উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের রাকিব মহাজন (২৩)। তবে দালালদের ফাঁদে পড়ে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। দফায় দফায় ৪৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েও প্রাণ বাঁচাতে পারেননি তিনি। লিবিয়ায় দালালদের নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

বুধবার (২২ জানুয়ারি) রাতে রাকিবের মৃত্যুর খবর পান তার পরিবার। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাকিব নাজিম উদ্দিন মহাজনের ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন বছর আগে মাদারীপুরের মৃত ফটিক মৃধার ছেলে দালাল জাহাঙ্গীর মৃধার প্রলোভনে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন রাকিব। জাহাঙ্গীর শরীয়তপুরের সোহাগ মাতুব্বরের মাধ্যমে ২৭ লাখ টাকায় ইতালি পৌঁছে দেয়ার চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, ২৭ লাখ টাকা দিয়ে রাকিব বাড়ি থেকে রওনা দেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে গেমঘরে (বন্দিশালা) আটকে রেখে আরো টাকার জন্য নির্যাতন চালানো হয়। পরে রাকিবের বাবা ধারদেনা করে আরো ৫ লাখ টাকা দেন। তাতেও মুক্তি মেলেনি রাকিবের। পরবর্তীতে মাদারীপুর সদর উপজেলার মাজেদ খলিফার কাছে যায় রাকিবের পরিবার। তাকেও দেয়া হয় ১৫ লাখ টাকা। তবুও রাকিবকে মুক্ত করা যায়নি।

মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) রাকিব গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রাকিবের বাবা নাজিম উদ্দিন মহাজন বলেন, দফায় দফায় টাকা দিয়ে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। এত টাকা দিয়েও ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না। দালালরা আমার ছেলেকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। ছেলের লাশ দেশে আনতে চাই। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

নিহতের ছোট চাচা শাহজালাল মহাজন বলেন, আমার ভাতিজাকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।

স্থানীয় দালাল জাহাঙ্গীর মৃধা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার ভায়রা সোহাগের মাধ্যমে কাজ হয়েছে। আমি কোনো টাকা নেইনি। ওই ছেলে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

আরেক দালাল মাজেদ খলিফার বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

মাদারীপুর সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঘটনাটি মৌখিকভাবে জেনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. সাইফুজ্জামান বলেন, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। দালালদের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।

মাদারীপুর জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে জেলার অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচ শতাধিক দালালের বিরুদ্ধে ২০০ এর বেশি মামলা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ দালাল জামিনে বেরিয়ে পুনরায় এই অপরাধে যুক্ত হচ্ছে।