ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশাকে গত বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় তার এ মনোভাব জানান। বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোরে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে আইটিভি।
জয় বলেন, ‘আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করি—তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল; জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়ে জয় বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। মূলত এমনভাবে সাজানো একটি নির্বাচন হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব সংসদে পায়। এটি টেকসই হবে না। ভবিষ্যতে আরো অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ—এমন নির্বাচনকে কীভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যায়? যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লেবার পার্টির যেকোনো একটি দল নিষিদ্ধ করা হতো, সেটার সমতুল্য পরিস্থিতি এটি। একে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় না। অনির্বাচিত একটি শাসন ব্যবস্থার নির্দেশে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা নজিরবিহীন ঘটনা।’
আওয়ামী লীগের শাসনামলেই যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মাহাথির পাশা তখন প্রশ্ন করেন, বিষয়টি কীভাবে নজিরবিহীন হয়?
জয় তখন দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আদালতের রায়ের কারণে। জামায়াত তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারত।
বাংলাদেশের আদালত প্লট দুর্নীতির মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়কেও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি দেশে ফিরবেন কিনা, জানতে চাইলে জয় বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে থাকি না। আমার পুরো জীবনে মোট সাত বছর বাংলাদেশে কাটিয়েছি। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।’
বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে জয় বলেন, ‘অবশ্যই একসময় ফিরব। দেখুন—তারেক রহমান, যিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।’
শেখ হাসিনা কখনো বাংলাদেশে ফিরবেন কিনা, সেই প্রশ্নে জয় বলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একদিন ফিরবেন।’
তারেক রহমান বলেছেন, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির পথে যেতে চান না। সে কথা মাথায় রেখে জয় কি তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন?—এ প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘এটা আমার হাতে নেই; আমি দেশে থাকি না। এটা পুরোপুরি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়—তারা কী করতে চায়, সেটি তারাই ঠিক করবে। বিএনপি বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল। অবশ্যই তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত; আমি সবসময়ই সেটা বলে এসেছি। বিএনপির কখনই নির্বাচন বর্জন করা উচিত হয়নি। আমি বলছি, এবারের নির্বাচনটি ভুয়া, তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।’
জাপা কোনো আসন পায়নি এটা অবিশ্বাস্য: বিবিসিকে জয়: এদিকে বিবিসির নিউজ আওয়ার অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) কোনো আসন না পাওয়া এবং জামায়াতের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেছেন, ‘বৃহত্তম ও পুরনো একটি দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রগতিশীল দলগুলোকে নিষিদ্ধ না করলেও তাদের কোনো সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। তাদের অনেক নেতাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল (জাপা) কোনো আসন পায়নি এটা অবিশ্বাস্য।’
জামায়াতে ইসলামী জোটের ফল নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘জামায়াত যেখানে সাধারণত ৫-১০টার বেশি আসন পায় না, সেখানে তারা প্রায় ৮০টি আসন পেয়েছে, সুতরাং এটা প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন ছিল না।
আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে তিনি বিএনপির সঙ্গে কথা বলতে রাজি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত আছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হলো যুক্তরাজ্যে টোরি ও লেবার পার্টির মতো। যেখানে এ দুই দল ছাড়া রাজনীতি কল্পনা করা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘সবাই হয়তো খুশি যে একটি নির্বাচন হয়েছে। মধুচন্দ্রিমা শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সব সময় একটি ফ্যাক্টর হিসেবে থাকবে। আমাদের ৪০ শতাংশ ভোট আছে। জাতীয় পার্টির রয়েছে আরো ৫ থেকে ১০ শতাংশ, সুতরাং তাদেরকেও সারা জীবন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।’










