পটুয়াখালীর পায়রায় বিদ্যমান ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো একই সক্ষমতার আরো একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনা কোম্পানি নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এর ৭৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের মধ্যে প্রথম ইউনিটে এরই মধ্যে জেনারেটর, বয়লার ও টারবাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে দেশে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ওপরে থাকা তৃতীয় বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে এটি।

আরপিসিএল ও নরিনকোর সমন্বয়ে যৌথভাবে গঠিত কোম্পানি আরএনপিএল। মূলত এ প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আরএনপিএল বলছে, শিডিউল অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুনে প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের অগ্রগতি অনুযায়ী আগামী বছরের মে মাসেই কেন্দ্রটি চালু করতে চায় যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে কয়লা আমদানির জন্য চারটি কোম্পানিকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে কয়লা আমদানিতে শিপিং কোম্পানির সঙ্গেও চুক্তি এগিয়েছে।

দেশের বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) মতো কেন্দ্র নির্মাণ করে যাতে বসিয়ে না রাখতে হয় সেজন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্রিড লাইন, সাবস্টেশন ও কয়লা আমদানির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শিডিউল অনুযায়ী কাজ শেষ করার জন্য এ প্রকল্পে জোর তদারকি রয়েছে আরএনপিএলের। পাশাপাশি এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি কয়লার দরপত্র, সাবস্টেশন, গ্রিড লাইনের কাজ সমন্বয় করে করা হচ্ছে। যাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে কোনোভাবেই বসে থাকতে না হয়।’

আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এমন সময়ে উৎপাদনে আসতে যাচ্ছে যখন দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লার বিল বকেয়া, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া এবং বিদ্যমান সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোই বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। ফলে এ ধরনের বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত হলে যদি পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার করা না যায়, সেক্ষেত্রে বিপিডিবির ঘাড়ে নতুন করে বাড়তি খরচ যুক্ত হবে বলে মনে করছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দেশের বেইজলোড পাওয়ার প্লান্ট। এ ধরনের বৃহৎ প্লান্টের সার্বক্ষণিক সুবিধা পাওয়া গেলে এতে বিদ্যুতের ঘাটতি কম হওয়ার কথা। তবে কয়লাভিত্তিক অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো যদি আর্থিক কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাতে বিপিডিবির খরচ আরো বাড়বে।’

আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অগ্রগতির বিষয়ে জানা যায়, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য বরগুনার আমতলীতে সুইচিং স্টেশনের নির্মাণকাজ চলছে। এজন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আমতলী পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার ৪০০ কেভি লাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হবে। সেখান থেকে ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইনের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ গোপালগঞ্জ সাবস্টেশনে আসবে। পরে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ যুক্ত হয়ে ঢাকায় আসবে। আমতলী সুইচিং স্টেশনের সঙ্গে আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়াও যুক্ত হবে বিসিপিসিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ সুইচিং স্টেশনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের জন্য এরই মধ্যে চারটি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানটিকে কয়লা আমদানির কাজ দেবে আরএনপিএল। প্রাথমিকভাবে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে কয়লা আমদানির জন্য স্থানীয় শিপিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও সই করেছে আরএনপিএল। প্রাথমিকভাবে তিন বছর মেয়াদি চুক্তিতে কয়লা আসবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ কয়লা নির্বাচিত কোম্পানি এবং বাকি ৫০ শতাংশ কয়লা স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করবে আরএনপিএল।

আরএনপিএলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রথম ইউনিটের বয়লার, পাওয়ার হাউজ, ফ্যান, টারবাইন, জেনারেটর হল, বাঙ্কারসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হয়েছে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের বয়লার, পাওয়ার হাউজ এবং স্টিল স্ট্রাকচারের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া চিমনি, সেন্ট্রাল বিল্ডিং, ফুয়েল ট্যাংক, কুলিং টাওয়ারে কাজও শেষ। এছাড়া দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছে।

আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বিসিপিসিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশেই গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রায় ৯১৬ একর জমির ওপর এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভৌত অগ্রগতি (জুন পর্যন্ত) হয়েছে ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলার কথা রয়েছে।

দেশে চলমান ও নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ হলে এ ধরনের জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে।