যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় হারের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক পতন ঘটেছে। গতকাল ফিউচার মার্কেটে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান দুই সূচক ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম প্রায় ৮-১০ শতাংশ কমেছে। জ্বালানি তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে স্পট মার্কেটেও। গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ডেটেড ব্রেন্টের দাম ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং দুবাই ক্রুডের দাম ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দাম আরো কমার প্রবণতা দেখা গেছে। নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। এর প্রভাবেই মূলত জ্বালানি তেলের বাজারে বড় দরপতন ঘটেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরো কমতে পারে, যার প্রভাব শিগগিরই খুচরা জ্বালানির বাজারেও পড়তে পারে। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে বাজারের এ নিম্নমুখী প্রবণতা উল্টে যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের বাজার পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট অয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ফিউচার মার্কেটে গতকাল রাতে একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০ ডলার বা ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৯৩ দশমিক ৩০ ডলারে নেমে আসে। এর মধ্য দিয়ে ৭ অক্টোবরের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৮৭ দশমিক ৫৬ ডলারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য সরাসরি ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেও গত রাতে সে কথা বলেছেন।’ ভ্যান্সের মতে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়া অনেক ভোটার ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের কারণে এবার রিপাবলিকানদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের মধ্যেই মঙ্গলবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প জানান, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা তার নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের খবরও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। গত অক্টোবরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কায় তেলের দামে উল্লম্ফন দেখা দেয়।

ইরান যুদ্ধের কারণে গত আট মাস বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। গত শুক্রবারও একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১৮ ডলারে উঠেছিল। তবে চলতি সপ্তাহের তিন কার্যদিবসে বাজারে বড় ধরনের সংশোধন ঘটেছে। এর পরও বছরের শুরুর তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি রয়েছে। উচ্চ জ্বালানিমূল্যের প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের দামে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো তীব্র করেছে।

ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর জ্বালানির দাম কমার বিষয়ে আশাবাদী বিশ্লেষকরা। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক ও গ্যাসবাডির কর্মকর্তা প্যাট্রিক ডি হান এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, তেলের দামে সাম্প্রতিক পতনের প্রভাব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশটিতে গ্যাসোলিনের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের নিচে নামার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল সকালে দেশটিতে গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল ৪ দশমিক ১২ ডলার, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।

তেলের দাম কমার প্রভাব পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ খাতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্য হ্রাস পেলে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামেও স্বস্তি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের আগাম লেনদেনের দামও প্রায় ৭ শতাংশ কমে আগস্টের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের সুফল ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কারণ খুচরা জ্বালানির দাম নির্ধারণে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি ও মজুদেরও প্রভাব রয়েছে।

আগামী ছয় সপ্তাহ সাধারণত গ্যাসোলিন ও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে না বলে মনে করছেন গালফ অয়েলের প্রধান জ্বালানি উপদেষ্টা টম ক্লোজা। তিনি সিএনবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান পারস্য উপসাগরে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক সামরিক পদক্ষেপ না নিলে ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

এর মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, অক্টোবরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, কনডেনসেট ও পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। যদিও তা যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের নিচে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে তেলের বাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর।

তবে নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিংয়ের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ নীতির পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু হলে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আরবিসি ব্লুবের বাজার কৌশল বিভাগের প্রধান মাইক বেলও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিলে সেটিই আর্থিক বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।