যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয় দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রায় দুই বছরের পররাষ্ট্রনীতিতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষই অস্বস্তিতে ছিল। নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের অবস্থান কী হয়, এখন সেদিকেই নজর রাখছে ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেন।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও পররাষ্ট্রনীতিতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। তবে নির্বাচনী পরাজয় তাকে সমঝোতায় আগ্রহী করবে, নাকি নিজের অবস্থান আরো কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠার পথে ঠেলে দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ইরান: যুদ্ধ নাকি সমঝোতা

রিপাবলিকানদের পরাজয়কে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোটাররা সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ও ব্ল্যাকমেইলারদের সেবা করতে গিয়ে জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে আমাদের “না”-এর পরিণতি হবে দুঃস্বপ্ন।’

তবে নির্বাচনের ফলাফলে ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন আসবে, এমনটা মনে করছে না তেহরান। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলাবে বলে যারা মনে করছেন, তারা ‘গভীরভাবে ভুল করছেন’।

নতুন করে মার্কিন হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। ট্রাম্প একদিকে ইরানে আরো জোরালো হামলার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন, অন্যদিকে তাৎক্ষণিকভাবে হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ—সম্মানজনকভাবে সমঝোতা করে বিজয় ঘোষণা করা, অথবা সামরিক অভিযান জোরদার করা। তার সতর্কতা, ‘নির্বাচনে দুর্বল হয়ে পড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য দিয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাইতে পারেন।’

তবে কূটনীতির পথও খোলা রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হওয়াকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছেন চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল।

ইসরায়েল: যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ভাঙন

ইসরায়েলের জন্য নির্বাচনের ফল বড় উদ্বেগের। নির্বাচনের দিনই ট্রাম্প দেশটিকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।

গাজা যুদ্ধে প্রাণহানির ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে রিপাবলিকানদের একাংশের মধ্যেও। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন বলেন, ‘এই মুহূর্তে একমাত্র দ্বিদলীয় ঐকমত্যের বিষয় হলো ইসরায়েলের সমালোচনা।’

তার আশঙ্কা, সামরিক সহায়তা বন্ধের পর গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আয়রন ডোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়নও বন্ধ হতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন ভেটো দেয়ার দীর্ঘদিনের নীতিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ওরেনের ভাষায়, ‘আমরা একটি যুগের শেষ প্রান্তে।’

ইউক্রেন: ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ের অপেক্ষা

ইউক্রেনের জন্য রিপাবলিকানদের পরাজয় তুলনামূলক স্বস্তির খবর। ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ইউক্রেনকে যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেয়ার কথাও বলেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, অর্থ ও নিরাপত্তা সহায়তা ইউক্রেনের এখনো প্রয়োজন। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তরের উপপ্রধান সের্গেই কিসলিৎসিয়া জানিয়েছেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘প্রকৃত, স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক’ গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে কিয়েভ।

তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসা ইউক্রেনের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামনে নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অবশিষ্ট সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন তিনি। ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে ইউক্রেন প্রশ্নে রিপাবলিকানদের নীতিতে পরিবর্তন আসার আশঙ্কাও রয়েছে মস্কোর।

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে সংক্ষেপিত