যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রতলে থাকা ইন্টারনেট কেবল ও ডাটা সেন্টারে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এর পর থেকে ওমান উপসাগরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাবমেরিন কেবলের ওপর সন্দেহজনকভাবে অবস্থান করতে দেখা গেছে ইরান-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি জাহাজকে। এসব জাহাজের গতিবিধি দেখে কেবলগুলোর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা কিংবা সেখানে বিস্ফোরক ও মাইন স্থাপনের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সামুদ্রিক ডাটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্যানুযায়ী, ইরানের হুমকির পর অন্তত চারটি জাহাজকে অস্বাভাবিক পথে চলাচল এবং সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবলের ওপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে তিনটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ। অন্যটি মাছ ধরার ছোট আকারের ইরানি নৌযান। ২১-২৬ অক্টোবরের মধ্যে নৌযানটিকে ইউরোপ-ইন্ডিয়া গেটওয়ে ও ট্রান্সওয়ার্ল্ড কেবলের ওপর অবস্থান করতে দেখা যায়।

জাহাজ চলাচলের তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলো টুআফ্রিকা ও ফ্যালকনসহ বিভিন্ন কেবলের ওপর গতি কমিয়েছে। কয়েকটি জাহাজ খালি অবস্থায় ছিল। গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে সব কটি জাহাজই নিজেদের অবস্থান শনাক্তের সংকেত বন্ধ করেছে।

উইন্ডওয়ার্ডের ভাষ্য, অন্য জাহাজগুলো যেখানে উপসাগর থেকে পণ্য সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিল, সেখানে সন্দেহভাজন জাহাজগুলো নির্দিষ্ট কেবল এলাকায় পৌঁছানোর পরই গতি কমিয়েছে, বারবার ঘুরেছে, ফিরে গেছে কিংবা অবস্থান শনাক্তের সংকেত বন্ধ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব গতিবিধি কেবলের অবস্থান শনাক্ত করা অথবা সংকেত বন্ধ রেখে সেখানে বিস্ফোরক কিংবা মাইন স্থাপনের প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলে যায়।

হরমুজ প্রণালিতে রয়েছে ছয়টি সাবমেরিন কেবল। আরো তিনটি ফাইবার ইন গালফ, সি-মি-উই-৬ ও টুআফ্রিকা নির্মাণাধীন। এর মধ্যে টুআফ্রিকার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি এই প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া কেবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

গত ১৯ অক্টোবর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাতটি বড় সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে সব বাণিজ্যিক ও ইন্টারনেট তথ্য আদান-প্রদান হয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চাই, নতুন লক্ষ্যবস্তু ও নতুন অস্ত্র সামনে আনা হবে। শেষ পর্যন্ত অঞ্চল থেকে মার্কিন শক্তির অবশিষ্টাংশও আমরা সরিয়ে দেব।’

এর আগে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী ডাটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্থাপনা ধ্বংসের হুমকি দেন। আইআরজিসির উপকম্যান্ডার ইয়াদোল্লাহ জাভানিও বলেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলার জবাবে ইন্টারনেট কেবলসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব কেবলে ক্ষতি হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারনেট, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগব্যবস্থা, ই-কমার্স ও ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যাহত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা মাশা কটকিন বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডাটা সেন্টার সমুদ্রতলের ফাইবার অপটিক কেবলের ওপর নির্ভরশীল।

এদিকে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ সিড কৌশল বলেন, জাহাজগুলোর অস্বাভাবিক চলাচল কাকতালীয়ও হতে পারে। তবে যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রতলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতা দেখাতে চাইতে পারে ইরান।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল জন পেনট্রিথ বলেন, সন্দেহজনক আচরণের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তবে মাইন স্থাপনের জন্য জাহাজে সামান্য পরিবর্তন আনলেই চলে। তার ভাষায়, মোটামুটি যেকোনো জাহাজ থেকেই মাইন নিক্ষেপ করা সম্ভব, তবে এ জন্য কাঠামোয় অল্প কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।

এফটির প্রতিবেদন অবলম্বনে