দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যমান বিনিয়োগ নীতি সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল পুঁজি নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত 'কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার শীর্ষক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল অনলাইন সংবাদ পোর্টাল ঢাকা স্ট্রিম। অনুষ্ঠানে সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান, ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনায় অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরসহ কৌশগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় ক্রমবর্ধমান বিদেশী আধিপত্য এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রান্তিকরণ- এ দুটি সমান্তরাল প্রবণতা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯ কোটি মানুষের দেশ, যার অর্থনীতি বিশ্বের ৩৪তম বৃহত্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম, তার কৌশলগত সম্পদ পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতা ও মালিকানা সুরক্ষার প্রশ্ন এখন অপেক্ষা করতে পারে না।
ধারণা পত্রের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম সমান সুযোগ, কৌশলগত সম্পদে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়।
আলোচনায় বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের মূলনীতি হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি গাইড প্রিন্সিপাল। আমাদের যেকোনো নীতি বা পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দক্ষতা এমনিতেই তৈরি হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে দুর্নীতির ধরন বদলে গেছে। আগে অনেকটা দৃশ্যমান দুর্নীতি হতো। এখন মিলিয়ন ডলারের অদৃশ্য দুর্নীতি হয়। চুরি-লুটপাট আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে। এ বিষয়ই আমাদের এখন প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সর্বস্তরে পেশাদারত্ব, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি বন্ধে বেশি নজর দিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর মান্না বলেন, আমাদের মধ্যে একটি ‘ন্যাশনাল মাইন্ডসেট’ বা জাতীয় মানসিকতা ঢুকে গেছে যে আমরা বন্দর বা বিমানবন্দর সামলাতে পারি না, আমরা ভালো চুক্তি করতে জানি না। কিন্তু এ হীনম্মন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ইরানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইরান যদি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে থেকেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? আমাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।
শিল্পনীতিতে বিদ্যমান অসঙ্গতি তুলে ধরে বিসিক এর সাবেক পরিচালক আবু তাহের বলেন, ১৯৯১ সালের পর থেকে শিল্পনীতিতে ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেবা খাতকে একসাথে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত শিল্পায়ন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি প্রস্তাব করেন, শিল্পনীতি সংশোধন করে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতকে আলাদা করতে হবে এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের মতো কৌশলগত খাতে ‘বাপেক্স’-এর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব ও দরকষাকষির দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা জানান, ৩০-৪০ বছরের চুক্তির ক্ষেত্রেও অনেক সময় ‘ডাইরেক্ট পার্চেজ মেথড’ বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। এ প্রসঙ্গে বক্তারা একটি স্থায়ী ও দক্ষ ‘নেগোসিয়েশন টিম’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যারা ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ জাতীয় কারিগরি ও কৌশলগত চুক্তিগুলো হ্যান্ডেল করবে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের উদাহরণ টেনে বক্তারা বলেন, সুশাসন, আইনের শাসন এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দুর্নীতি বর্তমানে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে অনলাইনে স্বচ্ছ লেনদেন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বিদেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সহায়ক পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান। এছাড়া, কৌশলগত সম্পদ যেমন—বন্দর, খনিজ সম্পদ এবং জ্বালানি খাতের নিরাপত্তায় দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।










