ইংল্যান্ডের দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে বড় হন স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তরুণ বয়সে মঞ্চে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের চরিত্রগুলো ধারণ করে সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে ‘স্টার ট্রেক’ ও ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা। বিখ্যাত এ ব্রিটিশ অভিনেতা মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। খবর রয়টার্স।

লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে প্যাট্রিকের মৃত্যু হয়েছে বলে গতকাল তার এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, গতকাল লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। প্রিয় স্ত্রী সানির স্নেহপূর্ণ সান্নিধ্যে তিনি শেষ সময় কাটিয়েছেন। আলঝেইমার রোগ ও লুই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর সংক্ষিপ্ত কিন্তু বেদনাদায়ক সময়ের মধ্য দিয়ে তার জীবনাবসান হয়েছে।’

নাট্যকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৮ বছর বয়সে অভিনয়জীবন শুরু করেন তিনি। ষাটের দশক থেকে রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানির সদস্য হিসেবে মঞ্চে অভিনয় করেন, অর্জন করেন প্রশংসাও। তবে মূলধারার দর্শকদের কাছে তার পরিচিতি আসে ৪৭ বছর বয়সে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এ অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পর। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত প্রচারিত সিরিজটি ষাটের দশকের মূল ‘স্টার ট্রেক’-এর ধারাবাহিকতা হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।

সিরিজে পিকার্ডের মুখে নির্দেশ বাস্তবায়নের আদেশ হিসেবে প্রায়ই শোনা যেত, ‘মেক ইট সো’। কখনো কখনো তিনি বলতেন, ‘এনগেজ’।

শুরুতে অবশ্য চরিত্রটি গ্রহণ করা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন স্টুয়ার্ট। তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহ-অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেন ‘স্টার ট্রেক’-এ অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মঞ্চনাটকেই মনোযোগী থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরিত্রটি গ্রহণ করেন স্টুয়ার্ট। হয়ে ওঠেন সিরিজটির অন্যতম জনপ্রিয় মুখ এবং লাভজনক সায়েন্স ফিকশন ফ্র্যাঞ্চাইজির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাত মৌসুমে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এর ১৭৬টি পর্বে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি একাধিক ‘স্টার ট্রেক’ চলচ্চিত্র এবং ২০২০ সালে ৭৯ বছর বয়সে শুরু হওয়া স্ট্রিমিং সিরিজ ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’-এও অভিনয় করেন।

২০২২ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে স্টুয়ার্ট বলেছিলেন, ‘দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এর সাতটি মৌসুম যত এগিয়েছে, জ্যাঁ-লুক পিকার্ড ও প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মধ্যকার পার্থক্য ততই কমেছে। একসময় চরিত্রটি কোথায় শেষ হয়েছে আর তিনি কোথায় শুরু হয়েছেন, তা আলাদা করে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের বিশ্বাস ও অনুভূতির অনেক কিছুই তিনি ওই সিরিজে ঢেলে দিয়েছিলেন বলে জানান।

‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা মিউট্যান্টদের নেতা প্রফেসর এক্সের চরিত্রেও শুরুতে অভিনয় করতে চাননি স্টুয়ার্ট। জনপ্রিয় মার্ভেল কমিকসের চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। তার ধারণা ছিল, এটি ‘স্টার ট্রেক’-এর মতোই আরেকটি ফ্যান্টাসিনির্ভর কাজ হবে।

দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বলেছিলাম, এটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি না হলেও ফ্যান্টাসি, আর এ ধরনের কাজ আমি আগেও করেছি। কিন্তু তারা আমাকে বোঝান, এটি “স্টার ট্রেক”-এর মতো হবে না। তাই রাজি হই। আবারো দেখা গেল, আমার ধারণা ভুল ছিল।’

patrick_stwert_reuters

প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। ছবি: রয়টার্স

২০০০ সালে প্রথম ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আরেকটি বড় বাণিজ্যিক ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশ হন স্টুয়ার্ট। পরে সিরিজটির আরো কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এসব চলচ্চিত্রের কয়েকটিতে ম্যাগনেটো চরিত্রে অভিনয় করেন ইয়ান ম্যাককেলেন। ২০২২ সালের মার্ভেল চলচ্চিত্র ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’-এও দেখা গেছে তাকে।

মৃত্যুর আগে বহুল প্রতীক্ষিত মার্ভেল চলচ্চিত্র ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’র শুটিংয়েও অংশ নিয়েছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। আগামী ডিসেম্বরে মুক্তির কথা রয়েছে চলচ্চিত্রটির। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে মার্ভেল স্টুডিওস এক বিবৃতিতে অভিনেতাকে ‘অনন্য প্রতিভা, উদার সহকর্মী এবং প্রকৃত ভদ্রলোক’ বলে অভিহিত করেছে।

১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠা তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফেরার পর তার বাবা মদ্যপ হয়ে পড়েন। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসজনিত সমস্যায় ভুগতেন এবং স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। মাকে রক্ষা করতে একসময় বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর স্মৃতিও পরে জানিয়েছেন প্যাট্রিক।

১২ বছর বয়সে এক শিক্ষকের হাত ধরে শেক্সপিয়ারের ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের ভাষায়, অভিনয় তার কাছে হয়ে উঠেছিল এক ধরনের ‘নিরাপদ আশ্রয়’। ১৭ বছর বয়সে চুল পড়তে শুরু করে এবং ১৯ বছর বয়সের মধ্যেই পুরোপুরি টাক হয়ে যান তিনি। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে বিব্রত থাকলেও পরে নিজের এই চেহারাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন।

জিন রডেনবেরির নির্মিত ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজে মহাকাশযানে চড়ে আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগতিতে মহাকাশ ভ্রমণ এবং ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের এক আশাবাদী ভবিষ্যৎ তুলে ধরা হয়েছিল। মূল সিরিজের জনপ্রিয়তা ও চলচ্চিত্রগুলোর সাফল্যের পর এর ধারাবাহিকতা হিসেবে ‘দ্য নেক্সট জেনারেশন’ নির্মাণ করেন রডেনবেরি।

মূল সিরিজের ক্যাপ্টেন জেমস টি কার্কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উইলিয়াম শ্যাটনার। তার তুলনায় পিকার্ড ছিলেন অনেক বেশি চিন্তাশীল ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। তবে কখনো কখনো তাকে অতিরিক্ত গম্ভীর, রসবোধহীন কিংবা আত্মগুরুত্বপূর্ণ মনে হতো।

সিরিজের প্রথম দিকে সহশিল্পীদের সঙ্গে কিছুটা কঠোর আচরণ করার কথাও স্বীকার করেছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। ২০২৩ সালে দ্য নিউ ইয়র্কারকে তিনি বলেছিলেন, একবার সহশিল্পীদের নিয়ে বৈঠকে সেটে অতিরিক্ত হাসিঠাট্টা বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছিল, কাজের সময় সবাইকে আরো শৃঙ্খলাপরায়ণ ও মনোযোগী হতে হবে।

তখন এক সহশিল্পী তাকে বলেছিলেন, ‘আরে প্যাট্রিক, আমাদের তো একটু আনন্দও করতে হবে।’ জবাবে তিনি চেয়ার চাপড়ে বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে আনন্দ করতে আসিনি।’ পরে সহশিল্পীরা দীর্ঘদিন তাকে কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছেন। প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট স্বীকার করেছিলেন, তাদের কাছ থেকেই অনেকটা সহজ হতে এবং মুক্তভাবে কাজ করতে শিখেছেন তিনি।

প্রথম দুই মৌসুমে পিকার্ড চরিত্রে নিজের অভিনয় নিয়েও সন্তুষ্ট ছিলেন না স্টুয়ার্ট। তার মতে, চরিত্রটিতে কর্তৃত্ব ছিল, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ও আবেগের প্রকাশ ছিল কম। পরবর্তী মৌসুমগুলোয় অভিনয় আরো পরিণত হয়েছে বলে মনে করতেন তিনি। শেষের দুই পর্বের সময়-নির্ভর গল্পকে সিরিজটির সব অভিনয়শিল্পীর অন্যতম সেরা কাজ বলেও মনে করা হয়।

২০১০ সালে বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে নাইট উপাধি গ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ অভিনেতা লরেন্স অলিভিয়ে, জন গিলগুড ও অ্যালেক গিনেস ছিলেন তার আদর্শ। তাদের মতো একই স্বীকৃতি পাওয়া পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিয়ে করেছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তার দুই সন্তান রয়েছে। ২০১৩ সালে মার্কিন সংগীতশিল্পী সানি ওজেলকে বিয়ে করেন তিনি।