প্রতিদিন আক্রান্ত বাছুর বা গরু চিকিৎসার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে আনা হচ্ছে ভ্যাকসিনের জন্য। তবে চাহিদার বিপরীতে মাত্র আড়াই শতাংশ সরকারি ভ্যাকসিন বরাদ্দ পাওয়ায় উপজেলাগুলো এখন নির্ভর করছে বেসরকারি ভ্যাকসিনের ওপর।

২০১৯ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহায় প্রথম গরুর ভাইরাসবাহিত চর্মরোগ এলএসডি শনাক্ত হয়। এরপর রোগটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামে রোগটি সীমিত পরিসরে দেখা গেলেও চলতি বছর এটি বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত সংক্রমণ কমিয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে সমন্বিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ ও খামারভিত্তিক নজরদারি জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এলএসডি ১৯২৯ সালে প্রথম আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ায় দেখা যায়। পরে রোগটি দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, মোজাম্বিকসহ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অনেক গরু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং শত শত খামার বন্ধ হয়ে যায়। সত্তর ও আশির দশকেও আফ্রিকার দেশগুলোয় এ রোগের কারণে হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে; ২০১৪-১৫ সালে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তানে এবং ২০১৬ সালে গ্রিস, সাইপ্রাস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া ও কসোভোয় রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০১৯ সালে চীন ও ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে শিকলবাহার খামারগুলোয় প্রথম রোগটি দেখা যায়। বাংলাদেশে মূলত পশু আমদানি কমে গেলেও চোরাকারবারির মাধ্যমে এ দেশে অনেক পশু প্রবেশ করে। তাছাড়া রোগটি কোয়ারেন্টাইন করেও ঠেকানো যায়নি। এমনকি গরু আমদানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কখনো অনুমোদন দেয়নি। রোগটি মূলত পোকামাকড় বা ভাইরাসের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করেছে।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলএসডিতে আক্রান্ত গরু প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসছেন খামারিরা। বিশেষ করে বাছুর বা চার-পাঁচ মাস বয়সী বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এ চর্মরোগে। এর মধ্যে লোহাগাড়া উপজেলায় আক্রান্ত প্রায় ২০ শতাংশ, আনোয়ারায় সর্বাধিক ৩০, হাটহাজারীতে ২০-৩০, কর্ণফুলীতে প্রায় ১০ ও ফটিকছড়ি উপজেলায় প্রায় ১০ শতাংশ গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অন্যদিকে এ রোগের পাশাপাশি ক্ষুরা রোগের (ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ বা এফএমডি) প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোমিন বলেন, ‘ফটিকছড়িতে এলএসডির প্রাদুর্ভাব আছে। তবে ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিনই এলএসডিতে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা দিচ্ছি। অনেকেই অন্যান্য চিকিৎসকের কাছেও যাচ্ছেন। তবে বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সরকারি ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই, যার কারণে বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।’

আনোয়ারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. সমররঞ্জন বড়ুয়া বলেন, ‘এ উপজেলায় বাচ্চা গরুই বেশি এলএসডিতে আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলার প্রায় ৩০ শতাংশ গরুই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। শাহিওয়াল জাতের বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ফ্রিজিয়ান জাতের গরু তুলনামূলক কম আক্রান্ত হচ্ছে।’

চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতিদিনই এলএসডিতে আক্রান্ত বাছুর চিকিৎসার জন্য আনা হচ্ছে। আক্রান্ত গরুর বেশির ভাগই শাহিওয়াল জাতের। এ রোগে বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। রোগটি মারাত্মক ছোঁয়াচে। আক্রান্ত গরুর চামড়া থেকে সহজে দাগ যায় না।আক্রান্ত গরুর মাংস খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি গরুর দুধ উৎপাদনও কমে যায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সাধারণত বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে অথবা বসন্তের শুরুতে যে সময়ে মশা বা মাছি অধিক বংশবিস্তার করে, সে সময়ে প্রাণঘাতী রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রোগটি মশা, মাছি, আটালি, আক্রান্ত পশুর লালা, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। অনুকূল পরিবেশে এ ভাইরাস ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। ভাইরাসজনিত এ রোগে গবাদিপশু দুর্বল হয়ে ওজন কমে যায়, দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়। চামড়ার নিচের মাংসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আক্রান্ত পশুর শরীরে ১০৪-১০৬ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে এবং গরু খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়। অনেক সময় বুকের নিচে পানি জমে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ক্ষতস্থান ফেটে মাংস খুলে পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এলএসডিতে আক্রান্ত গরুর জন্য সরকারি ভ্যাকসিনের প্রায় চার হাজার ডোজের চাহিদাপত্র দেয়া হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ১০০ ডোজ, যার ৫০ ডোজ করে হাটহাজারী ও কর্ণফুলী উপজেলায় দেয়া হয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোয় সরকারি ভ্যাকসিন না থাকায় বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয়নি। সরকারি ভ্যাকসিন প্রতি ডোজে মাত্র ১০-১২ টাকা খরচ হলেও বেসরকারি কোম্পানির প্রতি ডোজ ভ্যাকসিনে ২৩০-২৫০ টাকা খরচ পড়ে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোয় এলএসডি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাছুর বেশি এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা এবং রোগটি মারাত্মক ছোঁয়াচে হওয়ায় এর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। সরকারি ভ্যাকসিনের সংকট থাকায় বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিন আক্রান্ত গরুকে দেয়া হচ্ছে। এক মাস বয়সী বাছুরকে এ ভ্যাকসিন দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খামারিদের সব ধরনের পরামর্শ দিচ্ছি। সরকারি ভ্যাকসিনের বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিলাম। মাত্র ১০০ ডোজ বরাদ্দ পেয়েছি। বাকি উপজেলাগুলোয় বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিন দিতে হচ্ছে। সরকারের এ ভ্যাকসিন সরবরাহের বিষয়ে আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’

কোন জাতের গরু বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে তথ্য আমাদের কাছে এসেছে তাতে শাহিওয়াল জাতের বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ জাতের বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যান্য জাতের গরুও আক্রান্ত হচ্ছে, তবে তার সংখ্যা কম।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএসডির প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার খামারিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রোগের কারণে খামারিদের প্রতিদিন বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। আক্রান্ত গরুর ওজন কমে যাওয়া, খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া এবং শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় বাছুর থেকে ভবিষ্যতে ভালো উৎপাদনশীলতা পাওয়া সম্ভব হবে না। ছোট বাছুর আক্রান্ত হওয়ায় ভবিষ্যৎ খামার ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত সরকারি ভ্যাকসিন সরবরাহ বৃদ্ধি, আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন ও খামারভিত্তিক নজরদারি বাড়াতে হবে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মেডিকেল ও সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএসডি খুবই ছোঁয়াচে রোগ। খামারে একটি গরু আক্রান্ত হলে অন্য গরুও আক্রান্ত হবে। তাই আক্রান্ত গরুকে আলাদা করে মশারির মধ্যে রাখতে হবে। সরকারি ভ্যাকসিন না পেলেও বাজারে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। যেভাবে সব জায়গায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে তাতে ভ্যাকসিন প্রতি বছর দিলে ভালো হয়। সরকারের ভ্যাকসিনের সংকট থাকলে দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা না দিলে আক্রান্ত গরু মৃত্যুর পাশাপাশি খামারের অন্য গরুর মাংস বা দুধ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।’