ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেলে রাজধানীর নাগরিক সমস্যা সমাধানে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে ঢাকা শহরকে নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুরো ঢাকায় ৪০টি খেলার মাঠ করা হবে। সড়কগুলো প্রশস্ত করা হবে। ঢাকাকে সুন্দর শহর হিসেবে গড়া হবে, যেখানে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে।

গতকাল বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা-১৭ আসনের মিরপুরের ইসিবি চত্বরে এক পথসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান এ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি এ আসন থেকে দলের প্রার্থী হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচিত হলে আমরা এ ঢাকা শহরকে একটি নিরাপদ শহরে রূপান্তর করতে চাই। যে শহরে মা-বোনেরা নিরাপদে নিশ্চিন্তে যেকোনো সময়ে হাঁটতে পারবেন, যে শহরের মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করতে পারবেন। আমরা ঢাকাকে একটি সুন্দর শহর গড়ে তুলতে চাই, যে শহরে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবেন।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের দোয়ায় বিএনপি ১২ তারিখে ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে শুধু এ এলাকায় নয়, ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ তৈরি করব। যাতে আমাদের সন্তানেরা খোলা মাঠে খেলাধুলা করতে পারে, যাতে আমাদের মুরব্বিরা, মা-বোনেরা বিকালবেলায় বা তাদের প্রয়োজনের সময় মাঠে হাঁটাচলা করতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রার্থী, ধানের শীষের প্রার্থী, এ এলাকা থেকে ঢাকা-১৭ থেকে প্রার্থী হয়েছি। আমি এ এলাকারই সন্তান, আমি ছোটবেলা থেকে, আমার শিশু বয়স থেকে আমি এ এলাকাতেই বড় হয়েছি, আমার সন্তানেরা এ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছে। কাজেই আমি এ এলাকারই সন্তান এবং এ এলাকার সন্তান হিসেবে এ এলাকার মুরব্বি, মায়েদের, ভাই-বোনদের কাছে ধানের শীষের জন্য ভোট চাইছি।’

ইসিবি চত্বর থেকে জসিম উদ্দিন পর্যন্ত সড়ক প্রস্তুত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তারেক রহমান।

ঢাকা-১৬ আসন: এরপর বিএনপি চেয়ারম্যান বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর মিরপুরে ঢাকা-১৬ আসনের পল্লবী ২ নম্বর ওয়ার্ডের লাল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। এ আসনে দলের প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকের পক্ষে তিনি ভোট চান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতিতে চলবে। গত ১৬ বছরে দেশে বহু মেগা প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বরং এসব প্রকল্পের আড়ালে হয়েছে মেগা দুর্নীতি। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হলে সবার আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে এ আসনের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি যারা বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যেতে চান, তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘পানির সমস্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার গঠন করলে সবার আগে ঢাকার খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হবে। একই সঙ্গে সারা দেশে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হবে।’

ঢাকা-১৫ আসন: বিকাল সাড়ে ৫টায় ঢাকা-১৫ আসনে মিরপুর ১০ গোলচত্বর-সংলগ্ন সেনপাড়া-পর্বতা এলাকায় আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

তারেক রহমান বলেন, ‘এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যা সাধ্যের বাইরে। ঢাকা-১৫ এলাকার মানুষের চিকিৎসা সুবিধার জন্য এখানে হাসপাতাল স্থাপন করা হবে এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ১০০ ফিট রাস্তার কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। এজন্য প্রতিটি ঘরে গৃহিণীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে, যার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় অন্তত একটি করে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে, যেখানে ভাষাশিক্ষা ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণরা নিজেরা ব্যবসা করতে পারবে অথবা বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। যারা চাকরি নিয়ে বিদেশে যাবে, তাদের যেন জমি বিক্রি করতে না হয়। এজন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।’

দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কথা একটাই, কাজ একটাই—দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের সবার প্রথম এবং শেষ ঠিকানা এই বাংলাদেশ।’

ঢাকা-১৪ আসন: সন্ধ্যায় ঢাকা-১৪ আসনের মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি ওই আসনের ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত ১৬ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত প্রতীক তুলি। স্বৈরাচারী শাসনামলে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের যে ভয়ংকর বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে তার অন্যতম প্রত্যক্ষ সাক্ষী তুলি নিজেই।’

তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘আমরা কি এই মহান ত্যাগ বৃথা যেতে দিতে পারি? না, পারি না।’

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের মানুষের কাছ থেকে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। শুধু ভোটের অধিকারই নয়, মানুষের বাকস্বাধীনতাও কেড়ে নেয়া হয়েছিল।’

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরো বাড়াতে এবং কাউন্দিয়া ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করতে তুরাগ নদীর ওপর কাউন্দিয়া-মিরপুর ব্রিজ শিগগিরই করে দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

প্রবাসী কর্মীদের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রবাসী। বিদেশে যেতে গিয়ে অনেককে পৈতৃক জমি বিক্রি করতে হয়। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে ট্রেনিংপ্রাপ্ত কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার জন্য স্বল্প সুদের সরকারি ঋণের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তাদের জমি বিক্রি করতে না হয়। এ সিদ্ধান্তগুলো আমরা নিয়েছি জনগণের ভবিষ্যৎ বদলানোর জন্য।’

ঢাকা-১৩ আসন: রাতে শ্যামলী ক্লাব মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এতে সভাপতিত্ব করেন এ আসনের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ।

সেখানে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক দলকে বেছে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘চোখটা বন্ধ করে এক মিনিটের জন্য চিন্তা করে দেখুন, এ মুহূর্তে যতগুলো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে আছে, বিএনপি ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল শিক্ষাসংক্রান্ত, যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে, কৃষক ভাইদের সহযোগিতার ব্যাপারে, মা-বোনদের স্বাবলম্বী করার ব্যাপারে, কোনো ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা দিতে তারা সক্ষম হয়েছে কিনা?’

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতি এবং এমন একটি দেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আমাদের মা-বোনেরা সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা কিংবা রাত—যেকোনো সময় নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। আমরা চাই আমাদের তরুণ যুবক, আমাদের ভাইয়েরা ও মুরব্বিরা—যে যার ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি-বাকরি নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে করুক। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে এ এলাকাবাসীসহ সমগ্র ঢাকাবাসী ও দেশের মানুষ নিশ্চিন্তে রাতে নিজ নিজ ঘরে ঘুমাতে পারবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দেব দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে এবং রাস্তাঘাটকে নিরাপদ করতে। যতক্ষণ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনাই সুফল বয়ে আনবে না।’

ঢাকা-১২ আসন: রাজধানীতে ‘ধানের শীষের’ পাশাপাশি ‘কোদালের’ পক্ষেও ভোট চেয়েছেন তারেক রহমান। গতকাল রাতে ঢাকা-১২ আসনে তেঁজগাও শিল্পাঞ্চলে এক পথসভায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের পক্ষে তিনি ভোট চান। তিনি বলেন, ‘বিগত আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে যারা রাজপথে আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন তাদের একজন কোদাল মার্কার প্রার্থী সাইফুল হককে আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে দিয়েছি। এখানে কোদাল জেতা মানেই এখানে ধানের শীষ জেতা, এলাকার উন্নয়ন হওয়া।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দুইদিন আগে পত্রিকায় দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের এক সদস্য ভোটের নকল সিল তৈরি করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ধরা পড়েছে। সেজন্যই আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে। সজাগ থাকতে হবে যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে সেই নকল সিল দিয়ে অন্য কোনো ফল করতে না পারে।’

ঢাকা-১২ আসনে পথসভা শেষে তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত দৈনিক দিনকালের অফিস পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। এ পত্রিকার তিনি প্রকাশক ও সম্পাদক। তিনি সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

সর্বশেষ রাত ১১টায় বাড্ডার সাঁতারকুলে পথসভায় ঢাকা-১১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এমএ কাইয়ুমের পক্ষে ভোট চান বিএনপি চেয়ারম্যান।

এসব সভায় সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ফরহাদ হালিম ডোনার, মাহদী আমিন, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, ঢাকা মহানগর (পশ্চিম) ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন ও ঢাকা মহানগর উত্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।