মডেলিং, ছোট পর্দা ও সিনেমা তিন মাধ্যমেই কাজ করেছেন অভিনেত্রী সায়রা আক্তার জাহান। এবার মঞ্চে অভিষেক হয়েছে তার। এক্টোম্যানিয়ার নতুন প্রযোজনা ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এ মরুকন্যা ফাতিমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। মঞ্চে অভিষেক, সাম্প্রতিক কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

সম্প্রতি মঞ্চে আপনার অভিষেক হলো, প্রথমবার মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

‘দি অ্যালকেমিস্ট’ দিয়ে মঞ্চে আমার অভিষেক হবে, সেটা কখনো চিন্তা করিনি। ফাতিমা চরিত্রটি সাহসিকতা ও ধৈর্যের প্রতীক। এ চরিত্রে মঞ্চে হাজির হওয়া আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। এছাড়া এমন একটি চরিত্র দিয়ে মঞ্চে কাজ শুরু করতে পেরেছি, এটা আমার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা।

প্রথমবার মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়ে নিজের অভিনয় সম্পর্কে নতুন কী উপলব্ধি হয়েছে?

সিনেমা, নাটক, ওয়েব ফিল্ম, মিউজিক ভিডিও বা বিজ্ঞাপন—সব মাধ্যমেই কাজ করেছি। কিন্তু মঞ্চ আমার জন্য একেবারেই আলাদা অভিজ্ঞতা। কারণ এখানে একজন অভিনয়শিল্পী নিজের অনেক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারে। সরাসরি দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, নিজের অভিনয় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। মঞ্চ একজন অভিনয়শিল্পীকে পরিণত করার সুযোগ দেয়।

অভিনয় থেকে কয়েক বছর দূরে ছিলেন, আবার ফেরার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

আমি দীর্ঘ সময় মিডিয়ায় কাজ করেছি। এর মধ্যে ভালো কিছু কাজও করেছি। আমার প্রথম সিনেমা ‘জন্মভূমি’ জাতিসংঘের সদর দপ্তর ও যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে দেখানো হয়েছে। এটি টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও গিয়েছিল। এসবের পর হঠাৎ করে কাজ ছেড়ে একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই এবং সেখানে কয়েক বছর কাজ করি। একটা সময় মনে হলো, আমি আমার নিজের জায়গাটাকে অনেক মিস করছি। অভিনয়টা আমি চাইলেই ছেড়ে দিতে পারব না। এটার সঙ্গে আমার একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়েছিল। সে ভাবনা থেকেই আবার অভিনয়ে ফেরা।

ফেরার পর কি মনে হয়েছে আগের সায়রার চেয়ে এ সায়রা অভিনেত্রী হিসেবে অনেকটাই আলাদা?

অবশ্যই। আমি মানুষ হিসেবেই অনেক বদলেছি, অনেক পরিণত হয়েছি। একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য এ পরিণত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি কাজ করেছি, আবার ছেড়ে দিয়েছি, পরে ফিরে এসেছি। এ পুরো অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবনের এ অভিজ্ঞতাগুলো অভিনয়ের ক্ষেত্রেও কাজে লাগে।

বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

শুধু অভিনয়শিল্পী হিসেবে নয়, যেকোনো ইন্ডাস্ট্রিতে এখন কাজ করে টিকে থাকাটা কঠিন। কারণ আমরা খুব দ্রুতগতির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আজকের সময়ে মানুষের চোখের সামনে না থাকলে একসময় আড়াল হয়ে যেতে হয়। তাই কাজের মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে একটা সংযোগ ধরে রাখা জরুরি।

নতুনদের ভালো অভিনয় জানার পাশাপাশি আর কী কী করা দরকার?

শুধু অভিনয় করলেই হয় না, নিজের কাজের প্রচারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য প্লাটফর্মে সক্রিয় থাকাটাও এখন ক্যারিয়ারের অংশ হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য একটা ইমেজ তৈরি করে রাখতে হয়। অন্যথায় অনেক সময় মানুষ সেটা গ্রহণ করে না। আবার বিভিন্ন কাজ বা বাণিজ্যিক কাজের মাধ্যমে দর্শকের সামনে দৃশ্যমান থাকাটাও প্রয়োজন।

‘আরারাত’-এ নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রটি কি আপনার অভিনয়ের এমন কোনো দিক সামনে এনেছে, যেটা এর আগে দর্শক দেখেনি?

এটা আমার জন্য খুবই ভিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল। আরারাতের আগে আমি যেসব চরিত্র করেছি, সেগুলো বেশ স্বাভাবিক, সরল, প্রাণবন্ত ও নিরীহ ধরনের ছিল। কিন্তু আরারাত যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌতিক ধরনের গল্প, সেখানে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করাটা আমার জন্য বেশ মজার ছিল।

এ ধরনের চরিত্র সবসময় পাওয়া যায় না। ভিকি ভাই যখন জিজ্ঞেস করেছিল এ ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে পারব কিনা, তখন আমার মনে হয়েছিল ঝুঁকিটা নেয়া উচিত। একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে পরীক্ষা করাটা জরুরি।

নির্দিষ্ট ইমেজ ভেঙে অন্য ধরনের চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করা কতটা কঠিন?

এটা একটু কঠিন। আরারাতের চরিত্রটি করার পর অনেকেই বলেছে, ‘এটা তো তুমি নও, তুমি তো অনেক নিরীহ, তোমার চরিত্রগুলো অনেক সরল।’ তখন বুঝেছি, দর্শক একজন অভিনয়শিল্পীকে প্রথম যেভাবে দেখে, সে ইমেজই তাদের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে যায়।

তবে একজন শিল্পীর জন্য এ পরিচিত ইমেজের বাইরে গিয়ে কাজ করা দরকার। দর্শকের কাছে পরিচিত একটি চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো চরিত্রে যাওয়া সহজ নয়, কিন্তু এ পরিবর্তনের মধ্যেই অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে প্রকাশের সুযোগ থাকে।

যারা নতুন কাজ করছেন, তাদের কি বর্তমানে পছন্দের কাজ বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে?

অভিনেতার হাতে নিজের পছন্দের কাজ বা চরিত্র বেছে নেয়ার সুযোগ থাকা আসলে খুবই বিরল। একটি প্রকল্প তৈরি হলে পরিচালক, লেখক ও পুরো একটি দলের মাধ্যমেই কাজটা তৈরি হয়। সিনেমার প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তখন হয়তো নিজের চরিত্র বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে। অন্যথায় এটা বেশ কঠিন।

আপনার কাছে একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের মাপকাঠি কী?

আমি বলব, হাল না ছেড়ে কাজ করে যাওয়া এবং কাজের প্রতি নিবেদিত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এতে একজন মানুষ বা অভিনেত্রী অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। একজন অভিনয়শিল্পীকে নিজের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হয়। আমার কাছে এ ধারাবাহিকতাই গুরুত্বপূর্ণ।

এতদিনের পথচলায় সায়রাকে অভিনেত্রী হিসেবে এখনো কোন জায়গায় আবিষ্কার করা বাকি?

বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, একটু ভাগ্য ও মানুষের ভালোবাসাও লাগে। সব মিলেই একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে। আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে আরো কাজ করতে চাই, আরো নতুন চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করতে চাই।