বিশ্ব অর্থনীতিতে তামার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নির্মাণসহ বহু ক্ষেত্রেই ধাতুটির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না উৎপাদন। নতুন খনি চালু করতে দীর্ঘ সময় লাগা, পুরনো খনিতে আকরিকের মান কমে যাওয়া ও বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে তামা সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি রূপান্তর ও অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয়সহ বিশ্ব অর্থনীতিতে।
এক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাতে এফটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববাজারে তামার দীর্ঘমেয়াদি বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে ২০২৮ সাল থেকে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে তামার সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় ধাতুটির সরবরাহ থাকবে ৮ শতাংশ কম। ২০৫০ সালে এ ঘাটতি বেড়ে ৪৪ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তামার সরবরাহে বড় ঘাটতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাসহ (আইইএ) অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক সাইমন মান্ডি বলন, ‘তামার সংকট শুধু একটি ধাতুর বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি নতুন বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
সবুজ জ্বালানি ও এআইয়ে বাড়ছে চাহিদা
তামার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্যুৎ পরিবহনে এর উচ্চ দক্ষতা। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ইভি—বিভিন্ন প্রযুক্তিতে ধাতুটির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিদ্যুতের তার, সংযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ তৈরিতেও তামা প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এ পরিবর্তনের জন্য নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ করতে হয়। ফলে তামার চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে ইভির বাজার সম্প্রসারণের কারণেও এ ধাতুর ব্যবহার বাড়ছে।
অন্যদিকে এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ তামার চাহিদায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এআই পরিচালনার জন্য ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও উন্নত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রয়োজন। এসব স্থাপনার ভেতরের যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে তামা ব্যবহার হয়।
নতুন খনি চালু করতে লাগে ১৫ বছর
চাহিদা দ্রুত বাড়লেও তামার উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। নতুন খনি আবিষ্কার, অনুমোদন সংগ্রহ ও কাজ শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তামা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেক রিসোর্সেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাথন প্রাইস গত সপ্তাহে এফটি লাইভ মেটালস অ্যান্ড মাইনিং সামিটে বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে ছয় মাস লাগতে পারে। কিন্তু নতুন তামার খনি খুঁজে বের করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়া এবং সেটি নির্মাণ করে উৎপাদনে আনতে লেগে যায় এক যুগের বেশি সময়।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরনো সব খনি থেকে উত্তোলন ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে। বহু খনি কয়েক দশক ধরে চালু রয়েছে। এগুলো কমে যাওয়ায় একই পরিমাণ তামা উৎপাদনে আগের তুলনায় বেশি আকরিক উত্তোলনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়া হয়ে ওঠে আরো জটিল।
নতুন খনিতে বিনিয়োগে অনীহা
তামার সরবরাহ বাড়ানোর পথে আরেকটি বাধা হলো বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের চাপের কারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নতুনের পরিবর্তে বিদ্যমান খনি থেকে আয় বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। নতুন খনি উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম পরিবর্তন হতে পারে। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত করা কঠিন।
এদিকে সরবরাহের ঘাটতি এখনো পুরোপুরি প্রকট না হলেও তামার দাম এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত মাসে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে প্রতি টন তামার দাম রেকর্ড ১৪ হাজার ৮৭৫ ডলারে পৌঁছয়। ২০২৪ সালের শুরু থেকে দাম বেড়েছে ৭৬ শতাংশ। এছাড়া ২০২০ সাল থেকেই ধাতুটির দাম ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট চলতি বছর দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তামা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত সালফারের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
ভবিষ্যতে চাহিদা পূর্বাভাস অনুযায়ী বাড়তে থাকলে তামার দামে আরো উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। টেক রিসোর্সেসের প্রধান নির্বাহী জনাথন প্রাইসের মতে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করছে। তামার দাম বেশি থাকলে উৎপাদক কোম্পানিগুলো লাভবান হতে পারে।










