মা ও শিশুর উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ঝিনাইদহে চারটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০১৮ সালে হাসপাতালগুলো উদ্বোধন করা হলেও জনবল সংকটে পুরোপুরি চালু করা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন তলাবিশিষ্ট ভবনগুলোতে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। পেতে রাখা হয়েছে শয্যা। চিকিৎসক ও স্টাফদের জন্য রয়েছে ডরমিটরি। এমনকি বিদ্যুৎ চলে গেলেও বিকল্প হিসেবে বসানো হয়েছে জেনারেটর। গর্ভবতী মায়েদের সিজার ও শিশুদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য নির্মিত হাসপাতালগুলো জনবলের অভাবে পড়ে রয়েছে। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো।

ঝিনাইদহ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল গ্রামে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয় ২০১৮ সালের ২ আগস্ট। এছাড়া ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দক্ষিণ কাস্টসাগরায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয় একই বছরের ১০ ডিসেম্বর। সর্বশেষ কালীগঞ্জ শহরের শোয়াইবনগর এলাকার কেন্দ্রটি ২২ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়েছে। তিনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। আরেকটি শৈলকুপা উপজেলার দুধসর গ্রামে নির্মিত ১০ শয্যা দুধসর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। এগুলো সবই ১০ শয্যাবিশিষ্ট। প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সারা দেশে ১৫৯টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র চালু করতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে ১ হাজার ৫৯০ জন জনবল নিয়োগের একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। যার মধ্যে প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও একজন অফিস সহায়ক রয়েছেন। এছাড়া সেবা গ্রহণ নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় ওয়ার্ড বয় ও আয়া নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারায় কেন্দ্রগুলো চালু হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শৈলকুপা উপজেলার দুধসর গ্রামের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি উদ্বোধন হলেও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চালু হয়নি। একইভাবে সদর উপজেলার দক্ষিণ কাস্টসাগরা, কালীগঞ্জের পৌরসভা ও শৈলকুপার কাচেরকোল গ্রামে নির্মিত মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোও জনবলের অভাবে পড়ে রয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসকসহ পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়ার দাবি স্থানীয়দের।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি বার বার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জনবল নিয়োগ না হলে হাসপাতালগুলো সহসা চালু করা সম্ভব হবে না।

সরজমিনে দেখা গেছে, ১০ শয্যার হাসপাতাল ভবনে চিকিৎসকের চেম্বার দুটি, নার্স রুম দুটি, ফার্মেসি, ল্যাব, ওয়েটিং রুম, কাউন্সেলিং রুম, স্টোর রুম, খাবার সরবরাহ কক্ষ, অফিস কক্ষ ছাড়াও রোগীদের জন্য সাধারণ ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ রুমসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কক্ষ রয়েছে। তবে জনবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা হয় না। বর্তমানে ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, নৈশপ্রহরী ও আয়াসহ রয়েছে ওষুধ সংকট। শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ ছাড়া চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দেখা যায়নি।

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রাহেলা বেগম ও আঞ্জু বেগম জানান, হাসপাতাল উদ্বোধনের পর তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি। এখানে কোনো চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। রোগী ভর্তি, অপারেশন ও চিকিৎসাসেবা না থাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। সেবা কার্যক্রম না থাকায় দূরের জেলা সদর হাসপাতাল বা অন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক সময় রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

দুধসর গ্রামের সলেমান আলী বলেন, ‘গ্রামটিতে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র করায় অনেক খুশি হয়েছিলাম। তবে ছয় বছরেও এটি পরিপূর্ণভাবে চালু হয়নি। স্বল্প পরিসরে কয়েকজন স্টাফ সীমিত আকারে সেবা দিচ্ছেন। কেন্দ্রটি দ্রুত চালু করতে পারলে তৃণমূল থেকেই আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা নিতে পারব। মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু না হওয়ায় আমাদের বাড়তি টাকা খরচ করে জেলা শহর বা উপজেলা শহরে যাওয়া লাগছে।’

মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র চালুর বিষয়ে ঝিনাইদহ পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে হাসপাতালগুলো উদ্বোধন করা হলেও জনবল সংকটের কারণে তা পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালগুলো চালু রাখা হয়েছে। তবে সহসা হাসপাতালগুলো পুরোদমে চালু করা সম্ভব হবে না।’