোরো আক্রমণ শেষ করে দেয়ায় রেফারিকে আর বাঁশি বাজাতে হয়নি।

চার মিনিট পর ইয়ামালও বল জালে পাঠিয়েছিলেন। দিনিয়েকে কাটিয়ে ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁকানো শটে মাইনানকে পরাস্ত করেন স্প্যানিশ তরুণ। কিন্তু অল্পের জন্য অফসাইড থাকায় গোলটি বাতিল হয়। তবু মাঠে স্পেনের আধিপত্য এতটাই স্পষ্ট ছিল যে তৃতীয় গোলের সম্ভাবনাই তখন বেশি মনে হচ্ছিল।

দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আক্রমণে কিছুটা মরিয়া হয় ফ্রান্স। ৬৮তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে এমবাপ্পের শট কুকুরেয়ার গায়ে লেগে কর্নার হয়। এর পরপরই আরেকটি আক্রমণে তার ক্রস কাছের পোস্টে ঠেকিয়ে দেন সিমন। কিন্তু ফরাসিদের প্রতিটি প্রচেষ্টাতেই শেষ মুহূর্তে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্প্যানিশ রক্ষণ।

বারকোলার জায়গায় দেজিরে দুয়ে, পরে দিনিয়ে ও মাইকেল ওলিসের বদলে থিও হার্নান্দেজ ও রায়ান শেরকিকে নামান দেশম। তবু আক্রমণে প্রয়োজনীয় গতি কিংবা স্পষ্টতা ফেরেনি। বিপরীতে পেদ্রি, মিকেল মেরিনো, ফেরান তোরেস, নিকো উইলিয়ামস ও মার্কোস ইয়োরেন্তেকে নামিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করেন দে লা ফুয়েন্তে।

শেষদিকে দুয়ে ও হার্নান্দেজ কয়েকবার স্পেনের বক্সে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। ৮২তম মিনিটে সিমন গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে বল পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে না পারায় সুযোগ পেয়েছিলেন দুয়ে। কিন্তু পেছনে দৌড়ে ফিরে তার শট আটকে দেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক। মিনিটখানেক পর হার্নান্দেজকে ঠেকাতে গিয়ে মুখে আঘাতও পান সিমন, তবু খেলা চালিয়ে যান।

ফরাসিদের হতাশার প্রতীক হয়ে ওঠেন এমবাপ্পে। ৮৭তম মিনিটে সিমনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষে হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। দুই মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শট নিলেও বল অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। যোগ করা সময়েও ফ্রান্সের খেলায় প্রত্যাবর্তনের কোনো ইঙ্গিত ছিল না। বরং বল নিজেদের পায়ে রেখে নির্বিঘ্নে সময় কাটিয়েছে স্পেন।

শেষ মুহূর্তে নিকো উইলিয়ামস সরু কোণ থেকে আরেকটি শট নিলেও বল বাইরে যায়। তাতে স্পেনের উৎসব থামেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই নিশ্চিত হয়, ফ্রান্সের তারকাদের স্তব্ধ করে ২-০ গোলের দাপুটে জয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে লা রোহা। এখন শিরোপার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের বিজয়ী।