হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকালের এ হামলাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন এ হামলা চালানো হলো। অন্যদিকে ইরানে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরুর চাপ অব্যাহত রেখেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। খবর এপি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনায় জড়িত ইরানের কয়েকটি অবস্থানে হামলা চালানো হয়েছে।
পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরুর পরিবর্তে হামলাগুলো সীমিত পরিসরে চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছিলেন, আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে কোনো হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সঙ্গে এ যুদ্ধ মার্কিনদের মাঝে খুবই অজনপ্রিয়। যুদ্ধের কারণে পেট্রলের দাম বৃদ্ধি ও অর্থনীতির অন্যান্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব রিপাবলিকানদের জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে দলটি।
সর্বশেষ জানা তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ইরানে কয়েকটি হামলা চালিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে ইরানের উপকূলবর্তী জলসীমায় এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। দেশটির বন্দরের ওপর বজায় রয়েছে নৌ অবরোধ। এছাড়া তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি ও আরো কয়েক হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে।
গতকাল কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানো ঠেকাতে এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ীকে গত সপ্তাহে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভ্যান্স। ওই চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে হোয়াইট হাউজ খুব সামান্য তথ্যই প্রকাশ করেছে। সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, চিঠিতে ইরানকে ‘চিকিৎসাসামগ্রী ও বিভিন্ন জিনিসপত্র’ সরবরাহে সহায়তার বিষয়টি ছিল।
চিঠি সম্পর্কে সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ইরানিদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা ভালো আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও আমি দুজনই মনে করি, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর মতো ভালো সম্ভাবনা রয়েছে এখনো।
অবশ্য এই বক্তব্যের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর আশঙ্কা বিরাজ করছে। আট মাস ধরে চলা এ যুদ্ধ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্পের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্রদেশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: রয়টার্স
ইরানে নতুন হামলার জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় এক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তার উগ্র ডানপন্থী মিত্ররা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হলে জরুরি সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে তার সামনে।
ওই দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অগ্রগতি হয়েছে। গত সপ্তাহে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা করেছেন। তাদের লক্ষ্য, একটি কাঠামোগত সমঝোতা এগিয়ে নেয়া। এর আওতায় হরমুজ প্রণালিতে হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেয়ার কথা রয়েছে।
তবে এক কর্মকর্তা বলেন, দ্রুত কিন্তু ব্যাপক আকারের বিমান হামলা চালাতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের সময় ইরানে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি ট্রাম্প।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্রদেশগুলো অবশ্য নতুন করে হামলা চালানোর বিরোধিতা করছে। তাদের আশঙ্কা, এতে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়বে। পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা আরো বাড়াতে পারে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে গতকাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। আলোচনায় ‘সর্বশেষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি’ এবং সৌদি আরবে হুথিদের অব্যাহত হামলার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন ভোটারদের কাছেও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ।
যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টায় থাকা ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। ওয়াশিংটনে দেয়া এক ভাষণে গতকাল বিষয়টি উল্লেখ করেন ট্রাম্প। ভাষণটি ছিল মার্কিন জনগণের উদ্দেশে তার নির্বাচনী প্রচারের শেষ বক্তব্য। এতে তিনি যুদ্ধের ব্যাপকতা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। এ যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের অন্তত ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটিকে আদৌ যুদ্ধ বলা যায় কিনা, জানি না। কারণ কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো লড়াই করছি না।’
কূটনীতির পাশাপাশি যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত ইরান
যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, এমন নিশ্চয়তা চায় ইরান। বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যে দুবার দেশটির ওপর হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলছেন, তারা যুদ্ধ কিংবা কূটনীতি—দুই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের ও মাত্রার হুমকির জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে এবং সে জবাবের কোনো ‘ভৌগোলিক সীমা’ থাকা চলবে না। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরো বড় করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় সামরিক সরঞ্জামের কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দুই পক্ষের মধ্যে পড়ে বিপাকে আরব মিত্ররা
মার্চের পর গত মাসে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নিতে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে ইরান এসব হামলা জোরদার করেছে।
বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলন ‘মানামা ডায়ালগে’ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ‘এই অবস্থানগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা না গেলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হতে হবে।’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
বাহরাইনের সম্মেলনে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেন, সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ের উত্তেজনা ‘আরো বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক হবে এবং এতে কোনো সমাধান আসবে না’।
এদিকে নভেম্বরের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময়ে ইরান, ওমান ও সৌদি আরবে বিশেষ দূত পাঠাবে চীন। সোমবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং।















