বিএনপি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকার রক্ষায় করা অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, বিএনপি সরকার প্রণীত খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ এ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকার বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীরই ওপর নির্ভরশীলতা তথা অনুমতির বাধ্যবাধকতার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো কমিশনকে পুনরায় বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের মতোই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।

সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া যে গুটিকয়েক জবাবদিহি সম্ভাবনাময় ব্যতিক্রমী অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ। অথচ মানবাধাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্বকারী ২০০৯ সালের আইনের অনুরূপ বিতর্কিত বিধান ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বিএনপি সরকার মূলত তার নিজ দলের নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকার রক্ষার যে অঙ্গীকার করেছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে।

আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ঘটনার সরাসরি তদন্ত, শাস্তির পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শাস্তির সুপারিশ প্রদানে কমিশনকে যে এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল, নতুন খসড়া আইনে সেখানে ২০০৯ সালের আইনের ১৮-ধারা হুবহু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চাকে অব্যাহত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনী প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। ২০০৯ সালের আইনের এ ধরনের দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কখনোই ‘এ’ ক্যাটাগরির স্ট্যাটাস দেয়া হয়নি। বিগত সময়ে গুম-খুনসহ মানবাধিকার হরণের যত ঘটনা ঘটেছে, তার অধিকাংশ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিধানটি বহাল রাখা হলে, তা মূলত তাদের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।

খসড়া আইনের ১৩-ধারা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে স্বপ্রণোদিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা, তা তদন্ত করার এখতিয়ার দেয়া হয়নি। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটক ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে- এমন স্থান অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা এবং এমন স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়ার যে সুযোগ অধ‍্যাদেশে রাখা হয়েছিল, তাও রহিত করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয়, যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বিগত কর্তৃত্ববাদী সময়ে দেশবাসী, এখনকার সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রায় সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীগণ গেছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয় না, যার প্রতিফলন ঘটেছে সরকারের উদ্যোগে গত ১৭ মে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভা সূত্রে প্রাপ্ত খসড়া আইনটিতে।

কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন এমপি এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার ফলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, খসড়া আইনে রহিত হওয়া অধ‍্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হইবে না’ বাক্যটি বাদ দেয়া হয়েছে। একদিকে কমিশনকে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে একটি কমিশনের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষাকারী ভাষ্যকে বাদ দেয়ার কী যৌক্তিকতা থাকতে পারে! তা ছাড়া, কমিশনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে অধ্যাদেশে কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতার যে বিধান রাখা হয়েছিল, তার পরিবর্তে ‘যোগ্য প্রার্থী’ প্রাপ্তির শর্তজুড়ে দেয়া হয়েছে, যা কমিশনকে ‘পুরুষতান্ত্রিক ও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রেষণে ও একজন সরকারি কর্মচারীকে স্বীয় পদে চাকরিরত অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখার মাধ্যমে সংস্থাটিকে মূলত পূর্বের ন্যায় আমলাতন্ত্র তথা সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ‘ঠুটো জগন্নাথ’ সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার স্ববিরোধী ও চূড়ান্ত বিবেচনায় আত্মঘাতী। এ স্ববিরোধী ও আত্মঘাতী পথ পরিহার করে সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করেছে, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে আলোচ্য খসড়াটির যে সব বিতর্কিত ধারাসমূহের ব্যাপারে টিআইবিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজন তাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে, তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে- এ প্রত্যাশা করছে টিআইবি।