পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের বিষয়ে একমত হয়েছেন। কার্যকর হওয়া নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকরা বেতন পাবেন আগামী জানুয়ারি থেকে। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভায় এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানী।
বৈঠক শেষে নবগঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী বলেন, ‘সাধারণত শিল্প খাতের এ ধরনের কাজ সম্পন্ন করতে ছয় মাসের মতো সময় লাগে। তবে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড গঠনের মাত্র তিনদিনের মধ্যে আজ (গতকাল) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা খুবই সংক্ষিপ্ত। আজকের সভায় মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরাও শ্রমিকদের বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য শুনেছি। এ কারণে আমি বিশ্বাস করি, শিগগিরই ভালো কিছু করা সম্ভব হবে। আগেরবারের মতো এবার দীর্ঘ সময় লাগবে না। শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘পরবর্তী সভায় শ্রমিক ও মালিক পক্ষ লিখিতভাবে তাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহস্পতিবারের পর শুক্র, শনি ও রোববারের ছুটির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিজ নিজ সংগঠনের সদস্য ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। এতে ভালো ফল নাও আসতে পারে। সে কারণে দ্বিতীয় সভার আগে অন্তত এক সপ্তাহ সময় নেয়া হচ্ছে।’
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর গণমাধ্যমে কথা বলেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। তিনি বলেন, ‘সভায় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতিও হয়েছে। আমরা প্রস্তাব করেছি, নতুন মজুরি ডিসেম্বরের মধ্যেই কার্যকর করতে হবে, যাতে জানুয়ারিতে ডিসেম্বরের বেতন পরিশোধের সময় শ্রমিকরা বর্ধিত মজুরি পান। মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। সভায় উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে, যে মজুরিই নির্ধারণ করা হোক না কেন, তা ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। ফলে ডিসেম্বরের বেতন জানুয়ারিতে পরিশোধের সময় শ্রমিকরা বর্ধিত মজুরি পাবেন। এ বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।’
মালিক পক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামছুদ্দিন বলেন, ‘আমরা উভয় পক্ষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেছি। ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সম্মত হয়েছি, যাতে শ্রমিকরা জানুয়ারিতেই বর্ধিত মজুরির সুবিধা পান। এ বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। যারা রাস্তায় আন্দোলন করছেন, তাদের দাবিগুলো নিয়েই আমরা আলোচনা করছি। তাদের দাবি হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যেই মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এ বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক পক্ষ উভয়েই একমত হয়েছি।’
পরবর্তী সময়ে বিজিআইডব্লিউএফের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, ‘আজকের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, শ্রমিকদের
নতুন মজুরি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। পরবর্তী মাস জানুয়ারির সাত কর্মদিবসের মধ্যে বর্ধিত মজুরিসহ বেতন পাবেন তারা। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের। তারা এ নিয়ে কাজ করছেন। কোনো একক মালিকের পক্ষে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি শ্রমিক ভাইদের বোঝার জন্য অনুরোধ করছি।’
তিনি বলেন, ‘চলমান আন্দোলনের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে শ্রমিক ভাইদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন। রাজনৈতিক ইন্ধনে কিংবা অন্য কারো স্বার্থে যেন ব্যবহৃত না হন। রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তাদের স্বার্থ দেখবেন। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ একটাই—শিল্প টিকে থাকতে হবে, কাজ করতে হবে এবং নিজেদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার বিষয়ে আমরা একমত এবং তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চাই।’
তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ১ নভেম্বর ৬ সদস্যের ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ গঠন করে সরকার। ওইদিন বোর্ডের চেয়ারম্যান (জেলা ও দায়রা জজ) হিসেবে নিয়োগ পান শেখ আশফাকুর রহমান। গতকাল তাকে সরিয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানীকে নিয়োগ দেয় সরকার। ওনার সভাপতিত্বে বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বোর্ডে মালিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিরা হলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও বিজিআইডব্লিউএফের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। এছাড়া নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। বোর্ড পোশাক খাতের সব পদের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সুপারিশ করবে। এর ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশ করবে সরকার।










