দেশে গত বছরের শেষ দিক থেকে আবারো বাড়তে শুরু করে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। শুরুতে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা ছিল বেশি। পরে সময়ের সঙ্গে অন্যান্য বিভাগেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকার বাইরে যে পরিমাণ মানুষের শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, শেষ ১৫ দিনে সে সংখ্যা বেড়েছে ১৪ গুণ। এভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে ঢাকার বাইরেও সংক্রমণ চূড়ায় উঠবে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। রোগতত্ত্ব ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা এ সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য ভাইরাসটির নতুন অতিসংক্রামক ধরন ওমিক্রনকেই দায়ী করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ডিসেম্বরের শুরুতে দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এর সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। ডিসেম্বরের শেষে এসে ওমিক্রন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (গোষ্ঠীগত সংক্রমণ) ঘটায়। ঢাকা বিভাগে বিভিন্ন সময় সংক্রমণের হার বেশি ছিল। সে তুলনায় অন্য সাত বিভাগে সংক্রমণ কম ছিল। জানুয়ারির শুরুতে সেসব অঞ্চলে রোগী কম দেখা গেলেও শেষে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন না হলেও ওমিক্রন দ্রুত সংক্রমণশীল। হাসপাতালে শতকরা রোগী ভর্তির হার কম। তবে রোগী বৃদ্ধির সংখ্যা অনেক বেশি হলে তখন স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়বে।

গত এক মাসে সরকারের করোনাবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে ২ লাখ ১৩ হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ১৫ দিনে ২৬ হাজার ৫০০ ও শেষ ১৫ দিন ১ লাখ ৮৭ হাজার রোগী শনাক্ত হয়। শুরুতে ঢাকার বাইরে রোগী শনাক্তের সংখ্যা কম ছিল। মাসের প্রথমার্ধে ঢাকা বাদে অন্য সাত বিভাগে সাড়ে চার হাজার জন সংক্রমিত হয়েছে। আর শেষার্ধে গিয়ে এসব অঞ্চলে ৬১ হাজারের বেশি করোনা রোগী পাওয়া যায়। অর্থাৎ মাসে প্রথমার্ধের চেয়ে শেষার্ধে রোগী বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ।

জানুয়ারির শেষ ১৫ দিনে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী বেড়েছে চট্টগ্রামে। বিভাগটিতে সাড়ে ২৬ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপর রাজশাহীতে সাড়ে নয় হাজার, খুলনায় আট হাজার, সিলেটে সাত হাজার, রংপুরে সাড়ে তিন হাজার ও বরিশালে তিন হাজারের কিছু বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এসব বিভাগের জেলাগুলোর হাসপাতালে সংকটাপন্ন কভিড রোগীর চাপ বাড়ছে প্রতিদিনই।

রাজশাহী বিভাগের পাবনায় সম্প্রতি রোগী বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অনীহার কারণে জেলায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ। পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মনিসর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আগের তুলনায় করোনা শনাক্তে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এতে রোগী বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে জেলায় জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি তেমন জোরালো নয়। তিনি বলেন, রোগী বাড়লেও মৃত্যুর হার কম। আমাদের জেলায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। রোগীদের ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও প্রয়োজনীয় জরুরি যন্ত্রাংশ বাড়ানো হয়েছে। জেলায় নির্ধারিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ ভাগকে টিকা দেয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তির হার কম বলেও জানান পাবনার প্রধান এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ২০২০ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে মারা গেছেন সাড়ে ৭ হাজার। এরপর ২০২১ সালের জুলাই থেকে আগস্ট মাসে রোগী সবচেয়ে বৃদ্ধি পায়। জুলাই মাসে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ও আগস্ট মাসে ২ লাখ ৫১ হাজার রোগীর শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ দুই মাসে মৃতের সংখ্যা বেশি ছিল। এরপর শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা কমতে শুরু করলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

বর্তমানে সংক্রমণ শহর থেকে শহরে ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার মতে, ওমিক্রন বিদেশফেরত বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে দেশে এসেছে। পরবর্তী সময়ে শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় শহর থেকে ছোট শহরে ওমিক্রনের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর ডেল্টা ধরনটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম থেকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পশ্চিমবঙ্গ কর্তৃপক্ষ ওমিক্রনের সংক্রমণ শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা রোগী কম পাওয়া যাচ্ছে। ডেল্টা যেমন গ্রামেও সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটিয়েছিল তেমনটি এবার নাও হতে পারে। তিনি বলেন, গ্রামে ওমিক্রনের সংক্রমণ বেশি হওয়ার শঙ্কা না থাকলেও জেলা-উপজেলায় সংক্রমণ সর্বোচ্চ হতে পারে। ঢাকার বাইরে সংক্রমণ ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে যাচ্ছে।

ডেল্টার চেয়ে ওমিক্রন পাঁচ গুণ বেশি সংক্রমণশীল উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহিনা তাবাসসুম বণিক বার্তাকে বলেন, ওমিক্রন ভয়ংকর না হলেও দ্রুত সংক্রমণশীল। ডেল্টার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ায়। এখন ওমিক্রনের সংক্রমণ বেশি হলেও আমরা দেখতে পাচ্ছি না, কারণ হলো উপসর্গগুলো মারাত্মক নয়। সাধারণ জ্বর, ঠান্ডা ও কাশির মতো উপসর্গ। গত বছরের মতো শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের স্যাচুরেশন কমে যাওয়ার ঘটনা এখন কম। বর্তমানে মৃত্যুর হারও কম দেখা যাচ্ছে। ভাইরাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে যা স্বাভাবিক। শুধু ঢাকা বা ঢাকার বাইরের হিসাব নয়, সর্বত্র ছড়াবে।