ইরানে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়েছে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। বেড়েছে জ্বালানি, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফেরা ট্রাম্পের দলকে এবার সেই উচ্চমূল্যের কারণেই ভোটারদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ ও এর ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দলটির পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, এর একটি অংশের জন্য ইরান দায়ী। তবে একই সঙ্গে মানুষ বুঝতে পেরেছে, ইরানের ক্ষেত্রে আমি যা করেছি তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’ যুদ্ধের কারণে গ্যাসোলিনের বাড়তি দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরানের বিষয়ে আমি যা করছি, মানুষ তার সঙ্গে একমত। কিন্তু সম্ভবত তারা স্বল্পমেয়াদে গ্যাসোলিনের জন্য বেশি দাম দিতে রাজি ছিল না। বিষয়টি আমি বুঝি, যদিও তাদের সঙ্গে একমত নই।’ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে।
তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই ট্রাম্পের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি সঠিক কাজ করেছি। আবার সুযোগ পেলেও একই কাজ করতাম।’ নির্বাচনের ফল তাকে কিছুটা বিস্মিত করেছে বলেও স্বীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারের প্রশংসা করে বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছে। তারা কঠোর লড়াই করেছে।’
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সাধারণত অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রে গৌণ বিষয় হলেও এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক শুল্ক আরোপের নীতি সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে পররাষ্ট্রনীতিই ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। যুদ্ধের বিরোধিতার পাশাপাশি এর জন্য বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ বহনের বিষয়টিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
এর প্রভাব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও পড়ে। যুদ্ধের আগে ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে প্রতি গ্যালন সাধারণ গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল ৩ ডলারের নিচে। কিন্তু এপ্রিলের মধ্যেই তা ৪ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরবর্তী মাসগুলোয়ও উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত থাকে। গত অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ২২ সেন্ট। একই সময়ে ডিজেলের দাম পৌঁছায় প্রায় ৫ ডলার ৯৪ সেন্টে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, বিমান চলাচলসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে কয়েকটি বিমান সংস্থা ফ্লাইট কমানো এবং অতিরিক্ত ফি আরোপের উদ্যোগ নেয়। এতে ভোক্তাদের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স জানিয়েছিল, নির্বাচনের আগে গ্যাসোলিনের দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তেল পরিশোধন ও খুচরা জ্বালানি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৩ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে শুধু গ্যাসোলিনের দামই আগের মাসের তুলনায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধি ওই মাসে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক বৃদ্ধির অর্ধেকের বেশি অংশের জন্য দায়ী ছিল। একই মাসে জ্বালানি খাতের মূল্যসূচক বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক উল্লম্ফনে জ্বালানির প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের দিন পরিচালিত বুথফেরত জরিপে অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রভাব স্পষ্ট হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কাকে ভোট দেবেন সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাদের অনেকেই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ও আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপসহ ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
এসএসআরএস পরিচালিত জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৭৯ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের মতামত নেয়া হয়। এতে দেখা গেছে, প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় তিনজন দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট কিংবা ক্ষুব্ধ। ভোটারদের ৬২ শতাংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কার্যক্রমে অসন্তোষ জানিয়েছেন। অন্যদিকে ১০ জনের মধ্যে সাতজন মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। এসব তথ্য ইঙ্গিত করছে, অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক নীতির বিরুদ্ধেও ভোটারদের একটি বড় অংশ অবস্থান নিয়েছেন।
নির্বাচনের আগেই জনমত জরিপে এ অসন্তোষের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স-ইপসোস পরিচালিত জরিপে ৪৭ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলায় ট্রাম্পের কার্যক্রমে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা। সমর্থন জানিয়েছিলেন মাত্র ২২ শতাংশ।
ইরান যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতির আশঙ্কা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ছিল। গত ২ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়া ঠেকাতে চাইছিলেন ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তির বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, নির্বাচনের আগে সামরিক সংঘাত সীমিত রেখে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে। এমনকি নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান জোরদারের সম্ভাবনাও তখন আলোচনায় ছিল। তবে সেটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না।
গত ৮ অক্টোবর ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে। যদিও নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ভোটারদের উদ্বেগের কেন্দ্রে থেকেই যায়।
মার্কিন নির্বাচনী ইতিহাসেও যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ক্ষতির নজির রয়েছে। ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের শাসনামলে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল রিপাবলিকানরা। দুই দশক পর ইরান যুদ্ধের মধ্যে আবারও একই ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দলটি।
গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০০৬ সালের পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এবারের পরিস্থিতিতে বিশেষত্ব হলো, যুদ্ধের প্রভাব শুধু জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা পররাষ্ট্রনীতির বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সরাসরি ভোটারদের পারিবারিক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
অবশ্য রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একমাত্র কারণ ইরান যুদ্ধ নয়। ট্রাম্পের শুল্কনীতি, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও রিপাবলিকান প্রার্থী নির্বাচন নিয়েও ভোটারদের অসন্তোষ ছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারানোর ঐতিহাসিক প্রবণতাও রয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে যুদ্ধ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য সেই অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে বলে নির্বাচনী জরিপ ও সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের ফল মেনে নেয়ার কথা জানালেও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা আমার কাছে উদ্ভট সব আইন প্রস্তাব পাঠাবে। আমি সেগুলোতে ভেটো দেব। কয়েক মাস এভাবে চলার পর তারাই ফোন করে জানতে চাইবে, কীভাবে কাজ এগিয়ে নেয়া যায়। তখন আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’ অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি।










