চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, শিক্ষক ও গবেষক মতিন রহমান। ‘লাল কাজল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর বাণিজ্যিক ধারার বেশ কয়েকটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে বাংলা সিনেমার নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্রের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
‘সিনেমার স্বর্ণযুগের জন্য আমাদের এখনো অপেক্ষা করতে হবে’
চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, শিক্ষক ও গবেষক মতিন রহমান। ‘লাল কাজল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর বাণিজ্যিক ধারার বেশ কয়েকটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে বাংলা সিনেমার নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। বর্তমান চলচ্চিত্রের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন মতিন রহমান।
দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে সময়ের সঙ্গে সিনেমায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?
সিনেমা একটা সাংস্কৃতিক উপাদান, যেটাকে আমরা বিনোদন ও শিল্প হিসেবে দেখি। রাষ্ট্র সিনেমা বা সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখে, কতটা গল্প বলার স্বাধীনতা দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে কতটা উৎসাহিত করে—তার ওপর সিনেমার চেহারা বদলের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে গল্পও বদলেছে। একটা সময় পরিবার, সম্পর্ক ও সংগ্রাম নিয়ে সিনেমার গল্প হতো, এখন সেখানে সমাজ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। প্রযুক্তিরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক, এরপর রঙিন চলচ্চিত্র—এভাবে সময়ের সঙ্গে সিনেমার প্রযুক্তি বদলেছে। এখন এআইও সেই প্রযুক্তির অংশ হয়ে উঠেছে।
আপনার সময়ে প্রযোজকের পছন্দ অনুযায়ী নায়ক-নায়িকা নির্বাচন করে সিনেমা বানানোর চাপ কতটা ছিল?
আমি বাণিজ্যিক ছবি নির্মাতা, সবসময় পুরো স্বাধীনতা পাইনি। বিশেষ করে শাবানা নিজে অর্থায়ন করলে চাইত, তার ছবিতে সে-ই নায়িকা থাকুক। তবে এ বাধ্যবাধকতার মধ্যেও পরিচালককে নিজের মতো করে বানানোর স্বাধীনতা দেয়া হতো, শুধু তার প্রতি একটু বিশেষ যত্ন নিতে হতো। আবার যেসব প্রযোজক শুধু নায়িকা নির্বাচন করে দিতেন, সেখানেও আমি পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের আস্থা ছিল যে নির্দিষ্ট নায়িকা ও বাজেট দিয়ে আমি আন্তরিকভাবে ছবিটা বানাতে পারব।
সরকারি অনুদান পাওয়ার পর অনেক সিনেমা সময়মতো নির্মাণ ও মুক্তি পায় না। এক্ষেত্রে কী ধরনের তদারকি থাকা দরকার বলে মনে করেন?
অনুদানের অর্থে সিনেমা তৈরি হয় না—এটা ঠিক নয়। সরকার যদি ৬০ লাখ টাকা অনুদান দেয়, তাহলে সেই অর্থের মধ্যে সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। ৬০ লাখ টাকা দিয়ে ‘বাহুবলী’ বানানো সম্ভব নয়। এ ধরনের বড় বাজেটের সিনেমার জন্য আলাদা অর্থায়ন খুঁজতে হবে। তবে অনুদানের অর্থে সিনেমা ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে কিনা, বাজেট অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা এবং ছবির মান ঠিক আছে কিনা—এসব দেখার জন্য মনিটরিং সেল থাকা দরকার। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা বলে আসছি, নির্মাণ প্রক্রিয়ায় তদারকি থাকলে অনুদানের অর্থে ভালো ছবি তৈরি করা সম্ভব।
এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
পরিচালক হিসেবে কাজ শুরুর আগে আমার ওস্তাদ ও মামা আজিজুর রহমান আমাকে পরিচালক হিসেবে যোগ্য মনে করেননি। পরে আজিজুর রহমান আমাকে প্রতিদিন শুটিং শেষে এটিএম শামসুজ্জামানের বাসায় যেতে বলেন। প্রায় এক বছর তার বাসায় যাওয়া, বই পড়া ও আড্ডার মধ্য দিয়ে এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তার চারপাশে সবসময় বই থাকত। তিনি আমাকে বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। সেখানে বই, সিনেমা ও নানা বিষয় নিয়ে আমাদের আড্ডা হতো।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আমাদের সিনেমায় কতটা তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কবে শেষ হয়েছে? অথচ এখনো সেই যুদ্ধ নিয়ে সিনেমা তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সত্যতা পর্দায় প্রকাশের সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি, আজকে যেটা হচ্ছে না, আগামী দিনে সেটা হবে। যেমন করোনা মহামারী শেষ হওয়ার পরও সেই সময়ের গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও অজস্র গল্প আসবে, অজস্র নির্মাতা আসবেন। হয়তো একদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের আসল চেহারার ছবি পাব। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
সত্তর ও আশির দশককে আপনি সিনেমার ‘স্বর্ণযুগ’ না বলে ‘জাগরণের যুগ’ বলেন কেন?
‘স্বর্ণযুগ’ বললে একটা সিলমোহর পড়ে যায়। এর মানে দাঁড়ায়, এরপর আর কোনো যুগ আসবে না, এটাই শেষ। অথচ সত্তর-আশির দশকে অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে, অনেক তারকা ও পরিচালক এসেছেন, সিনেমা হল বেড়েছে, লেখকরাও কাজ করেছেন। তাই এটাকে ‘স্বর্ণযুগ’ না বলে ‘জাগরণের যুগ’ বলা ভালো। কারণ স্বর্ণযুগের জন্য আমাদের এখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
সত্তর-আশির দশকের পর বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতার প্রবণতা তৈরির পেছনে কী কারণ ছিল?
এটা ছিল বাংলা সিনেমার একটি খারাপ সময়। তখন নির্মাতারা ভাবলেন, সিনেমায় কিছু উপাদান যোগ করলে অনেক লাভ হবে, দর্শক দেখবে। যেমন খাবারে ভেজাল মেশালে একসময় মানুষ অসুস্থ হয়, সিনেমাতেও তেমনটা হয়েছে। অশ্লীল উপাদান যোগ হতে হতে দর্শকের রুচিতেও তার প্রভাব পড়েছে এবং অনেকে সিনেমা থেকে দূরে সরে গেছে। যারা মানুষের সম্পর্ক ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয় না, তারাই সিনেমায় নানা কিছু মিশিয়ে দেয়।
আপনি সবসময় বলেছেন, আমাদের চলচ্চিত্রের সংকট আসলে গল্পের সংকট। অথচ আমাদের এত উপন্যাস, লেখক, ইতিহাস এবং চারপাশে অসংখ্য বাস্তব ঘটনা আছে। তাহলে গল্পের সংকটটা কোথায়?
গল্প বলতে আমি সাহিত্য, কোর্টের ফাইল, দৈনিক পত্রিকার খবর—সবকিছুকেই বুঝি। মানুষের জীবন দেখাটাও একটা গল্প। আমাদের চারপাশে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এসব ঘটনার পর যদি আপনি-আমি প্রতিক্রিয়া না দেখাই, তাহলে আমি নির্মাতা নই। আমার কাছে গল্পের অভাবই। কারণ আমি জীবনই দেখছি না, প্রতি মুহূর্তে যা ঘটছে তা শুনতেও চাইছি না। তাহলে গল্প পাব কোথায়? গল্প তো আছে, হাজার-লাখ গল্প আছে। কিন্তু আমি যদি গবেষণা না করি, তাহলে সেই গল্প পাব কোথায়?
আমাদের চলচ্চিত্রে বিদেশী সিনেমার কপি করার প্রবণতা কীভাবে তৈরি হলো?
একটা কারণ হলো, রেডিমেড একটা গল্প পাওয়া মানে সেটি আগে কোথাও ভালো ব্যবসা করেছে। তাই ওই গল্প বা প্যাটার্ন কপি করে সিনেমা বানানো নির্মাতার জন্য সহজ। আরেকটা হলো, নির্মাতাকে তো গল্প খুঁজতে হবে। গল্পের অভাব নেই, হাজার-লাখ গল্প আছে। কিন্তু নির্মাতা যদি গবেষণা না করেন, মানুষের জীবন ও চারপাশের ঘটনাগুলো না দেখেন, তাহলে গল্প পাবেন কোথায়? তাই সহজ পথ হিসেবে অনেকে রেডিমেড গল্প বা প্যাটার্নের দিকে যান।
আপনার সিনেমায় নারী চরিত্রগুলোর নাম অনেক সময় ‘নদী’ এবং পুরুষ চরিত্রের নাম ‘সাগর’ হয়। এর পেছনে কি কোনো বিশেষ ভাবনা কাজ করে?
সিনেমার নাম ও চরিত্রের নামের একটা ব্যাখ্যা থাকে। গল্পের ভাব, অনুভব থেকেই নামগুলো আসে। যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ গল্পের নামেরও একটা অর্থ আছে, আবার চরিত্রটির নাম ‘বিনোদিনী’ কেন রাখা হয়েছে, তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। ‘নদী’ নামটাও রূপকধর্মী। নদীর ধর্মই হলো বয়ে যাওয়া। দুই কূলকে স্পর্শ করে সে চলে যাবে, কারো জন্য থামবে না। একসময় সাগরে তার পতন বা নিমজ্জন হবে। আমার প্রেমের ছবিতেও ওই ধরনের গল্প সাজানো আছে—সে সবকিছুকে স্পর্শ করে একসময় সাগর, অর্থাৎ নায়কের সঙ্গে তার মিল হচ্ছে। কিন্তু সমাজ, পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। প্রেমের ছবির জন্য হয়তো এভাবেই ভাবনাটা এসেছে।
সম্প্রতি নাটক, সিনেমায় প্রেমের দৃশ্য দেখানো যাবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। প্রেম ছাড়া কি সিনেমা করা সম্ভব?
পাকিস্তানে তো হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন আমি এখানে বসে আছি, আপনি আমার পেছনে বসে গল্প করছেন, কথা বলছেন—এটাও প্রেমের দৃশ্য হতে পারে। পাকিস্তানের সেন্সর বোর্ড একসময় এ ধরনের বিষয় করেছিল, এখন আবার পরিবর্তন হচ্ছে। এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এগুলো একটা সংস্কৃতির ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সূচনা। এটা কখনই কাম্য নয়।
প্রেম বলতে আমরা আসলে কোন ধরনের প্রেমকে বোঝাচ্ছি? প্রেমের ধারণাটা কি শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
প্রেম শব্দটাকে আমরা এত জটিল করে ফেলি কেন? রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ভেতরে শিশুর প্রেম আছে। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এর মধ্যেও ভালোবাসা আছে। সৃষ্টিকর্তা প্রেমের কারণেই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। প্রেমের ব্যাপ্তি অনেক বড়।
তোমাকে চাই সিনেমায় সালমান শাহর নামও ছিল সাগর। সালমান শাহ সম্পর্কে আপনার স্মৃতি ও মূল্যায়ন জানতে চাই।
সালমান খুবই দুরন্ত একটা ছেলে ছিল। মিশুক ও আন্তরিক। সামাজিক জীবনে যেমন আন্তরিক তেমনি শুটিংয়েও। পরিচালক কী চাইছেন সেটা সে বুঝতে চেষ্টা করত। ‘ইউনিট ফ্রেন্ডলি’ বলে একটা কথা আছে, সে তেমন ছিল। কাজটা শতভাগ ভালো করার বিষয়ে মনোযোগী ছিল। তাই কখনো হয়তো পরিচালক যা চাইছেন তার চেয়েও ভালো কাজ হতো। এ কারণেই সাধারণ মানুষ থেকে সালমান আলাদা।
অনেক সময় শোনা যায় দ্রুত খ্যাতি পেয়ে অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন। সেটে দেরি করতেন। তারকাখ্যাতির অহংকার তার মধ্যে কতটা ছিল?
এ ধরনের কথা প্রচলিত, আমরা জানি। তবে এসব নিয়ে কথা বললে আসলে শিল্পীকে অবমাননা করা হয়। সালমান আজ জনপ্রিয়, কারণ সে তার সেরা সময়টা রেখে গেছে। আবার তার তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তার পেছনে সহশিল্পী, পরিচালকদেরও অবদান আছে। যে অহংবোধের জন্ম হচ্ছিল তা কতদূর যেত, সে অহংবোধ সালমানকে এখন অবধি বাঁচিয়ে রাখত কিনা তা এখন বলা যায় না।










