গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের জিয়াডাঙ্গা চর ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত। চরটিতে ৭০০-৮০০টি পরিবার বাস করে। এসব পরিবারের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে সরকার। তবে ২০১৩ সালে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় জিয়াডাঙ্গা কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। জিয়াডাঙ্গার পাশেই চর কটকগাছা গ্রামে রয়েছে আঙ্গারিদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত মাসে নদীভাঙনে সেটিও বিলীন হয়ে যায়। আশপাশে আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছে জিয়াডাঙ্গা চরের শিশুরা।
চরের বাসিন্দারা বলছেন, নদীভাঙন চরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শৈশবেই প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে থাকছে শিশুরা। আঙ্গারিদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। যেহেতু জিয়াডাঙ্গা গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, তাই বিদ্যালয়টি যেন জিয়াডাঙ্গা গ্রামে স্থাপন করা হয়। কারণ এখানকার শিশুদের শিক্ষার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। গ্রামটি তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে অবস্থিত এবং বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গাও রয়েছে। তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে চায়। কিন্তু স্কুল না থাকায় তারা বাড়িতেই থাকে। শিক্ষার অভাবে অনেকেই অল্প বয়সে কাজের সন্ধানে নেমে পড়ছে। এলাকায় বাল্যবিবাহের হারও বাড়ছে।
গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বেলাল হোসেন বলেন, ‘১২ বছর আগে জিয়াডাঙ্গা গ্রামের বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর গড়ে ওঠেনি। পাশের গ্রামের বিলীন হওয়া আঙ্গারিদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জিয়াডাঙ্গা গ্রামে স্থাপন করা হলে ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো বঞ্চিত হতো না।’
গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল বলেন, ‘জিয়াডাঙ্গা গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই। সেখানকার শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত। ওই গ্রামেই স্কুল খুব বেশি প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরের স্থায়িত্ব ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা না হলে দেশের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন বাধা হয়ে থাকবে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিশু ও পরিবারের ওপর। সমস্যা সমাধানে সরকারকে চরাঞ্চলের বাস্তবতা অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ, উপবৃত্তি ও স্কুলমিল কার্যক্রমকে কার্যকর করা এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অপরিহার্য।
ফুলছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে চর এলাকার ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারে না। মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয়ে যায়, আর ছেলেরা জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। যারা সর্বশেষ টিকে থাকে তাদের ভাগ্যে জোটে না ভালো শিক্ষা। সব প্রতিকূলতা পার করে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তারা আর চরে ফিরে যান না। এমনকি চরের শিক্ষার মান উন্নয়ন নিয়ে কখনো ভাবেনও না। এসব মিলিয়ে চরাঞ্চলে শিক্ষার মান উন্নয়ন হয় না।
এ ব্যাপারে গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি জায়গাটি পরিদর্শন করেছি। উপজেলা শিক্ষা কমিটির বিবেচনায় যেখানে উপযুক্ত মনে হবে, নদীভাঙনে বিলীন হওয়া আঙ্গারিদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সেখানেই স্থানান্তরিত হবে।’










