লক্ষ্মীপুরে মধ্যরাতে সাইফ মোহাম্মদ আলী (২১) নামে এক কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। ছেলেকে আটকের মানসিক চাপ সইতে না পেরে বাবা মো. সামছুল আলম মামুন (৫০) মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (ব্রেন স্ট্রোক) হয়ে মারা গিয়েছেন বলে দাবি ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার রাত ১টার দিকে পৌর শহরের কালুহাজী সড়কের তাহের মাস্টারের বাড়িতে।

আজ মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) দুপুরে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ওই শিক্ষার্থীসহ ৫ জনকে আদালতে পাঠায় সদর থানা পুলিশ। সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়াসিন ফারুক মজুমদার।

গ্রেফতার শিক্ষার্থী সাইফ মোহাম্মদ আলী লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার বাবা একজন মুদি ব্যবসায়ী, মা তাহমিনা আক্তার নাসরিন একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড়। ছোট ভাই সাইম মোহাম্মদ আলী লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে, সবচেয়ে ছোট বোনের বয়স ১৫ মাস। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সে একজন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সাইফের নানা তাহের মাস্টারের বাড়ির একটি ইউনিটে বসবাস করতেন তারা।

সাইফের মামী নিলুফা আক্তার, মামা মোসলেহ উদ্দিনসহ স্বজনরা বলেন, সাইফ মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা ছিল না। মধ্যরাতে সদর থানা পুলিশ বাসায় অভিযান চালিয়ে সাইফকে আটক করে।

পরিবারের অভিযোগ, সাইফ মোহাম্মদ আলীকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাবা সামছুল আলম মামুন বাধা দেন এবং ছেলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ও ওয়ারেন্ট আছে কিনা পুলিশের কাছে জানতে চান। তবে পুলিশ কোনো উত্তর না দিয়ে সাইফকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় অচেতন হয়ে পড়েন সামছুল আলম মামুন। পরে স্বজনরা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

এরপর পুলিশের দায়ের করা নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাইফকে আদালতে পাঠানো হয়। পরে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালতে সাইফ মোহাম্মদ আলীর জামিন আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। আদালত উভয় পক্ষের কথা শুনে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ সামছুল আলমের জিম্মায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত জানাজায় অংশ নিতে তাকে জামিন দেন।

আসামি পক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির মুরাদ বলেন, ‘সাইফ মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তাকে পুলিশের দায়েরকৃত নাশকতা ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই তাকে বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর পুলিশ সাইফকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আতঙ্কিত হয়ে মামুন মারা যান। পরে আদালতে সাইফের জামিন আবেদন করা হলে আদালত জানাজায় অংশ নিতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাকে জামিন দেন।’

প্যারোলে জামিনে পেয়ে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নিজ হাতে বাবাকে দাফন করেন সাইফ। এরপর শহরের বাসায় ফিরে প্রস্তুতি নিয়ে আদালতে যাওয়ার পথে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন করাই আমার অপরাধ? এর জন্য নিজের বাবাকে হারাতে হলো। সোমবার বিকেলে কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল না, নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচারের দাবিতে শহরের মাদাম ব্রিজ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলে বন্ধুদের সাথে আমিও ছিলাম। পুলিশ কৌশলে তখন আমাদের ছবি নেয়। পরে ছবি দেখে মধ্য রাতে ১৪/১৫ জন পুলিশ সদস্য বাসার দরজা-জানালা পিটিয়ে ভাংচুর করে বাসায় ঢুকে পড়ে। আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে থানায় নিয়ে যায়। পরে আদালত থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য জামিনে এসে দেখি বাবা আর নেই। এখন আমার পরিবারকে কে দেখবে? ছোট ভাই, ১৫ মাসের বোন নিয়ে অসুস্থ মাকে কে দেখবে? আমি কখনো নাশকতার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। মিথ্যা মামলায় আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।

সাইফের মা তাহমিনা আক্তার নাসরিন বলেন, আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। পুলিশ জোর করে ওকে ধরে নিয়ে যায়। এ সময় সাইফের বাবা আতঙ্কিত হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিল মজুমদার ফারুক বলেন, নাশকতা ও বিস্ফোরক মামলায় সাইফ মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি সকালে শুনেছি। সহিংসকতা ও নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সাইফ ছাড়াও আরো চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।