মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের পঞ্চম দিনেও রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সাভারের হেমায়েতপুরে শ্রমিকদের হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গতকাল ৪৭৭টি কারখানা বন্ধ ছিল। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ১৫টি কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যান বলে জানা গেছে।
গতকাল রাজধানীর মিরপুরে বিক্ষোভের চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। সকালে মিরপুর-১১-এর পূরবী সিনেমা হলের কাছে কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিরপুর-১০ গোলচত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিন সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। আশপাশের গলিতেও পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়ে। পল্লবী এলাকার কয়েকটি কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এলাকায় বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। থানার আওতাধীন আটটি পোশাক কারখানার মধ্যে সাতটি চালু ছিল। একটি কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে কাজ বন্ধ রাখলেও পরে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পর কাজে যোগ দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।’
গতকাল বুধবারও উত্তপ্ত ছিল গাজীপুর শিল্পাঞ্চল। সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাছা থানার সাইনবোর্ড এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পরে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স (এসআরবি) ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। গতকাল নতুন করে আরো এক প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ নিয়ে মোট ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৮ প্লাটুন এসআরবি ও ৫ প্লাটুন আনসার সদস্য মোতায়েন ছিলেন। সব মিলিয়ে ২৫ প্লাটুন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন পোশাক শ্রমিকরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে শ্রমিকরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পরে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে গেলে যান চলাচল শুরু হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানা এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়দেবপুরের দিকেও শ্রমিকরা জড়ো হয়েছিলেন। তাদেরও সরিয়ে দেয়া হয়। সালনা, রাজেন্দ্রপুর, শফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। তবে কাশিমপুর এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা থাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনে আহত হয়ে মারা যাওয়া পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেনের স্মরণে গতকাল দুপুরে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জানাজার আগে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাসের খানসহ এনসিপি ও শ্রমিক শক্তির কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেন। পরে তারা গায়েবানা জানাজা আদায় করতে গেলে পুলিশ ও বিজিবি বাধা দেয়। এক পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাসের খান বণিক বার্তাকে জানান, পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে। তারা পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনার বিচার এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।
নিহত তৌফিক হোসেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি গাজীপুরের লাইলা স্টাইলস লিমিটেডের কর্মী ছিলেন। গত সোমবার শ্রমিক বিক্ষোভের সময় সহিংসতার দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বলে জানায় পুলিশ। পরে তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
গতকাল সকালে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রমিকরাও বুঝতে পারছেন, তাদের দাবি মেনে নেয়ার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এ কারণে তারা আন্দোলনে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।’ পুলিশ সুপার আরো বলেন, ‘শিল্পাঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসার সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।’
এদিকে গতকাল সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন পোশাক শ্রমিকরা। পুলিশের অনুরোধে মহাসড়ক না ছাড়ালে সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এরপর শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় চার সাংবাদিকসহ সাতজন আহত হন।
সাভারে সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন বণিক বার্তা ও একাত্তর টিভির সাভার প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন, তার সহযোগী উজ্জ্বল হোসাইন, স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী এবং বৈশাখী টিভির ভিডিও জার্নালিস্ট নিলয়।










