বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা জরিপের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করে সরকার। আবার কখনো নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যেও জরিপ কার্যক্রম চালানো হয় সরকারি এ সংস্থাকে দিয়ে। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে অনেক জরিপের ফলাফলই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাতে পাওয়া যায় না। এ দীর্ঘসূত্রতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নীতি গঠনেও। ফলে যেসব লক্ষ্যে হাজার কোটি টাকায় এ ধরনের জরিপ প্রকল্প নেয়া হয়, প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্বের কারণে তার কোনোটিই অর্জন হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বিবিএসের কয়েকটি জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭-১৯ সালে কয়েকটি জরিপ করা হলেও সেগুলোর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে ২০২১ কিংবা ২০২২ সালে। আবার কোনোটি এখনো প্রকাশ করতে পারেনি সংস্থাটি। এর মধ্যে কৃষি (শস্য, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ) শুমারি ২০১৯-এর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। যদিও  প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। জরিপ ও প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবধান প্রায় তিন বছর। দেশের অতিদরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরি করতে ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজ (এনএইচডি) নামে  আরেকটি প্রকল্পের জরিপ করা হয় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে। প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও জরিপের সে প্রতিবেদন এখনো সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়নি বলে জানা গেছে। এর মাঝে কভিডের কারণে অতিদরিদ্রের সংখ্যায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। তাই এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নীতি প্রণয়ন কতটুকু যৌক্তিক হবে, সে প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা। কৃষিশুমারি এবং এনএইচডি প্রকল্প দুটিতে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এছাড়া সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩, শিশুশ্রম জরিপ বাংলাদেশ ২০১৩ ও নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০১১সহ বেশ কয়েকটি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে কয়েক বছর পর। কয়েকটি প্রকল্পের জরিপের ফলাফলের সঙ্গে বর্তমান সময়ের ব্যাপক অসামঞ্জস্যও লক্ষ করা যায়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে জরিপের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় নীতিনির্ধারকদের। তাদের দাবি, দীর্ঘসূত্রতার ফলে নীতি প্রণয়নে কাজে আসছে না শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের এসব প্রকল্প।

নীতি প্রণয়নে পুরনো এ তথ্যগুলো সহায়ক হবে কিনা জানতে চাইলে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এসআইডি) সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাসি খাবার যেমন মানুষ খেতে পারে না, তেমনি পরিসংখ্যান বাসি হয়ে গেলে দাম থাকে না। পুরনো তথ্য দিয়ে নীতি গ্রহণ করলে এটা কোনো কাজেই দেবে না। পরিসংখ্যান যত দ্রুত সম্ভব জানিয়ে দেয়া উচিত। তথ্য সংগ্রহে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু তার জন্য দেরি হওয়ার কারণ আছে বলে আমার জানা নেই। তাই এর প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। শুনেছি কৃষিশুমারির তথ্য মিলছে না। এক্ষেত্রে ছোট ছোট জরিপ করে এর সমাধান করা যেতে পারে।’

কৃষিশুমারিতে ব্যয় হয়েছে ৩৬১ কোটি ৬৯ লাখ ৬ হাজার টাকা। দীর্ঘসূত্রতার কারণে নীতি প্রণয়নে প্রকল্পটি খুব একটা কাজে আসছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো সময়ের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকার জন্য এ ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়। অথচ ২০১৯ সালের কৃষি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে ২০২২ সালের শেষে। এর প্রতিবেদন প্রকাশকালে খোদ পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক বছর আগের একটা জরিপের ফল স্বাভাবিকভাবে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলবে না। বোঝাই যাচ্ছে এ প্রতিবেদন আমাদের নীতি প্রণয়নে খুব একটা সাহায্য করবে না। এ জরিপ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু যথাসময়ে প্রকাশ না হলে এর ফলাফল কাগজেই থেকে যায়। বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না। সারা বিশ্বেই বিবিএসের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়। তাই আমাদের সময়ের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিপ পরিচালনা হয় বিভিন্ন বিষয়ের বাস্তব চিত্র উপস্থাপন ও ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের জন্য। নীতি প্রণয়নেও এর গুরুত্ব অনেক। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক বছর আগের জরিপের ওপর ভিত্তি করে নীতি গ্রহণ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই তা সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে না। কিন্তু বিবিএসের অনেক প্রতিবেদন দুই-চার বছর আগের জরিপের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা ও কারিগরি সহায়তায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এসএমওডিআরপিএ প্রকল্প এবং বিবিএসের আওতায় দেশের অতিদরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরি করতে এনএইচডি প্রকল্পটি নেয়া হয়। চার বছরের এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে দফায় দফায়। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবরের মধ্যে তিন ধাপে সারা দেশের দরিদ্রের তথ্য সংগ্রহ করতে জরিপ পরিচালনা করা হলেও এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত চার বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, কাজ শেষ না হওয়ায় এনএইচডি প্রকল্পের মেয়াদ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়।

বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমানের কাছে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি এতটুকু জেনেছি যে এনএইচডির কাজ গত ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তবে আমি নতুন এসেছি, এখন কী অবস্থা বলতে পারব না। যারা এ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারাই বিস্তারিত বলতে পারবেন।’

এদিকে করোনা মহামারীর শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু দরিদ্রের সঠিক তালিকা না থাকায় ১৫ লাখ পরিবারের কাছে এ সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অথচ অতিদরিদ্রের নির্ভুল তালিকা করতেই ২০১৩ সালে এনএইচডি প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। বিবিএসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ হলে হয়তোবা এ ১৫ লাখ পরিবার সরকারের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হতো না। দ্বিগুণ ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির পরও এখনো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।’

এনএইচডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কাজী তোফায়েল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতিদরিদ্র নির্বাচনে এ জরিপে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে। আমাদের মূল কাজ শেষ। আনুষ্ঠানিক কিছু বাকি আছে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এটা অন্যান্য প্রতিবেদনের মতো প্রকাশ করা হবে না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে এলেও কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে দারিদ্র্যের হারে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। ফলে ৭০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পটিতে চার বছর আগের জরিপের তথ্য কোনো কাজেই আসবে না। বিবিএসের এমন অনেক জরিপেরই তথ্য সংগ্রহের কয়েক বছর পর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিতাই চক্রবর্তী মনে করেন, প্রতিবেদন প্রকাশের দীর্ঘসূত্রতার কারণ অব্যবস্থাপনা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জরিপ প্রতি বছরই হওয়া উচিত। কিন্তু অধিক অর্থ ব্যয়ের কারণে আমাদের দেশে তা সম্ভব হয় না। তাছাড়া জরিপ কাজের ছয় মাসের মধ্যেই প্রতিবেদন হওয়া জরুরি। বিশেষ কোনো কারণ থাকলে সেটি সর্বোচ্চ এক বছর হতে পারে। নতুবা এ জরিপ এবং বিপুল অর্থ ব্যয় কোনো কাজেই আসবে না। জনশুমারি ঠিক সময়ে হতে পারলে অন্যগুলো হওয়া কঠিন কিছু নয়। মূলত সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনার কারণেই এমন দীর্ঘসূত্রতা হয়। এটা কাম্য নয়।’