দেশের অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় কয়েক গুণ। এগুলোর মধ্যে আবার অধিকাংশই রুগ্ণ। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া বাকি সবগুলোই দুর্দশাগ্রস্ত। সরকার নানা উপায়ে এসব ব্যাংক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাত পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। অথচ বাজারের নিয়ম মানলে এসব ব্যাংক অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে যেত। ব্যাংক খাত সংস্কার করতে চাইলে ব্যাংকের জট কমানো দরকার। প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সুপরিচালনযোগ্য ব্যবস্থায় নিয়ে আসা দরকার।
গতকাল ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের গণমাধ্যম সহযোগী বণিক বার্তা।
দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমরা যদি বাজারের নিয়ম মেনে চলতাম, তবে এসব ব্যাংকের অধিকাংশই এত দিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু আমরা নানা উপায়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। এসব চেষ্টা ওই ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা আমার জানা নেই।’
রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি এবং দুর্বল ‘কর-জিডিপি অনুপাত’-এর কারণে ব্যাংক খাত পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার কারণে ব্যাংক খাত এখন পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে এবং “ক্রাউডিং আউট” সংকট তৈরি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের নিয়মিত ঋণ নেয়ার এ প্রবণতা এবং ভবিষ্যতে সে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে বড় লাল সংকেত বা সতর্কবার্তা দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের আস্থা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তবে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ব্যাংক খাতেও কিছু ভালো ব্যাংক বা সৎ মানুষ রয়ে গেছে, যাদের আদর্শ বা নির্দেশক হিসেবে সামনে রেখে এ খাতের প্রকৃত করণীয় নির্ধারণ করা সম্ভব।’
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘ব্যাংক খাতের বর্তমান বেহাল দশা বা খেলাপি ঋণের প্রকোপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সামগ্রিক রোগ বা সিস্টেমের এক একটি “উপসর্গ” বা “সিনড্রোম” মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও একই সঙ্গে সর্বগ্রাসী সংকটে আক্রান্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র এবং রাজনীতি আজ গুটিকয়েক প্রভাবশালী ধনী বা “অলিগার্কদের” স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এ সংকটের মূল শেকড়।’
তিনি বলেন, ‘দেশ এক বিশাল সমস্যায় নিমজ্জিত, যা কাটিয়ে উঠতে সময় ও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। রাতারাতি কোনো জাদুকরী সমাধান বা অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। কারণ অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক সংশোধন এবং ব্যাংকার-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীর অনৈতিক চক্রের অবসান ঘটানো জরুরি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ইচ্ছাকৃত অনিয়ম এবং দুর্নীতি দূর করতে সামাজিকভাবে দুষ্কৃতকারীদের প্রতি ঘৃণা ও অনাস্থা প্রদর্শনের মাধ্যমেই কেবল সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-ই-খুদা। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যা: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সমাধান শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাংক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এলেও খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, অর্থ পাচার এবং ব্যাংকারদের নিম্ন উৎপাদনশীলতার মতো চ্যালেঞ্জের কারণে ব্যাংক খাতের সম্ভাবনা পুরোটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব, নমনীয় নীতিমালা, বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এ অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণকে আরো উসকে দিয়েছে।’
পারিবারিক পরিচালকদের আধিপত্য ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের দক্ষতার অভাব ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করেন বরকত-ই-খুদা। তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতে অনেক কাঠামোগত সংকট রয়ে গেছে। পারিবারিক পরিচালকদের আধিপত্য ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের দক্ষতার অভাব ব্যাংক খাতের সুশাসনে মারাত্মক সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) রেকর্ড ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংক খাত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে মাত্র ১০টির মতো ব্যাংক ভালো পারফর্ম করছে, অন্যদিকে বাকি ব্যাংকগুলোয় চরম সংকট তৈরি হয়েছে।’
ব্যাংক খাতের এ পরিস্থিতি উত্তরণে বেশকিছু কাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে কৌশলগত কাঠামোর অধীনে আর্থিক খাতের বড় পুনর্গঠন চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ব্যাংকের জট কমানো দরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সুপরিচালনযোগ্য ব্যবস্থায় নামিয়ে আনা দরকার।’
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ১৩টি প্লেনারি অধিবেশনে ১০৪টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এতে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, গবেষক ও শিক্ষার্থীসহ ৮০০ জনের বেশি অংশগ্রহণ করেন।










