যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেট ও নিম্ন কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয়ের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। সিএনএন জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ২৩১টিতে জয় নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৩৯টি আসন। অন্যদিকে ১০০ সদস্যের সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৫৪টি এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৪৪টি আসন নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দুটি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে জয় পেয়েছেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন ৪২ বছর বয়সী এ রাজনীতিবিদ। প্রচারের সময় এল-সাঈদকে কট্টরপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন রিপাবলিকানরা। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তাকে ইসলামী উগ্রবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলেও দাবি করা হয়।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবক’টি এবং উচ্চ কক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি এবং সিনেটে ৫১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২২০টি ও ডেমোক্র্যাটদের ২১৫টি আসন ছিল। অন্যদিকে ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন ছিল। ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনকারী দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ দলটির পক্ষে মোট আসন ছিল ৪৭টি।
এবার সিনেটের ৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ২০টি এবং রিপাবলিকানরা ১৩টি আসনে জয় পেয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সাতটি আসন ছিনিয়ে নেয়ায় সিনেটে তাদের ও সমর্থক স্বতন্ত্রদের মোট আসন সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৪টিতে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে রিপাবলিকানদের আসন কমে হয়েছে ৪৪টি। বাকি দুটি আসনের ফল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে সব আসনের ফল প্রকাশের আগেই কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে দলটি।
রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সিনেট নির্বাচনে। দলটির দখলে থাকা অন্তত সাতটি আসন ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলো হলো টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস, আইওয়া, ওহাইও ও মেইন। এর মধ্যে টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এসব অঙ্গরাজ্যে দলটির পরাজয় মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো পরাজিত করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে। এর মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো অঙ্গরাজ্যটি থেকে সিনেটে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নির্বাচিত হলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেক্সাসে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার সেই অঙ্গরাজ্যেই রিপাবলিকানদের সিনেট আসন হাতছাড়া হয়েছে। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন। প্রায় ৯৪ বছর পর অঙ্গরাজ্যটি থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান সিনেটর ডারলাইন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। ২০২৪ সালে এ অঙ্গরাজ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
আইওয়ায় রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক। নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলির বিরুদ্ধে জয় পেয়েছেন সাবেক গভর্নর রয় কুপার। ওহাইওর বিশেষ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন। আর মেইনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স পরাজিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের কাছে। এর মধ্য দিয়ে সিনেটে কলিন্সের প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে।
এছাড়া মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাঈদ রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে মিশিগানের আসনটি আগেও ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে এটি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নতুন করে ছিনিয়ে নেয়া আসন নয়।
কংগ্রেসের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও সাফল্য পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাসে তিন মেয়াদের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোহোসা। এর মধ্য দিয়ে তিন দশকের বেশি সময় পর অঙ্গরাজ্যটিতে গভর্নর পদে জয় পেয়েছে দলটি। জর্জিয়ায় রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কিশা ল্যান্স বটমস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এপির হিসাবে, ঘোষিত ও নির্ধারিত ফল মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটদের গভর্নর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ এবং রিপাবলিকানদের ২০। দুটি অঙ্গরাজ্যের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছে। তারা কঠোর লড়াই করেছে।’ তবে রিপাবলিকানদের কয়েকজন প্রার্থীরও সমালোচনা করেছেন তিনি। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি নিজে ব্যালটে থাকলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতো।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং সরকারি কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। বুথফেরত জরিপে অর্ধেক ভোটার নির্বাচনকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান জানানোর সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের আরো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ চেয়েছেন।
নির্বাচনের ফল ডেমোক্র্যাটদের হাতে নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেয়ার পর ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন কর্মসূচি, বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দেয়ার সুযোগ পাবেন তারা। একই সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, সরকারি ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের বিষয়ে তদন্ত ও নজরদারি বাড়াতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত এবং সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা—দুই-ই বাড়তে পারে।










