বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আফ্রিকা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল-গ্যাস পরিবহনে অনিশ্চয়তার কারণে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। এতে আফ্রিকার বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। মহাদেশটির বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও রফতানি অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও তানজানিয়ায় বড় আকারের প্রকল্পগুলো আফ্রিকাকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

জ্বালানি খাতবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিচ সলিউশনসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি প্রায় ১৭৫ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৪ সালে অঞ্চলটি থেকে ৩ হাজার ৫৭০ কোটি ঘনমিটার এলএনজি রফতানি হয়েছিল। ২০৩৪ সালে তা ৯ হাজার ৮০০ কোটি ঘনমিটারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়ন, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং ভাসমান এলএনজি স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে।

আফ্রিকান এনার্জি চেম্বারের সর্বশেষ ‘স্টেট অব আফ্রিকান এনার্জি ২০২৭ আউটলুক’ অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত মহাদেশটির তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন খাতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। নতুন প্রকল্পগুলো চালু হলে ২০৩০ সাল নাগাদ আফ্রিকার দৈনিক হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল তেলসমতুল্যে পৌঁছতে পারে। এ বিনিয়োগের বড় অংশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, লিবিয়া ও আইভরি কোস্টের। একই সঙ্গে উগান্ডা, কেনিয়া ও নামিবিয়ায় নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।

বিশ্ববাজারে আফ্রিকার গুরুত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি পরিবহনে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি এ পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে অঞ্চলটিতে সামরিক সংঘাত কিংবা নৌ-পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপরীতে আফ্রিকার আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের জ্বালানি প্রকল্পগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব। এ সুবিধা ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিকারকদের কাছে আফ্রিকার আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।

আফ্রিকার এলএনজি খাতের সম্প্রসারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি মোজাম্বিক। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় কাবো দেলগাদো উপকূলের রোভুমা অববাহিকায় বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিস প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে মোজাম্বিক এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বছরে ১ কোটি ৩১ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার প্রকল্পটির নির্মাণকাজ নিরাপত্তা সংকটে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। ২০২১ সালে সশস্ত্র হামলার কারণে কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ পুরোপুরি পুনরায় শুরু হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি থেকে ২০২৯ সালে প্রথম এলএনজি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

মোজাম্বিকে ইতালীয় কোম্পানি এনিও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কোরাল সাউথ ভাসমান এলএনজি প্রকল্প ২০২২ সাল থেকে উৎপাদনে রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ৭২০ কোটি ডলার ব্যয়ে কোরাল নর্থ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৮ সালে নতুন প্রকল্পটি চালু হলে দেশটির দুটি ভাসমান স্থাপনার সম্মিলিত এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৭০ লাখ টনে উন্নীত হবে। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারের রোভুমা এলএনজি প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

আফ্রিকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ নাইজেরিয়া। অপরিশোধিত তেল রফতানির পাশাপাশি দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের ‘ডিকেড অব গ্যাস’ কর্মসূচির আওতায় নতুন গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়ন, সরবরাহ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত সংস্কার করা হচ্ছে। নাইজেরিয়া এলএনজির ট্রেন-৭ সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা তিন কোটি টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত বছর রাষ্ট্রায়ত্ত নাইজেরিয়ান ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও করেছে।

পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল ও মৌরিতানিয়াও এলএনজি রফতানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। দুই দেশের যৌথ গ্রেটার টর্তু আহমেইম প্রকল্প থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম এলএনজি চালান রফতানি হয়। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ লাখ টন। দ্বিতীয় পর্যায়ে তা ৫০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সেনেগাল সরকার ১০৯টি অনুসন্ধান ব্লকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ইকুইনর, শেল ও এক্সনমবিলের মতো বহুজাতিক কোম্পানি এতে যুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটির বাণিজ্যিক কাঠামো, কর ও রাজস্ব বণ্টন নিয়ে অধিকাংশ আলোচনা শেষ হলেও সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন এখনো বাকি। এদিকে নামিবিয়ার অরেঞ্জ অববাহিকায় নতুন তেল ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ছে। সেখানে টোটালএনার্জিসের ভেনাস ও মোপানে প্রকল্প ঘিরে বড় আকারের উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি নয়, আফ্রিকার নিজস্ব জ্বালানি চাহিদাও বাড়ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে মহাদেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় বর্তমানে মোট প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ১৭ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ২৫ শতাংশ। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন সরকার এখন শুধু কাঁচামাল রফতানির পরিবর্তে নিজস্ব শিল্পায়নেও গ্যাস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি আফ্রিকার জ্বালানি খাতের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত, দুর্বল অবকাঠামো, বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয় ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এগোতে পারছে না। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এর পরও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার প্রচেষ্টা আফ্রিকাকে নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস বাণিজ্যে মহাদেশটির অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে।