দেশের ১৭তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল নাটোরের ৩০০ বছরের মিষ্টি কাঁচাগোল্লা। এর মাধ্যমে বিকৃত কাঁচাগোল্লা ঠেকানোর পাশাপাশি সুযোগ তৈরি হলো রফতানির। আর কাঁচাগোল্লা রফতানি হলে বাড়বে স্থানীয় অর্থনীতির আকার। 

৮ আগস্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প নকশা ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নাটোরে কাঁচাগোল্লার নিবন্ধন সনদ দেয়া হয়। গতকাল দুপুরে নাটোরের জেলা প্রশাসক আবু নাসের ভূঁঞা সনদ হাতের পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

এদিকে নাটোরের কাঁচাগোল্লাকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। বাস-রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে নকল কাঁচাগোল্লা বিক্রি ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি তাদের। 

বিভিন্ন সময়ে নাটোরের কাঁচাগোল্লা হিসেবে গোলাকৃতি করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডশপসহ নকল কাঁচাগোল্লা বিক্রি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ নাটোরের সাবেক জেলা প্রশাসক, বর্তমানে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ নাটোরের কাঁচাগোল্লাকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বরাবর আবেদন করেন। এরপর তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তারা গত ৭ জুলাই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। কারো কোনো অভিযোগ না থাকায় অবশেষে কাঁচাগোল্লাকে জিআই পণ্য ঘোষণা করে সনদ দেয় হলো। 

নাটোর শহরের জয়কালীবাড়ী মিষ্টান্নভাণ্ডারের মালিক প্রভাত কুমার বলেন, ‘কাঁচাগোল্লাকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করায় আমরা খুবই খুশি। কারণ এখন থেকে কাঁচাগোল্লার সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে যাবে। নাটোর শহরে অন্তত ৪০-৪৫টি দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি করা হয়। প্রতি মাসে অন্তত ১ কোটি টাকার কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। এটি ভালোভাবে উপস্থাপন সম্ভব হলে বিক্রি বাড়বে।’ 

নাটোরের মৌচাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পরিচালক আরিফ হোসেন বলেন, ‘জিআই পণ্যের মাধ্যমে নাটোরের কাঁচাগোল্লার সুনাম আরো ছড়িয়ে পড়ল। এখন থেকে এর আকার-আকৃতি ঠিক রেখে বিদেশেও পাঠানো সম্ভব হবে। কাঁচাগোল্লা বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। সে সঙ্গে কাঁচাগোল্লাকেন্দ্রিক অর্থনীতি বড় হবে।’ 

নাটোরের জেলা প্রশাসক আবু নাছের ভূঁঞা জিআই সনদ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নাটোরবাসীর জন্য এটি গৌরবের ও খুশির খবর। কাঁচাগোল্লার সঙ্গে নাটোরের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। একে সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রসারে সবসময় কাজ করে যাব। এছাড়া এখন থেকে কেউ বিকৃত করে কাঁচাগোল্লা বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ 

কাঁচাগোল্লা গোলাকার মনে হলেও এটি আসলে চিনি মিশ্রিত ছানার সন্দেশ। খুব সহজেই তৈরি করা যায় নাটোরের কাঁচাগোল্লা। তবে নাটোরের কাঁচাগোল্লা তৈরির পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। ১৭৬০ সালে অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানী ভবানীর রাজত্বকালে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। নাটোরের লালবাজারে মিষ্টির কারিগর মধুসূদন পালের দোকানে হঠাৎ একদিন কারিগর আসেননি। এতে মাথায় হাত পড়ে তার। ছানাগুলো নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি চিনির রস ঢেলে জ্বাল দিয়ে নামিয়ে রাখেন। পরে মুখে দিয়ে দেখেন ওই চিনি মেশানো ছানার দারুণ স্বাদ। তখন মধুসূদন পাল এর নাম দেন কাঁচাগোল্লা। কারণ কাঁচা ছানা থেকে তৈরি বলে এর নাম হয় কাঁচাগোল্লা। রানী ভবানীর রাজবাড়িতে নিয়মিত মিষ্টি সরবরাহ করতেন মধুসূদন পাল। একদিন রানী  ভবানী এ মিষ্টি খেয়ে প্রশংসা করে এর নাম জানতে চান। তখন মধুসূদন পাল তাকে বলেন, ‘‌কাঁচা ছানা থেকে তৈরি হয়েছে বলে এ মিষ্টির নাম দেয়া হয়েছে কাঁচাগোল্লা।’