গৃহকর্মী হিসেবে ২০২২ সালে সৌদি আরবে যান সিলেটের তানজিনা আক্তার (২৪)। চলতি বছরের ২৩ জুলাই দেশটিতে তার মৃত্যু হয়। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তানজিনার বাবা শাহেদ আলী বণিক বার্তাকে জানান, মৃত্যুর আগের রাতে মেয়ের সঙ্গে ফোনে তার কথা হয়েছিল। তখন সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। পরদিন সকালে ফোন করে তাকে জানানো হয়, তানজিনা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। বিছানায় তার মরদেহ পাওয়া গেছে। অথচ মৃত্যুসনদে যে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে বিষয়টি তিনি জানতেনই না।
চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে মারা যান বরিশালের সুচন্দা হালদার (৪৪)। তার মৃত্যুসনদেও মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। সুচন্দার মেয়ের জামাই সুকেন বণিক বার্তাকে জানান, মৃত্যুর আগের দিন তাকে ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন সুচন্দা। পরদিনই তার মৃত্যুর খবর পান স্বজনরা। মরদেহ দেশে আসার পর কফিন খুলে সুচন্দার গলা ও ঘাড়ে রক্তের দাগ দেখতে পান তারা। সুকেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এগুলো নিয়ে আর কিছু করতে চাইনি।’
জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দেয়া বাংলাদেশী নারী কর্মীদের অনেকেই আর জীবিত দেশে ফিরতে পারছেন না। তাদের কেউ কেউ কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬৫ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ১৭০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ১১২ জনই সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন, যা মোট আত্মহত্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ফেরা ১ হাজার ৬৫ নারী কর্মীর মরদেহের মধ্যে ৪৮৬টি এসেছে সৌদি আরব থেকে, যা মোট মরদেহের প্রায় ৪৬ শতাংশ। সৌদি আরব থেকে আসা এসব মরদেহের মধ্যে ১১২ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সৌদি আরব থেকে আসা নারী কর্মীদের প্রতি চারটি মরদেহের প্রায় একটির মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দেশে মরদেহ আসার পর ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের প্রাধান্য দেখা যায়। ২০২৩ সালে বিদেশ থেকে ১০১ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরে। এর মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়, যাদের ১৩ জনই সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালে দেশে আসা ৯৫টি মরদেহের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়। তাদের ১২ জনই ছিলেন সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে দেশে ফেরা ৮৮ নারী কর্মীর মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যুর কারণ ছিল আত্মহত্যা, যাদের ১৩ জনই সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ফিরেছে ৭৬ নারী কর্মীর মরদেহ। এর মধ্যে ১১ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ছয়জন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দেশে ফিরেছিল ৭০৫ নারী কর্মীর মরদেহ। তাদের মধ্যে ১১০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়, যাদের ৬৮ জনই ছিলেন সৌদি আরবে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়া অনেক নারী নিয়োগকর্তার বাড়িতে যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অসহায়ত্বের কারণে তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অন্যদিকে দেশে মরদেহ ফেরার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ময়নাতদন্ত করা হয় না। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এমনকি নির্যাতনের কোনো আলামত থাকলেও তা অজানাই থেকে যায়।
রামরুর ‘ডেথ অব উইমেন মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ইন ডেস্টিনেশন কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণায়ও নারী কর্মীদের মৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৭০৫ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ১১০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
দেশভিত্তিক হিসাবে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সৌদি আরবে। ওই ছয় বছরে দেশটি থেকে ফেরা ৬৮ নারী কর্মীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়, যা ওই সময়ের মোট আত্মহত্যার ৬১ দশমিক ৮১ শতাংশ। গবেষণার অংশ হিসেবে মৃত ১০০ নারী কর্মীর পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এতে দেখা যায়, মৃত্যুসনদে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও ১১টি পরিবারের সদস্যরা তা বিশ্বাস করেননি। এসব পরিবার দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের আবেদন করলেও তা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।
শুধু আত্মহত্যা নয়, বিদেশে নারী কর্মীদের স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত ঘটনাগুলো নিয়েও স্বজনদের প্রশ্ন রয়েছে। রামরুর গবেষণা অনুযায়ী, মৃত্যুসনদে ৬৯ শতাংশ নারী কর্মীর মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাক্ষাৎকার দেয়া পরিবারের ৪৮ শতাংশই মৃত্যুর এ কারণ বিশ্বাস করেনি। দেশে মরদেহ ফেরার পর নতুন করে ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্বজনদের সন্দেহ কাটছে না।
বিদেশে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা না থাকলেও জার্মানিতে এর নজির রয়েছে। ‘ডেথ অ্যাব্রড: মেডিকো-লিগ্যাল অটোপ্সি রেজাল্টস অব রিপ্যাট্রিয়েটেড কর্পসেস’ শীর্ষক গবেষণায় ৫৬টি দেশ থেকে জার্মানিতে আনা ১৫১টি মরদেহের ময়নাতদন্তের ফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের মৃত্যুসনদে উল্লেখিত কারণের সঙ্গে জার্মানিতে করা ময়নাতদন্তের ফলের অমিল পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও পুনঃময়নাতদন্ত করা হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বিদেশে নারী কর্মীদের সন্দেহজনক মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত ও বাধ্যতামূলক ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দূতাবাসের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত, নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় ও দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং দায়ী রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
প্রবাসী কর্মীদের অধিকার লঙ্ঘন ও মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় দূতাবাস বা লেবার উইংগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিভিল সোসাইটি ও অভিবাসী কর্মীদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিযোগ সত্ত্বেও বিদেশে প্রবাসী কর্মীদের অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক মৃত্যুর (পুরুষদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক এবং নারীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া) প্রকৃত কারণ উন্মোচনে সরকারের কোনো সদিচ্ছা দেখা যায় না। এটি মূলত নিয়োগকর্তাকে দায়মুক্ত করার অপচেষ্টা। প্রতি বছর চার থেকে সাড়ে চার হাজার মরদেহ দেশে এলেও সেগুলোর পুনঃময়নাতদন্তের দাবিকে ইতিবাচকভাবে না নিয়ে বরং সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে অবহেলা করা হয়।’
বাংলাদেশী নারী কর্মীদের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত ও লেবানন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশী নারী কর্মীদের যাওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কমেছে। দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী বিদেশে যান ২০১৭ সালে, ১ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন। পরের দুই বছরও এ সংখ্যা এক লাখের বেশি ছিল। ২০১৮ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৬৯৫ ও ২০১৯ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৮৬ নারী কর্মী বিদেশে যান। ২০২০ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৯৩৪-এ। পরের বছর তা বেড়ে হয় ৮০ হাজার ১৪৩ ও ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন।
তবে ২০২৩ সালে আবার কমতে শুরু করে নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা। ওই বছর বিদেশে যান ৭৬ হাজার ১০৮ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ৬১ হাজার ১৫৮-তে। ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে বিদেশে যান ৬২ হাজার ৩৫৫ নারী কর্মী। চলতি বছরের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫৩ হাজার ৫১৭।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা নারী অভিবাসন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. তাসনীম সিদ্দিকী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় গড়ের তুলনায় অভিবাসী নারী কর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অত্যন্ত বেশি ও অস্বাভাবিক। এছাড়া অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কৌশলে হার্ট ফেইলিউর বা স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। বিদেশ থেকে পাঠানো ময়নাতদন্তের সার্টিফিকেট অন্ধভাবে গ্রহণ না করে দেশে পৌঁছার পর শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন থাকলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত নিশ্চিত করা দরকার। এজন্য বিমানবন্দরের ভেতরে পর্যাপ্ত হিমঘর (মর্গ) ও সুরতহাল করার যোগ্য ব্যক্তির ব্যবস্থা করা জরুরি, যেন ফরেনসিক প্রমাণ নষ্ট হয়ে না যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে বিএসসি নার্সিং চালু করে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এর মাধ্যমে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ায় উন্নত পেশায় নারী অভিবাসনের নতুন বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের সঙ্গে বণিক বার্তা থেকে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।










